মূল: আলী হারফাউচ (Ali Harfouch) / অনুবাদ: রাগিব হাসান ফাহিম | ১ম সংখ্যা · পৃষ্ঠা ৯৭
মুসলিম উম্মাহ (দল/সম্প্রদায়/গোষ্ঠী) এক জীবন্ত অর্গানিজমের মতো; এটি একটি পরিবেশে উদ্ভাসিত হয় এবং এর রয়েছে নিজস্ব জেনেটিক কোড। এই জেনেটিক কোড উম্মাহর অনেকগুলো সম্ভাবনার ক্ষেত্রকে তুলে ধরে; সম্ভাব্য ও সুপ্ত নানা অচিন্তনীয় বা অভাবনীয় ব্যাপারকে আসল ও বাস্তবে রূপান্তরের সামর্থ্য রাখে।১ তবে এই যে অনেকগুলো সম্ভাবনার ক্ষেত্রের কথা বলা হলো, দেখা যায় যে ক্ষমতা তথা বল প্রয়োগপূর্বক সেগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় কাজ করে, যেমন, অনেকগুলো সম্ভাবনার মধ্যে কেবল একটি সম্ভাবনাকেই বাছাই করা এবং সেটাকে আবার বাদবাকি সম্ভাবনাগুলো বর্জন ও গায়েব করে দেওয়ার ঔষধ হিসেবে প্রয়োগ করা। ফলাফল– একটা পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যতের বলবৎকরণ এবং সমকালীন সময়ে আধিপত্য বিস্তারকারী কোড বা নীতিমালার কাছে উম্মাহর বশ্যতা স্বীকার। বিষয়টি যা দাঁড়ায়, উম্মাহ নিজেকে একটা সংকটের মধ্যে আবিষ্কার করে এবং সে এক গায়েবী আদর্শের ক্ষমতা দ্বারা বেষ্টিত বা আক্রান্ত হয়ে পড়ে– নাম তার নিওলিবারেলিজম।*
বর্তমান হালতের গভীরতাকে চিহ্নিত করতে এবং এই সংকটকে বুঝতে গেলে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা উচিত– এক উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানে কি? অস্তিত্বগতভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবে ইচ্ছা ও ক্ষমতার ধারণা (Notion of choice and power) নিহিত আছে উম্মাহ শব্দের ব্যুৎপত্তিতেই (Etymology)। উম্মাহ শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে আরবী মূল “আম” থেকে; ক্রিয়া বিবেচনায় এর অর্থসমূহ হলো– “কোনোদিকে যাত্রা করা, খোঁজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, পথ দেখানো, বোঝানো, নিয়ত করা”; বিশেষ্য বিবেচনায় এর অর্থসমূহ হলো– “গন্তব্য, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, সাধনা, উপসংহার”।২ একটা উদ্দেশ্য থাকার মানে হলো উম্মাহর অস্তিত্বগত অপরিহার্যতা ও তাকে সংজ্ঞায়িত করে এমন বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকা। উদ্দেশ্যের অনুপস্থিতি যে ক্ষতিটা করে সেটা হলো চিন্তার মধ্য দিয়ে জ্ঞান আহরণ কিংবা বোঝাপড়া ও কৌশলগত (Cognitive and strategic) পর্যায়ে অস্তিত্বের সংকটের দিকে ধাবিত করে। কারো গতিপথ কিংবা ভবিষ্যৎ বাছাইয়ের সক্ষমতাকে এটি অকার্যকর করে ফেলে।
আমরা অনেকগুলো বিকল্প হটিয়ে কেবল একটা সম্ভাবনার বলবৎকরণ সম্পন্ন করে থাকি এবং সেটা প্রয়োজনের খাতিরে, নিজের ইচ্ছায় নয়; যেনবা আমাদের সেটা গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
উম্মাহকে যদি দিশা দেখায় এমন এক ভবিষ্যতের ছবি যার ভিত্তি তার নিজের স্থাপিত নয়, যেমন নিওলিবারেলিজম, সে উম্মাহ আদতে কোনো উম্মাহ-ই নয়।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইসলামের সাথে নিওলিবারেলিজমের রিশতা হলো এটি ইসলামকে একটি পণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনে এবং “বাজারী ইসলাম” বানিয়ে দেয়– অর্থাৎ এমন ইসলাম যা বাজারের চাহিদার সাথে সম্মত হয় এবং তদনুসারে সাড়া দেয়। উম্মাহর জোরালো চৈতন্যের (consciousness) অনুপস্থিতি এবং উম্মাহর বিচ্ছুরণের যে শক্তি তা নিওলিবারেলিজমের অধীনে এসে মুসলিম সাব্জেক্ট বা কর্তাসত্তার ভাঙন ধরায় এবং উম্মাহকে একটি নয়া নিওলিবারেল সাব্জেক্টিভিটি গ্রাস করে; অর্থাৎ উম্মাহ তার এজেন্সি বা কর্তৃত্ব হারায়। ফলে একটি সত্তার (Self) সৃষ্টি হয় যার কারিগর হলো নিওলিবারেলিজম। পালাক্রমে, মুসলিম সত্তার হ্রাস ঘটে এবং সে হয়ে উঠে একজন ভোক্তা ও প্রতিযোগী; সে নিজেই নিজের মালিক এবং দাস। ইসলাম তার জন্য আরও নিচে নেমে আসে আর তার জন্য এটি হয়ে উঠে কেবল একটি জনসংখ্যা মাত্র (Demographic trait), পরিচয় নির্দেশক (Identity marker) এবং একটি পণ্য (Brand)। উম্মাহর নিজের প্রয়োজন কিংবা আকাঙ্ক্ষা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলাফল হলো কার্যকর কর্মকান্ড গ্রহণে অক্ষমতার পরিচয় দেওয়া; বিকল্প ভবিষ্যৎ যেখানে ডিভাইনলি বা আসমানিভাবে নির্দেশিত ধর্মতত্ত্বের (divinely ordained theology) প্রতিফলনের দেখা মিলবে– এমন কিছু কল্পনা করার কথা নাহয় বাদই দিলাম।
নিওলিবারেলিজম কি?
নিওলিবারেলিজমের ফান্ডামেন্টাল প্রিমাইজ বা মৌলিক পূর্বশর্ত হলো যে, বাজার হচ্ছে “স্বাধীন” এবং তা কোনো কিছুর স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে রিপ্রেজেন্ট বা উপস্থাপন বা প্রতিনিধিত্ব করে। Neoliberalism’s Demons: On the Political Theology of Late Capital এ এডাম কসকো নিওলিবারেলিজমের যথাযথ জিনিয়ালোজিক্যাল সংজ্ঞা দেন। তিনি “ক্লাসিক্যাল লিবারেলিজম” বা laissez-faire নীতি থেকে নিওলিবারেলিজমকে পৃথক করেন। এখানে পরেরটা অর্থাৎ laissez-faire দ্বারা নির্দেশ করা হয় উনিশ শতকের ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যেখানে রাজনীতি ও অর্থনীতি দুটি স্বতন্ত্র স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে চালিত হোতো যেখানে আবার অর্থনীতির সাথে যেকোনো ঝামেলা মিটিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রাষ্ট্র ভূমিকা রাখতো। অবশ্য এই পার্থক্য বা স্বতন্ত্রতা অসমর্থনযোগ্য প্রমাণিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়কালে, অবাধ উচ্ছৃঙ্খল বাজারের ধ্বংসাত্মক প্রভাব, সেটা সারিয়ে তুলতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছিল এবং সোশাল ডেমোক্রেসি কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের নানান মডেল প্রয়োগের দিকে ঝুঁকে ছিলো––এটাকে আমরা ফোর্ডিজম* (Fordism) হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝিতে ফোর্ডিস্ট মডেল কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আবার এই সৃষ্ট সংকটের দুটি জবাব ছিলো। প্রথমটা ছিলো, কল্যাণ রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়টা ছিল নিওলিবারেলিজম যেটিকে যুক্তরাজ্যের মার্গারেট থ্যাচার এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড রিগ্যানের মতো লোকজন জিন্দা করে তুলেছিল। নিওলিবারেলিজমের উকালতির পেছনের মূল আইডিয়া “পথের কাঁটা হিসেবে রাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া” ছিলো না, বরং তা ছিলো বাজার মোতাবেক রাষ্ট্র ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে রূপান্তরিত করা। এর মানে দাঁড়ায় পাবলিক সার্ভিসগুলাকে বেসরকারীকরণ করার মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি যেখানে ইতোপূর্বে সেসবের অস্তিত্ব ছিলো না। এই প্রতিযোগী মানসের মডেলটি তার সাধ্যের মধ্যে জীবনের আরও নানান দিককে সংযুক্ত করে। এভাবে, নিওলিবারেলিজম তার নিজস্ব মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যাসহ একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়।৩
সংক্ষেপে, নিওলিবারেলিজম হলো একটা প্রক্রিয়া যেখানে বাস্তবতাকে পুনরাবিষ্কার/পুনঃসৃষ্টি করা হয় ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাজারের ছকে বা চিত্রে। এটা এক কিসিমের বিশ্ব ব্যবস্থা যার লক্ষ্য বৃহত্তর পরিসরে দুনিয়াকে পুনর্গঠন করা, দুনিয়া কেমন কিংবা কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় সেই ছক অঙ্কন করা।৪ বিশ্বব্যবস্থা প্রণয়নের কিংবা বাস্তবতা তৈয়ারের প্রক্রিয়া শুরু হয় বাজার মোতাবেক মানুষ পুনঃসৃষ্টির মাধ্যমে। এখানে এক নতুন সাব্জেক্টিভিটি তৈয়ারের ব্যাপার আসে আর সেটা হলো– মানুষ হচ্ছে হোমো একোনোমিকাস যার চূড়ান্ত লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হলো প্রতিযোগিতা, ভোগ এবং উৎপাদন। এই নয়া সাব্জেক্টিভিটিগুলো মুসলিম বিশ্বেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিম সত্তার সাব্জেক্টিভিটি পুনর্গঠনের যে ক্ষমতা নিওলিবারেলিজমের রয়েছে তা ভালোভাবে বুঝতে আমাদের অবশ্যই নিওলিবারেল শক্তির দিকে দৃষ্টি ফেরাতে হবে, এবং মুসলিম সত্তার সাথে কিভাবে এটি রিশতা জুড়ে দেয় এবং কিভাবে মুসলিম সত্তা ও ব্যাপক হারে উম্মাহকে পৌরুষহীন বানিয়ে ফেলে এসব বুঝতে উক্ত শক্তির দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতেই হবে।
পর্যায় ১ঃ চৈতন্যের/চেতনার ভেতর ঢুকে পড়া এবং গ্লোবাল মেশিন
উম্মাহকে পৌরুষহীন বানানোর প্রথম ধাপ হলো চৈতন্যের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটাতে প্রযুক্তিকে নিযুক্ত করা। নিওলিবারেলিজম তার নিজেরই ডিজাইনকৃত তথ্য ও প্রযুক্তিকে নিজের অধীনস্থ করে শিখরে আরোহন করে, এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে বিশ্ব তথ্য যন্ত্রের অভ্যুদয় (emergence of the global information machine)। বিগ ডাটা* দুটি স্ট্র্যাটেজি খাটায় মুসলিম সত্তার মধ্যে অনুপ্রবেশে ও তাকে আজ্ঞানুবর্তী করে তুলতে। বিগ ডাটার মাধ্যমে বাজার দেখতে পায় যে, মুসলিম সত্তার আত্মা কিংবা মানসিকতা রূপান্তরিত হয়ে ভোক্তায় পরিণত হচ্ছে, এবং এটা সম্ভবপর হচ্ছে সুনামির ন্যায় প্রতিমুহূর্তে তথ্য রেকর্ড হওয়ার মাধ্যমে।৫ পালাক্রমে, এই তথ্য নিযুক্ত হয় শাসন ও নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসেবে এবং যেমনটা দার্শনিক বিয়্যুং-ছুল হ্যান্স তাফসীর করেন, “এই ডাটা বা তথ্য মানবাত্মায় হস্তক্ষেপকে সহজতর করে এবং একটি প্রি-রিফ্লেক্সিভ** ধাপে প্রভাব তৈরিকে বাস্তব করে তোলে।” মুসলিমদের টার্গেট করে এমন মার্কেটিং কৌশলের অভ্যুদয় অন্যকোথাও সেভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। মার্কেটিং কর্পোরেশন যেমন Oglivy & Mather পুরো একটা ডিপার্টমেন্ট তৈরি করেছে Ogilvy Noor নামে যাতে করে কাস্টোমাইজেশন ত্বরীকায় মুসলিম ভোক্তাদের আকর্ষণ ও সংযুক্ত করা যায়। বেরার্দি এই বলে সতর্ক করেন যে, সমকালীন গ্লোবাল মেশিন তথা বিশ্ব যন্ত্রের ক্ষমতা নিহিত আছে তথ্যের সুনামি পাঠের সামর্থ্যের মধ্যে, যেটি আবার, পালাক্রমে, বিশ্ব যন্ত্রকে লিভিং অর্গানিজমের তথা মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে মানিয়ে নিতে এবং বিশ্ব যন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার সাথে মানুষকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অভিযোজিত করে।৬
পর্যায় ২ঃ নয়া সাব্জেক্টিভিটি তৈয়ার এবং স্বাধীনতার ধোঁকা
দ্বিতীয় ধাপে, উম্মাহকে পৌরুষহীন বানানো হয় এক নয়া নিওলিবারেল সাব্জেক্টিভিটি তৈয়ার করার মধ্য দিয়ে। ক্রিটিক্যাল চৈতন্যের অনুপস্থিতিতে মুসলিম সত্তা নিজেকে এমন ক্ষেত্রে চালিত হতে দেখে যা তার নিজের নয় এবং সে এই ধোঁকায় থাকে যে এটা মুক্ত, স্বাধীন। ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ বিভ্রম খেলার ক্ষেত্র চালু করে যেটা “স্বাধীনতার” উদাহরণস্বরূপ ছদ্মবেশ ধারণ করে। ব্যাখ্যার্থে বলা যায়, ক্ষমতা মূলত সেভাবে কাজ করে যেভাবে বিড়াল ইঁদুরকে ফাঁদে ফেলেঃ
“বিড়াল ইঁদুরকে ধরতে, জব্দ করতে, থাবা দিয়ে চেপে ধরতে এবং সবশেষে এটিকে হত্যা করতে শক্তি প্রয়োগ করে। হত্যার আগ অবধি বিড়ালের খেলাধুলা যখন চলছে তখন আরেকটি ফ্যাক্টর কিন্তু বর্তমান। বিড়ালটি ইঁদুরকে ছাড় দেয়, একটু দৌড়ানোর মওকা দেয় এবং এমনকি পিছনে সরে আসে; এবং এই সময়টাতে ইঁদুরের উপর বিড়াল কোনো বল প্রয়োগ করে না। কিন্তু এই ব্যাপারটা ঘটে বিড়ালের সীমানার অভ্যন্তরে এবং সে চাইলেই এটিকে পাকড়াও করতে পারবে।… এই যে সীমা বা ক্ষেত্র যা বিড়ালের ক্ষমতাধীন, এই যে মুহূর্ত যা ইঁদুরকে উম্মিদ/আশা দেয়, এই যে সারাক্ষণই ইঁদুরের উপর বিড়ালের তীক্ষ্ণ নজরদারি চালিয়ে যাওয়া এবং ইঁদুরকে গ্রাস করার আগ্রহ ও নিয়তের দম বিড়ালের মধ্যে তেমনই বলবৎ থাকা– এসবের মিশেল তথা সীমা বা ক্ষেত্র, উম্মিদ, নজরদারি, ধ্বংসাত্মক নিয়তকে বলা যেতে পারে ক্ষমতার প্রকৃত মূর্ত গড়ন (actual body of power), কিংবা আরও সহজভাবে বলা চলে, এটিই ক্ষমতা।”৭
এই খেলার সীমা বা ক্ষেত্রগুলো হলো ভোগ, উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা। পুঁজিবাদের যুগে ক্ষমতা তার শিখরে পৌঁছে গেছে কারণ এটি এখন তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে চালিত হয় তথাঃ এটি স্বীকৃত বা অনুমতিসূচক এবং উৎপাদনশীল রূপ ধারণ করে; তবে এটি সহিংস রূপ ধারণ কিংবা বল প্রয়োগ করে না যা ইচ্ছাকে এবং স্বাধীনতাকে অবদমিত করে রাখে। বরং সে তা এমন এক ক্ষমতার মাধ্যমে করে যাতে “নেতিবাচক দিক আবৃত হয়ে পড়ে এবং এটি স্বাধীনতার চিত্রে উদ্ভাসিত হয়”। এই ছলনাময়ী স্বাধীনতা পুঁজিবাদের পক্ষে কাজ করেঃ
“যে ক্ষমতা চালাক ও বন্ধুভাবাপন্ন, সে ক্ষমতা সামনে থেকে বা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাজ করে না – অন্যভাবে বলা যায়, এই ক্ষমতা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়িয়ে যায় না যারা এর শিকার হবে। এর পরিবর্তে, এটা তাদের ইচ্ছাকেই তার নিজের ফায়দার দিকে ধাবিত করে নিয়ে যায়। এই ক্ষমতা “না” এর চাইতে “হ্যাঁ” বেশি বলে। এটি প্রলোভিত করে, চাপাচাপি নয়। এটি ইতিবাচক আবেগকে আহবান জানায় এবং সেগুলোকে কাজে লাগায়। এটি বিপত্তি খাড়া করানোর পরিবর্তে বিপথের দিকে পথ দেখায়। শিকারের বিপরীতে দাঁড়ানোর পরিবর্তে চালাক ও বন্ধুভাবাপন্ন এই ক্ষমতা শিকারের সাথে মাঝরাস্তায় মোলাকাত করে।৮” ফলে বশ্যতা স্বীকার ব্যতীত উপায় অবশিষ্ট থাকে না।
নিওলিবারেলিজমের অধীনে ক্ষমতা সহিংসতার মধ্য দিয়ে কাজ চালায় না বরং তা করে এক নয়া কিসিমের রাজনীতির রূপে যার ইঙ্গিত আমরা ইতোমধ্যে দিয়েছি তথা– এটি চৈতন্য পর্যায়ে কাজ করে থাকে। এই পর্যায়ে যে ক্ষমতা কাজ করে, সেটি আমাদের ইঁদুর-বিড়াল গল্পের মতোই কাজের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে ফেলে এবং স্বাধীনতার বিভ্রম সৃষ্টি করে। তরুণ মুসলিমদের এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে প্রতিনিধিত্ব খুঁজে বেড়ানোর প্রবণতা ভীষণভাবে লক্ষণীয়। ভোগের অধিকার, উৎপাদনের অধিকার এবং স্বাধীনতার প্রধান চিহ্ন বহনকারী হয়ে উঠার প্রতিযোগিতায় নামা– এসব নিয়েই তাদের ভাবনা। শেলিনা জানমোহামেদের পর্যবেক্ষণ, “এটা মনে হয় যেন মৌলবাদী বা গোঁড়া চিন্তা যে মুসলিমরা আসলেই এসব খরিদ করছে। তারা বলছেঃ ‘হ্যালো, আমাদের খরচ করার টাকার অভাব নাই, আমরা তরুণ, আমরা আধুনিক, দয়া করে আমাদের সাথে কি সেভাবেই আচরণ করবেন যেভাবে অন্যদের সাথে করে থাকেন?'”৯
এবং এভাবেই পুঁজিবাদ কাজ করেঃ এটি ভিন্নমতের ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। “নিওলিবারেল মুসলিম” ক্ষমতাকে সওয়াল করে না, কিন্তু সে ক্ষমতায় একটা অবাস্তব হিস্যা দাবি করে এবং সেটা চৈতন্য ও কৌশলের জায়গায় যে রূপে আছে সে রূপে ধ্রুব রেখেই। এই প্রক্রিয়ায়, “প্রতিনিধিত্ব” আর “দৃশ্যমানতার” নামে মুসলিম সত্তা তার নিজেকেই খুইয়ে বসে, এবং সে অজ্ঞ থাকে যে তাকে “অদৃশ্য বা নাই” করে রাখা হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো মুসলিমদের প্ররোচিত করে এবং নানান উভয় সংকট খাড়া করে যেমন বুরকিনি (সাঁতারের পোশাক যা হাত, পা, মুখ বাদে বাকী শরীর ঢেকে ফেলে) নাকি মুসলিম ফ্যাশন মডেলের প্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি নিয়ে তারা পড়ে থাকে। একই সময়ে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ কিংবা মুসলিম বিশ্বে কর্তৃত্ববাদ যে ইকোলোজিক্যাল বা বাস্তুতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি করেছে, এ সম্পর্কে সে বেখবর।
পর্যায় ৩ঃ সত্তা/আত্মার ভাঙন এবং Generation M
উম্মাহকে পৌরুষহীন বানিয়ে ফেলার পেছনে তৃতীয় ধাপটি হলো মুসলিম সত্তায় চিড় ধরা বা তার ভাঙন। মনোরাজনীতি বা সাইকোপলিটিক্স অপারেট করছে নব্য নিওলিবারেল সাব্জেক্টিভিটির রূপে। ফলে (মুসলিম) সত্তা ও অপরকে (the other) যে পার্থক্যসূচক সীমা দ্বারা পৃথক করা হোতো, তা ক্ষয়ে গেছে। যে রিশতাগুলো জীবন্ত সত্তাকে সুনিয়ন্ত্রিত রাখতো, সেগুলো ভোগ আর প্রতিযোগিতার রিশতার কাছে ধীরে ধীরে জায়গা হারাচ্ছে। জনাব হ্যান দুই কিসিমের অভিন্নতার মধ্যে প্রভেদ করেনঃ একটি প্রকৃত বিশুদ্ধ অভিন্ন সত্তা (Authentic Selfsame) এবং অন্যটি হলো জোড়াতালি লাগানো অভিন্ন (Totalizing same)। প্রথমটি আভ্যন্তরীণ কালেক্টেডনেস হিসেবে একটি কাঠামো ধারণ করে এবং একত্রিত হয়ে থাকে যা অপর (other) থেকে ভিন্ন। পক্ষান্তরে, যা জোড়াতালি লাগানো অভিন্ন (Totalizing same) সেটি মূলত কাঠামোহীন এবং বহু সংখ্যক মিল অমিল বিষয়কে একাট্টা করলে যা হয় তা।১০ মুসলিম বিশ্বে এই দ্বিতীয়টার অভ্যুদয়ের ঘটনা হলো মুসলমানিত্বের একটা রকম বা অনুভূতি যা কিনা ভিন্নতা চিনতে পারে না; কেননা এটি নিজেই নিজেকে অন্যান্যদের থেকে আলাদা করেনি। এবং এভাবেই, নিওলিবারেলিজম কর্তৃক ঢুকিয়ে দেওয়া সাব্জেক্টিভিটি থেকে সে অভিন্নতা লাভ করেছে। এটা হলো প্রকৃত বিশুদ্ধ অভিন্ন সত্তা হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে ইসলামিকতাকে খারিজ করে দেওয়া। কেননা এখানে ইসলামকে (এবং ইসলামিকতার ভিত্তি) একটি ব্র্যান্ড বা পণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং নিওলিবারেল সত্তার একটি নিছক সংযোজন বানিয়ে ফেলা হয়েছে। জোড়াতালি লাগানো অভিন্ন মুসলমান হচ্ছে পার্থক্যসূচক খাসলত বজায় না রাখা বহু একক মুসলমানের সামষ্টিক রূপ। আর অন্যদিকে, ইসলামিকতা বা বিশুদ্ধ অভিন্ন সত্তা হলো একটি সংহত জীবন্ত সত্তা।
‘Generation M’ এর উত্থান বলতে যা দাঁড়ায় তা হলো মেরুদণ্ডহীন মুসলমানিত্বের মার্কেটাইজড ও ব্র্যান্ডেড চেহারা। ইসলামিকতার ভাঙনের ফল হলো, অনৈসলামিক পরিবেশে ইসলামিক পরিবেশ এবং অপর ও নিজ সত্তার (self) মধ্যকার যে সীমা তাদের পৃথক করে, তা ঝাপসা হয়ে আসে। কার্ল শ্মিট সতর্ক করেন যে, যখন সামষ্টিক সত্তা এই পৃথক করার সক্ষমতা হারিয়ে বসে, তখন সে রাজনৈতিকভাবে [এবং ধর্মীয়ভাবে] তার অস্তিত্ব হারায়। যদি সে অন্য কাউকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমোদন দিয়ে দেয়, তাহলে সে আর রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন থাকে না এবং অন্য রাজনৈতিক সিস্টেম তাকে গ্রাস করে নেয়। কেননা একবার মাত্র অন্য রাজনৈতিক সিস্টেমের করায়ত্তে আসলে যেকোনো প্রকার ইসলামিক রাজনীতিরই অস্তিত্বহীন হওয়া অনিবার্য।১১
সীমা নির্দেশক এবং নিজের আত্মচিত্রের অনুপস্থিতিতে উম্মাহ তার সম্ভাবনা বা সুপ্তশক্তিকে ক্ষমতায় পরিণত করতে পারছে না। এই উম্মাহর সামাজিক সত্তার আচরণ একটা ‘শিরহীন শরীরের মতো। তার মধ্যে এখনো শারীরিক শক্তি রয়েছে বটে, তবে একটি যুৎসই দিকে তাকে চালিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।’১২ এই সুপ্তশক্তি বা সম্ভাবনা হয়ে থাকে বিক্ষিপ্ত, এবং তা কেবল উৎপাদন, ভোগ ও প্রতিযোগিতায় ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ থেকে যায়। উম্মাহর এই বর্তমান সংকটকে অক্ষমতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যেটা তৈরি হয়েছে সীমা নির্দেশক–যা কিনা সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করে– তার অনুপস্থিতির কারণে। এবং এর ফলে চৈতন্য ও শক্তির জায়গায় বিশৃঙ্খলা ও বিক্ষিপ্ত অবস্থা বিরাজ করে। জোড়াতালি লাগানো অভিন্ন মুসলমানিত্ব একটি বিস্তৃত গোষ্ঠী হিসেবে সর্বদা এর বহিরাগত পরিবেশের সাথে একটা আজ্ঞাধীন রিশতা/সম্পর্ক জারি রাখে। কারণ এর সক্ষমতা নেই একটি “প্রযুক্তিগত এবং ভূরাজনৈতিকভাবে অতীব জটিল” দুনিয়ার সাথে ন্যাভিগেট করার।১৩
গায়েবী শাসন ব্যবস্থা : নিওলিবারেলিজমের আধিবিদ্যক (Metaphysical) দিগন্ত
নিওলিবারেলিজমের নিজস্ব মেটাফিজিক্স আছে। এটি একটি জীবনব্যবস্থা যার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি নয়া গসপেল তথা বেদবাক্যের উপরঃ দ্যা গসপেল অব “ম্যামোনিজম”(Mammonism)। [ম্যামোনিজম হচ্ছে সম্পদের প্রতি লোভী বৃত্তি।] অর্থের ভালো দিক হিসেবে বলা হয়, “টাকা পয়সা ধারণ ও প্রদান করে অকল্পনীয় চিত্তাকর্ষক সুযোগসুবিধা”।১৪ টাকার একটি ধর্ম হিসেবে এটিকে “জ্ঞানতাত্ত্বিক শক্তির সমতূল্য এবং এর ধারককে এটি অস্তিত্বগত মাহাত্ম্য (Existential Sublimity) দান করে”, এবং ম্যাক ক্যারাহার আরও তাফসীর করেন যে, সবকিছুর তার মূল্য নির্ধারণ করে “অর্থ (টাকা) নামক জড় বস্তুটি” যার অন্তঃসার শূন্য অথচ এটিকে প্রাণবন্ত হিসেবে গণনা করা হয়।১৫
নিওলিবারেলিজম এই মেটাফিজিক্স গোপন রাখে নিজেকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে। মেটাফিজিক্স এখানে কোনো দর্শনগত ভাবনাচিন্তা নয় বরং বলা যেতে পারে তা হলো স্রষ্টা, মানুষ ও দুনিয়ার ব্যাপারে আমাদের ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এক অস্তিত্বগত স্থিতিবোধ (Existential Orientation)। তেমনিভাবে, মেটাফিজিক্স ক্ষমতার একটি রূপ যা চিন্তার ক্ষেত্রকে চিত্রায়িত করে থাকে। এটা এক গায়েবী শাসন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। জনাব কস্কো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, নিওলিবারেলিজম লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসে। তার তৈরিকৃত এবং খামখেয়ালীপূর্ণ মেটাফিজিক্সের অরিজিন বা মূলসূত্র লুকানোর ব্যাপারে সে যে সক্ষমতা রাখে, তা তার ক্ষমতার সর্বোচ্চ দাপটকেই নির্দেশ করে। নিওলিবারেল ব্যবস্থা মানবসৃষ্ট মূল্যবোধের চর্চা করে কিন্তু সেটাকে জাহির করে স্বাভাবিক, দরকারি এবং ট্রান্সহিস্ট্রিক্যাল এবস্যুলিউট হিসেবে; অর্থাৎ ইতিহাস জুড়েই যেনবা এই নীতি/দর্শন চিরন্তন ছিল।১৬
নিওলিবারেলিজম ক্ষমতার মধ্য দিয়ে কার্যপরিচালনা করে যা হামেশা হিংস্রতা কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, যেমনটা ইতোপূর্বে বলা হয়েছে। এটা হতে পারে আপনার অনুমোদন নিয়েই এবং এটাই ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়া। এটি এর বাধ্যগত প্রজার মুখ থেকে সন্দেহাতীত, বারংবার প্রতিধ্বনিত “হ্যাঁ” বের করে আনে এবং এভাবেই কাজ করে। আসলে ক্ষমতা দিয়ে ক্ষমতাসীন পক্ষ ক্ষমতাহীনদের ইচ্ছাকে নাকচ করে দিতে পারে। “এটা অদ্ভুত যে একটা মতবাদ যেটা কিনা ইচ্ছা ও স্বাধীনতা প্রদানের ওয়াদা করছে তার আসলে স্লোগান হওয়া উচিৎ ছিল, ‘কোনো বিকল্প নাই’।”১৭
ক্ষমতা যে কেবল আমাদের রাজনৈতিক দিগন্তের সীমারেখা ঠিক করে দেয় তা-ই নয়, বরং একটা নয়া মেটাফিজিক্সের সাথে মোলাকাত ঘটিয়ে দেয় যেটি কিনা তার নিজস্ব জ্ঞান সংস্থা (Regime of knowledge) সমেত গায়েবী শাসন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এসব জ্ঞান সংস্থাগুলোর কাজ হলো মূলত বাস্তবতার বিকৃতি। আর এসব বিকৃতির ফল হলো “দ্বিতীয় খোদা” কিংবা তাগুতের উদয়। তাগুত এর সরাসরি অর্থই হলো, যে ডিভাইনলি বা ঐশ্বরিক শাসন ব্যবস্থার সীমালঙ্ঘন ঘটায় সে-ই তাগুত। এরপর দেখা যায় যে, নিওলিবারেলিজমের অধীনে তাগুতের রূপে “ধনদেবতা কুবের” হাজির! [হিন্দুধর্মে কুবেরকে ধনসম্পদের দেবতা বলা হয়। এখানে অর্থবিত্ত বা ধনসম্পদকে মেটাফোরিক্যালি কুবের বলা হয়েছে।] কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, যে ধনসম্পদ আদতে আরাধনা ও ভক্তি পাওয়া মিথ্যা মূর্তি বৈ নয়– একেও আমরা তাগুত বলতে পারি। গোল্ডবার্গ তার জাত সৃষ্টি (Race Creation) সম্বন্ধীয় আলোচনায় এসব ধন সম্পদকে “নৃতাত্ত্বিক খোদা (Anthropic God)” হিসেবে দেখিয়েছেন যারা নতুন রিশতা সৃষ্টি করে। এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন “সেগুলো একেবারেই নিষ্কলুষ ও একদমই দায়িত্বহীন সমাজ ব্যবস্থাপনার উপর প্রায় অপরিবর্তনীয়ভাবে আরোপিত স্বাভাবিক বিষয়যাদি, যেগুলো কিনা সর্বোচ্চ স্থান থেকে নাজেল হয়েছে।”১৮
কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী এই তাগুত অধঃপতিত হয়ে এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে, সে ভাবতে শুরু করে, যা কিছু তার আপন সত্তার নাগালের বাইরে তা থেকে যেনবা সে মুক্ত এবং স্বাধীন; আর তার সাথে আছে বাহ্যত “মুক্তবাজার”। তাগুত যেকোনো সত্তাকে তার স্রষ্টা প্রদত্ত আদি সত্তা তথা ফিতরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং সে এটা করে হোমো একোনোমিকাস বা অর্থনৈতিক মানুষ নামক নব্য সত্তা সৃষ্টির মাধ্যমে।১৯ নিওলিবারেল শাসন ব্যবস্থা “দ্বিতীয় খোদা” হিসেবে আবির্ভূত হয় এই অর্থে যে, এটি নতুন সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে এবং তার নিজের মতো করে মানুষ, স্রষ্টা এবং কসমস তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পুনঃসৃষ্টি করে। এনরিক ডাসেল এটাকে বর্ণনা করেন ফেটিশাইজেশনের প্রক্রিয়া হিসেবে, যেখানে একটি সিস্টেম তার Historical Contingency তথা ঐতিহাসিক শেকড়কে ভুলে যায় এবং নিজেকে উপস্থাপন করে একটি প্রয়োজনীয় ও ট্রান্স-হিস্ট্রিক্যাল এবস্যুলিউট হিসেবে যা কিনা তার অরিজিন মতে ঐশ্বরিক এবং প্রশ্নোর্ধ ব্যাপার। অর্থাৎ এই সিস্টেমকে প্রশ্ন, নিরীক্ষা কিংবা আতশীকাচের নিচে রাখা যাবে না।
নিওলিবারেলিজম কেবলমাত্র আদর্শিক আধিপত্যের রূপই না, বরং সেই সাথে এটি “বাস্তবতা লুকানো আদর্শিক” রূপও ধারণ করে।২০ ক্ষমতা হিসেবে মেটাফিজিক্সকে ব্যবহার করেই নিওলিবারেল শাসন ব্যবস্থা নয়া মুসলিম সত্তা নির্মাণ করে। এই সত্তারই নাম দেওয়া হচ্ছে জেনারেশন এম। এটা একটা সৃষ্টির মতোই ব্যাপার। যেন, একজন লেখক বা একজন দেবতা “একটা বস্তুকে অস্তিত্ব দিলেন”। এই কাল্পনিক কাহিনী হয়ে উঠে একটি “পবিত্র, প্রশ্নাতীত ঘটনা যদ্দ্বারা কোনো লোককে অস্তিত্বে নিয়ে আসা হয়, কিংবা বলা যেতে পারে সে নিজেই নিজেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসে।”২১ দ্যা গসপেল অব ম্যামন ঘোষণা করে যে, “টাকা দিয়ে শুধু সব কেনা যায় তা-ই না, সেই সাথে শূন্যকে সে নিয়ে আসতে পারে অস্তিত্বে। এভাবে নৈতিক ও মেটাফিজিক্যাল রসায়নের চমকপ্রদ সব বৈশিষ্ট্যের খেলা সে দেখাতে পারে।”২২
তাহলে নিওলিবারেলিজম এবং তার মেটাফিজিক্যাল শাসন ব্যবস্থার মূলসূত্র কি? এর যুৎসই ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর জন্য আমাদের অবশ্য কাজ হলো চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে আধুনিকতা ও সেক্যুলার ধারণার নিকটবর্তী দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করা। এতে করে আমরা বুঝতে পারব যে, কিভাবে বাজারকে স্বেচ্ছাধীন ও স্ব-পরিচালিত ক্ষেত্র হিসেবে দেখা শুরু হয়।
আধুনিকতা (Modernity) মানুষের আত্ম-দাবীর (Self-assertion) একটা প্রকল্প কিংবা চিন্তার/আকলের সার্বভৌমত্বের চাইতেও বেশি কিছু। মানুষের আত্ম-দাবীর স্বেচ্ছাচারিতা আসলে এ কারণেই সম্ভব যে, আধুনিকতা “স্রষ্টার যে সার্বভৌমত্ব সেটাকে পুনর্দখল করে।”২৩
“মুক্তবাজারের” আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতা তখনই সম্ভব যখন আমরা দুনিয়াকে হৃদয়ঙ্গম করি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পূর্ণ স্বাধীন একটি দুনিয়া হিসেবে। বলা চলে, এখানে স্রষ্টার সার্বভৌমত্বকে হটানো হয় আর “সবার উর্ধ্বে যিনি তথা প্রকৃত স্রষ্টা, তার রূপে অন্য কেউ প্রতিনিধি হিসেবে হাজির হয়।”২৪ এটা পবিত্রকরণকে পরিত্যাগ করার মাধ্যমে নয় মোটেও। বরং, দুনিয়া তার নিজেকে পরম ও পবিত্র করে তোলার মাধ্যমে। ম্যাকক্যারাহারের তরজমা অনুযায়ী, সেক্যুলার বা ধর্মহীনতা দুনিয়াকে জাদুহীন (আধ্যাত্মিকতাহীন) করেনি বরং কালাজাদু (বিষাক্ত আধ্যাত্মিকতা সৃষ্টি) করেছে।
টাকা ও সম্পদের মেটাফিজিক্স দ্বারা বশীভূত এক দুনিয়ায় নিওলিবারেল শক্তি মায়াবী/জাদুকরী ধর্মহীনতাকে চিন্তার যুক্তিময় দুনিয়ার ক্ষেত্র হিসেবে বিনির্মাণ করেছে এবং তার কর্মক্ষেত্র হচ্ছে মার্কেট তথা বাজার। জন মিলব্যাংক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, “একদা কোনো সেক্যুলার ছিল না”; এটাকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকভাবে কল্পনা ও সৃষ্টি করতে হয়েছিল। এই স্বয়ংক্রিয়করণের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাকে ছাড়িয়ে যায় এবং নিজের জন্য একটি নয়া স্বেচ্ছাচারী অবজেক্ট নির্মাণ করে আর সেটা হলো “বিশুদ্ধ ক্ষমতার” একটা ক্ষেত্র হিসেবে। এর নাম দেওয়া যায় দ্যা একোনোমিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। এটাকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে হয়েছিল।
এগিয়ে চলাঃ নিওলিবারেল ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে
সেল্ফ এবং দুনিয়ার নিওলিবারেল চিত্র আমাদের চৈতন্যে এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছে যে সেটা আমাদের কাছে এক্সরসিজম ভিন্ন কিছুই চায় না। যদি নিওলিবারেলিজম আদর্শিক লুকোচুরির বাস্তবতা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের যা জরুরত তা হলো মৌলিকভাবে নয়া এবং উদ্ভাসক (যা পষ্টভাবে কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা বা প্রকাশ করে) চৈতন্য। তাওহীদ বা একত্ববাদ হলো সেই নয়া চৈতন্য। তাওহীদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো নাকচ কিংবা সমালোচনার ক্ষমতা; অর্থাৎ “দুনিয়া যেমন আছে ঠিকই আছে”– এমন বক্তব্যকে গোণায় না ধরার, মানে প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা রাখে এবং “দুনিয়া যেমনটা হওয়া বাঞ্ছনীয়”– বর্তমান ও ভবিষ্যতকে এমন অর্থ/শিক্ষা প্রদান করে। “দুনিয়া যেমনটা হওয়া বাঞ্ছনীয়”–এই ব্যাপারটাকে দিশা দেখায় একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় যাদের আছে স্রষ্টাপ্রদত্ত চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থাৎ উম্মাহ নামের সত্তা; সেই সাথে এটাও বলা জরুরী যে মেরুদণ্ডহীন ও নিওলিবারেল মূল্যবোধের সাথে তফাৎ করতে পারে না এমন গোষ্ঠী এ কাজে অক্ষম।
নিওলিবারেলিজম ও পুঁজির উপাসনার রহস্য যখন উন্মোচন হয়ে যায়, তখন আমাদের ক্রিটিক্যাল চৈতন্যের ভিত্তি স্থাপনে এক নয়া মেটাফিজিক্স হাজির হয়। সেটা হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। এই নয়া মেটাফিজিক্সের রয়েছে মানবজাতি, দুনিয়া ও মহাবিশ্ব নিয়ে পষ্ট মৌলিক ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি। তাওহীদ আমাদেরকে পুঁজিবাদ ও নিওলিবারেলিজমের উপর এক নয়া ক্রিটিকের যোগান দেয়। সেটা হলো, পুঁজিবাদ কেবল শ্রম থেকেই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না। বরং এই দ্বিতীয় খোদা (নিওলিবারেলিজম) মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে প্রথম খোদা (আল্লাহ) ও তাঁর প্রদত্ত আদিম/সহজাত সত্তা বা ফিতরাত এবং ঐশ্বরিক ভারসাম্য হিসেবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে। পক্ষান্তরে, তাওহীদ প্রকাশ করে যে মানুষ, স্রষ্টা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বাজার অনুযায়ী সৃষ্ট নয় বরং সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়া অদ্বিতীয় হিসেবে যিনি চিত্রিত সেই স্রষ্টার ইচ্ছানুযায়ী সৃষ্ট। অ-খোদায়ী, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এসবের সামষ্টিকতা ঐশ্বরিক কর্মকান্ডের একটা শর্ত বা একটা যন্ত্র হয়ে উঠে। এভাবে, দুনিয়াটা স্রষ্টা থেকে স্বাধীনতা/মুক্তি লাভ করা একটি বদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে থাকে না, বরং তা একটা স্রষ্টার স্থায়ী সৃজনশীল কর্মকান্ডের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় (এবং এখানে জবাবদিহিতার বিষয় থাকে অনিবার্যভাবে)। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা কসমোস হলো একটি মিযান, ঐশ্বরিকভাবে স্থিরকৃত ভারসাম্য বা পাল্লা। এখানে একজন মানুষের সত্তাতত্ত্বীয় (Ontological) কারবার কিন্তু ভোগ, উৎপাদন এবং প্রতিযোগিতা নয় বরং ডিভাইনলি বা আসমানিভাবে নির্দেশিত ও স্বীকৃত কাজের আঞ্জাম দেওয়া এবং সেগুলো সংরক্ষণ করা; তথা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। উপরন্তু, স্রষ্টাকে মৌলিকভাবে একমাত্র ট্র্যান্সেনডেন্টাল এবস্যুলিউট হিসেবে, সকল ক্ষণস্থায়ী ফর্মেশনের উর্ধ্বে হিসেবে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করার মধ্য দিয়া আমরা পুঁজিবাদের মোহ থেকে নিজেদের মুক্ত করি এবং নিওলিবারেল ব্যবস্থাকে সহজে বুঝতে পারি। নিওলিবারেলিজম আর এখন একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থার প্রতিনিধি করে না তবে এখন এটি তার নিজস্ব মেটাফিজিক্স ও ক্ষমতার নানা রূপসহ একটি মতাদর্শ হিসেবে চিহ্নিত। ক্রিটিক্যাল চৈতন্যের অপরিহার্যতা এই জায়গায় যে, এটি হলো একধরণের সচেতনতা যে, ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে, এবং এ থেকে আমরা নিওলিবারেলিজমকে সহজে জানতে পারি ও এর মোহ থেকে বেরুতে সক্ষম হই।২৫ এই ব্যাপারটি নরম্যাটিভ ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের সচেতন বাছাইয়ের সামর্থ্যকে সহজ করে তোলে। দুনিয়ার সচেতন মূল্যায়নের মাধ্যমে বর্তমানে খচিত করা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ও গতিপথের নতুন সব সম্ভাবনাগুলো থেকে বাছাইয়ের সামর্থ্যও প্রদান করে।