জোবাইরুল হাসান আরিফ | ১ম সংখ্যা · পৃষ্ঠা ৮৫
এইটা একটা অর্ডারি লেখা। সচরাচর লেখালেখিরে নাজিল হওয়ার মতো ব্যাপার মনে করার প্রচলন আছে। প্রসঙ্গ যদি কবিতা হয় তবে তো তা খাপেখাপ। কব্যুয়ত বললে চোখা হয় ধারণাটা, এইভাবে কবি তার কব্যুয়তি নিয়া থাকেন বটে, কিন্তু প্রসঙ্গ যখন গদ্য, তখন নবুয়তের আদলে কোন টার্ম কি প্রস্তাব করা যায়? না, মনে হয়। কারণ কবিতায় যেরকম হেঁয়ালি, পুনরাবৃত্তি বা কম বলে বেশি বুঝানোর ব্যাপার থাকে, গদ্য তো ওই পথের পথিক নয়। বরং গদ্যে কাব্যিকতা সহ্য করা হয় না, কথাকে গুছিয়ে সাহিত্য করতে না পারা মতো এক কিসিমের ব্যর্থ কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রচার করবার চল আছে এর, যেহেতু গদ্য সরাসরি চিন্তা নিয়া কারবার করে। সেহেতু অর্ডারি লেখার শানে নুজুল তো জানাইতে হয়, যে, অনুরোধে ঢেঁকি কেন গেলা হচ্ছে বা এরকম…
আড্ডার খেসারত। বা শখের বিড়ম্বনা। এই দুইটা থিকা কোনটা পছন্দসই বুঝে নিয়েন আপনারা, এখন মিলেন কুণ্ডেরা নিয়ে কেন লিখতে হলো তার কারণ জানানোর দিকে আগাই। বালেগ হওয়ার পর থেইকাই বিশ্বসাহিত্যে নিয়া নাড়াচাড়া করে লোকে, অথবা ওই নাড়াচাড়াই বালেগ বানায় বালকবালিকাদের। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অপর নাম ‘অধিকার’ সম্পর্কে সচেতন হওয়াও, রাজনীতি অতো না বুঝলেও নৈতিকতা নিয়ে টইটম্বুর কাণ্ডজ্ঞান তখন নানান ধরনের ‘অপরাধ’ নিয়াও কারবার শুরু করে ভাবনায়। তো, ওইরকম সময়ে আমার পড়া হইছিলো দ্য বুক অব লাফটার এন্ড ফরগেটিং, কণ্ঠস্থ হইছিলো, The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting.” তার মানে, ক্যাচি সব কোটেশন মুখস্থ রাখতে চাইবার ব্যাপার হলো একটা। এমনিতে বালেগ হওয়ার যেই শারীরিক ব্যাপার তা তো একরকম, কিন্তু সাহিত্যিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বালেগি শুধু অবদানের কথা উঠাইতো মনে, যে, অরে যে পড়তেছি তার মৌলিক কন্ট্রিবিউশন আছে কি কোন? তো, সেক্স বেশ ফাটাফাটি ব্যাপার সমসাময়িককালে, কিন্তু যেকোন টপিকে কন্ট্রিবিউশান খোঁজার বাতিক আমাদের অতো হেডোনিস্ট বানাইতে পারে নাই আসলে তখন, ফলে আমরা খেয়াল করতেছিলাম, এই লোকের যৌনতা ডীলিং ‘আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইং’এ বেশ আলাদা রকমের। অস্তিত্ববাদে থেকেও কিভাবে আইডিয়া ব্যক্তি পেরিয়ে সমগ্রে পৌঁছাতে পারতেছে তা বুঝতে পারার এক চমৎকার রীডিং ছিলো সেসময়। এই তো হলো শুরু, এরপর নানান আড্ডায় কুণ্ডেরা থাকতো, নোবেল বা বুকার এই-সেই নানান ইস্যুতে। তো, এরকম এক আড্ডায় আমরা ‘আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইং’য়ের বাঙলা তরজমা কি হবে তা নিয়া তুমুল তর্ক দিতেছিলাম।
আমাদের ভিতর কেউ কেউ ‘সত্তার অসহনীয় লঘুতা’ নামের যেই ভাইরাল অনুবাদ আছে তা বেশ জবরদস্ত বইলা মত পোষণ করতেছিলো।
সেইসময় এক রিক্সঅলা টংমামার লগে কথা কইতেছিল, যে, কুত্তাচোদা গরম পড়তেছে বদ্দা! এই ‘ইউরেখা’ আমি আড্ডায় হান্দানোর সিদ্ধান্ত নিছিলাম, সত্তা আর লঘুতা’রে ছাড় দিয়া ‘অসহনীয়’ এর তরজমা হিসেবে ‘কুত্তাচোদা’ প্রস্তাব করছিলাম মনে পড়ে, রিক্সাঅলা মামার রেফারেন্সসহ। মানে, সত্তার কুত্তাচোদা লঘুতা। আড্ডায় এই প্রস্তাব এতো বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হইছিলো যে, এই কাহিনী শেয়ার করলে আড্ডাবাজরা ভোট চুরির অভিযোগ আনে এখন, যে, বাড়ায়া বাড়ায়া বলতেছি কিনা। এই করতে করতে এক সন্ধ্যায় শুনি উনি ইন্তেকাল ফরমিয়েছেন, তখন কাকতালীয়ভাবে কথা হচ্ছিল চিন্তাপ্রধান ষান্মাসিক কাগজ ‘বাহাছ’ নিয়ে, যেই দোস্তদের লগে আলাপ উনারা পরামর্শ দিলেন উনারে নিয়া লিখতে, যেই কথা সেই কাজ তো হওয়ার নয় সহজে, কিন্তু যেহেতু উনাদের থেইকাও একটা কইরা অন্তত লেখা নিতে হবে ষান্মাসিকটার দরকারে, ফলে রাজি হতে হলো, এবং এইভাবে অর্ডারি হওয়ানি হলো লেখাটার…
কুণ্ডেরার বিস্তারিত লেখাজোঁকা থেইকা এটাকেই কেন বেছে নিতে হলো, এর একটা জুতসই কারণ বলা যাক। আর্ট বা আর্টিস্টের জন্ম যে একটা রেন্ডম ঘটনা তা তো জানা কথা। কোন যুক্তি দিয়া এরে ব্যাখ্যা করা যায় না, যে, অমুক শিল্পীর জন্ম তমুক সময়ে কেন হইছে বা তমুক শিল্প অমুক শিল্পী থিকা জন্ম নেয় নাই কেন। অনুরূপভাবে লজিকের বিচারে এও বলা যায় না, যে, সমূহ প্রাসঙ্গিক কারণ উপস্থিত থাকবার পরও অমুকে ভালো লিখতে পারে নাই কেন বা উপযুক্ত কোন কারণ না থাইকাও তমুক মহান বনে গেলো কিভাবে। আবার একজন লেখকের সব লেখা যে ইউনিক হবে তার আবদারও আমরা করতে পারি না, অনেক এভারেজ লিখেও কেউ গ্রেট আর্ট উৎপাদন করতে পারেন, যেভাবে খুব কম লিখেও প্রোডাকশন হিসেবে যে তা গার্বেজ আর্ট হবে না তার নিশ্চয়তাও দিতে পারি না। এজন্যে শিল্প বিচারে বইসা আমি শীর্ষ শিল্পমুহুর্তের খুঁজে থাকি, গোনায় ধরবার এইরকম রেওয়াজও আছে, যে, সেরা আর্টিস্টিক মোমেন্টে আর্টিস্ট তার আর্ট নিয়া যতটুকু উচ্চতায় পৌঁছাইতে পারছেন তাই তার ব্রিলিয়ান্সির চূড়া হওয়া উচিত। তা না হইলে আর্টিস্টকে তার এভারেজ আর্ট বা সৃষ্টি দিয়া বিচার বসানোর রিস্ক থাইকা যায়। সর্বোচ্চ সৃষ্টি যেন আলোচনায় থাকে তার জন্যে এই আয়োজন। আমার হিসাবে কুণ্ডেরার হাইয়েস্ট এলিভেশন হলো দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইং। তেনার অন্যান্য সৃষ্টিদের নিয়া তুলনামূলক আলোচনা এই লেখার মেদ বাড়াবে মাত্র, ফলে আর কোন ভণিতা ছাড়াই উপন্যাসে ঢুইকা যাই আমরা।
টমাস হলেন এই উপন্যাসের নায়ক। প্রচণ্ড চার্মিং, বিছানায় দুর্দান্ত ডমিনেটিং এই নায়কের নারীদের ডেট করা নিয়ে একটা থিওরি আছে নিজস্ব, যে, একজন নারী টানা তিনদিন ডেট করার যোগ্য। এর ফলে তিনদিন পর ওর থিকা চিরতরে হারিয়ে যায় সে জীবন থেইকা, অথবা তিন সপ্তাহ গ্যাপ দিয়া দিয়া দেখা করতে থাকে আজীবন। তার এই উড়নচণ্ডী কিসিমের জীবনে বাদ সাধে টেরেজা নামের এক মাইয়া। ট্রমাটিক এক শৈশব পার করে এসে এই নারী টমাসের প্রেমে পড়ে এবং কোন এক অলৌকিক ইনোসেন্সের টানে টমাসও প্রেমে পড়ে। ফলে পূর্বোক্ত থিওরী অনুসারে টমাস এড়িয়ে যেতে পারে না টেরেজারে। বিয়ে করে, যদিও বিয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় সে আগেও পড়ছিলো। কিন্তু টমাস তার গোপন অভিসার আদৌ থামায় না, যদিও দিনশেষে টেরেজার কাছেই ফিরে আসে সে।
টমাসের এক বান্ধবী মতো মিস্ট্রেসের নাম সাবিনা, যার সাথে টমাসের পরিচয় টেরেজার সঙ্গে টমাসের দেখা হবার আগে থিকাই। শে একজন পেইন্টার, আর্ট ও কিশে নিয়ে যার বুঝাপড়া উস্তাদ লেভেলের। টমাসের সাথে তার ওপেন রিলেশনশিপ শেষ হওয়ার পর ফ্রাঞ্জ নামের এক বিবাহিত তার প্রেমে পড়ে, কিন্তু শে তাকে অপছন্দ করা শুরু করে তার স্রেফ ভদ্রলোকিতার জন্য, নিষ্কলুষ ভালোমানুষী তার পিরিতি ও সেক্সুয়্যালিটির টার্ন অফ ঘটায়! তার বয়ানে, ফ্রাঞ্জ কখনো টমাসের মতো বিছানায় এগ্রেসিভ হতে পারে না, পারে না কম্যান্ড করতে – “স্ট্রিপ”, যেই কম্যান্ডের লগেলগেই মিস্ট্রেসদের ব্লাউজের বাটন খুলে পইড়া যায়! ফলে ফ্রাঞ্জের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সাবিনা, একদম না জানায়ে উধাও হইয়া যায় তার সদ্য ডিভোর্স হওয়া জীবন থেকে। এবং এর মধ্য দিয়াই উপন্যাসের নামকরণের যে সার্থকতা তার দিকে আগায় কুণ্ডেরা, বলে, কষ্ট মানুষের উপর ভার বা বোঝা হয়ে বসে থাকে, এজন্যে হালকা হতে চায় লোকে, সাবিনার কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হলো হালকা হবার মাধ্যম। সোশালিস্ট টোটালেটেরিয়ান রেজিমের মাঝে জীবন কাটানো সাবিনা এই কইরাই ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্জনের স্বাদ নেয়, কমিটমেন্ট ইস্যু যেহেতু তার কাছে ভার বা বোঝার অপর নাম। কিন্তু ফ্রাঞ্জকে ছাইড়া আসবার পর সে বুঝে, ফ্রাঞ্জও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার জিন্দেগীর, যার বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে শে এখন একলা ও হালকা বটে, কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে চেপে ধরছে আরেক কিসিমের ভার বা হেভিনেস – দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং, বিইং হবার অসহনীয় ভারহীনতা অথবা অস্তিত্বের কুত্তাচোদা লঘুতা।
সাবিনা চরিত্রটির জীবনের প্রধান ড্রাইভ হইতেছে বিশ্বাসঘাতকতা বা বিট্রেয়াল। এটা তার সচেতন সিদ্ধান্ত। কেন? উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় অভিজাতরা আবিষ্কার করে, যে, মলমূত্র শুদ্ধ মানব জীবনের সাথে বেমানান! এই ধারণা তাদের উপর ভর করছিলো ওই সময়কার ক্রিশ্চিয়ান থিওলজিস্টদের থিকা। সমসাময়িক একটা গুরুত্বপূর্ণ ডিবেটের টপিক ছিলো, ঈশ্বরের পুত্র জেসাস ক্রাইস্ট কি হাগা-মুতা করতেন? জবাব আসতো, জেসাস খাবার-পান সব করতেন, কিন্তু মলমূত্র ত্যাগ করতেন না। মলমূত্রকে অপবিত্র মনে করার একটা ট্রাডিশনের সিলসিলা শুরু হয় তখন থেইকা। এরপর তা সব রকমের জীবনঘনিষ্ট নোংরামিকে অস্বীকার করবার একটি দার্শনিক তত্ত্ব হিসেবে দাঁড়ায়। সেক্স কে অরিজিনাল সীন মনে করার যেই বিবলিকাল ইন্টারপ্রিটেশন সম্ভবত তখন থিকা তা জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে। তো, ওই দার্শনিক তত্ত্বটারে জার্মানে বলা হতো কিশে, Kitsch। আর্টের বিপরীতে এই কিশে। জীবনকে এক কিসিমের পবিত্রতার চাদরে ঢাকার প্রবণতা ছিল অধিকাংশ ইউরোপীয় মানুষের মাঝে। ক্রিশ্চিয়ান সভ্যতার এই পপুলার বিবলিকাল তাফসির’রে ভূয়া মনে করতো সাবিনা, তাই ঘৃণা করতো ওইসব। যেহেতু পেইন্টার ছিলো শে, তার ছবিতেও দেখা যেতে সুন্দর ও পরিপাটি ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়া নোংরা কিছু বের হইয়া আসছে! যেসব থিওলজিস্ট জেসাসের মলমুত্রকে অস্বীকার করতো তাদেরকে শে দেখাইতো চটের কাপড় পরে ক্রাইস্ট হাগতেছেন! সাবিনার বাবা মা ছিলো না বিধায় অতীতের লগে তার একমাত্র যোগাযোগের উপকরণ ছিলো উত্তরাধিকার সূত্রে তার দাদার থিকা পাওয়া একটা কালো ক্যাপ। শে নগ্ন হইয়া ক্যাপটা মাথায় দিয়া তার প্রেমিকের সামনে কমোডে বসার ফ্যাটিশ বা ফ্যান্টাসিতে ভুগতো, কারণ ক্যাপটা ছিলো নোঙ্গর, তাকে শেকড়ের কথা মনে করায়ে দিত। এইভাবে শে চাইতো তার শরীর, অতীত, ভালোবাসার সৌন্দর্য, এবং তার পোর্সেলিনের কমোডে বসে পেট খালি করার কদর্যতা সবকিছু একসুতায় বাধা পইরা এক কিসিমের সৌন্দর্য সৃষ্টি হোক! সৌন্দর্য এবং নোংরামিকে বিপরীতার্থক মনে করাটা একধরনের প্রোপাগান্ডা বইলা শে মনে করতো। সৌন্দর্যের বিপরীত হচ্ছে কুৎসিত, কিন্তু নোংরামি হইতেছে একটি সামাজিক ব্যাপার-স্যাপার, যার উল্টা হইলো ভদ্রতা।
খেয়াল করলে দেখা যায়, যৌনতা নিয়ে ডীল করার সময় কুণ্ডেরা মোরাল অথরিটি হয়ে উঠেন না, সন্তর্পণে মানুষের মাঝে যে অসংখ্য ডিফেক্টের বসবাস তা প্রকাশ করতে করতে সাব-কনশাস বা কখনো আন-কনশাস মনের কারবার বুঝার চেষ্টা করছেন। তার শর্ট স্টোরিজগুলা দুর্দান্ত এই ব্যাপারে। তার সময়কার যে পিউরিটান অতি-নৈতিকতা এবং তা যে বেশিরভাগ সময় আশ্চর্যজনকভাবে কমিউনিস্ট কম্যুনিটিরও ব্যাপার তা পরিষ্কার করছেন ফিকশনের পরতে পরতে। এইভাবে যৌনতার এক্সপ্লোরেশন যেই ব্যাপারটারে উসকে দেয় বা ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখে তা হলো এক্সিস্টেনশিয়ালিজম। মানে উপন্যাসের ঘটনাগুলোরে যদি আমরা ‘What if’ থিওরীর অধীনে আনি ও জোড়াতালি দিয়ে সামারাইজ কইরা বলি, যে, যদি একজন ছেলে ও মেয়ে হালকা হওয়ার দিকে ছুটতে গিয়ে দুনিয়াদারি করতে চায় তবে তা কিরকম ফল বয়ে আনবে? মানে, পোস্টমডার্নিজম তো মনে করে, যে, সব গল্প বলা শেষ ফলে কিভাবে গল্পটা বলা হচ্ছে তাই মূলত গল্প এখন। গল্পের সাথে যেহেতু কল্পনা ও ক্রিয়েটিভিটির গলায়গলায় ভাব, ফলে বেশিরভাগ সময় এটির শুরু হওয়া হয় ‘হোয়াইট ইফ’ প্রশ্নের সাথে বুঝাপড়া করে করে। যেমন, What if একজন মানুষ তার ছোটবেলার স্মৃতি মনে করবার চাচ্ছে যেখানে শৈশবের কথা তার খুব একটা মনে নেই এবং এই করে করে সে মূলত স্মৃতির মাধ্যমে ধরতে চাচ্ছে তার নিজস্ব টাইম কনশাসনেস’রে। এইবার আপনি মার্সেল প্রুস্তুের ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’ পড়েন, ব্যাপারটা ধরতে পারবেন, মানে ক্যামনে এটা লিটারেরি ফিকশন বনে যায়।
একটু পরিষ্কার করা দরকার, যে, সাহিত্য এখনো অতো ডেমোক্রেটিক আর্ট ফর্ম হতে পারে নাই। এক্সেসের বিচার মাথায় রাইখা মিউজিকের লগে লিটারেচারের তুলনা করলে ব্যাপারটা ধরা যাবে। সাহিত্য পড়ার জন্য যেহেতু শিক্ষার দরকার হয়, অশিক্ষিত ও বিদেশি অনেক লোকের ছোঁয়ার বাইরে থাকে। কিন্তু মিউজিকের অতো প্যারা নাই, কান চালু থাকলেই উপভোগ করে মতামত দেয়া যাচ্ছে, এজন্যে এরে বলা যায় গণতান্ত্রিক আর্ট ফর্ম। ফলে সাহিত্য সমালোচনায় সমালোচকের অথরোটেরিয়ান হবার চান্স বেশি থাকে, হয়ও সম্ভবত, অথবা ক্রিটিক কথাটায় নিজের বুঝের যে প্রচারণা চালাবে তা তো লুকাইয়া থাকেই। ব্যবসা বিচারে বেশি বেচা হইছে এমন সাহিত্যরে গার্বেজ বলে মত দিবার পারে সমালোচক, কম পড়া হইছে এরকম কিছুতে গ্রেট কিছু ছিলো বইলা দাবি করতে পারে ক্রিটিক, মনমতো এজাম্পশন ধইরা নিয়া একটা ভিজ্যুয়াল বা অক্ষরের কোর্ট বসাইয়া আরো যে কতো কি পারে! এজন্যে সমালোচনায় কিছু ব্যাপার ধরে নেওয়া হয়, যেমন, ধরা হয়, একজন ভালো লেখক একটা নির্দিষ্ট রকমের আর্টিস্টিক সমস্যার কথা মাথায় রাইখা ওয়েল রাউন্ড ক্যারেক্টার ও গল্পের দুনিয়া তৈয়ার করেন। চরিত্র যখন পুরাপুরি বানানো হয়ে যায় মাথায়, তখন স্টোরি ওয়ার্ল্ডে ছাইড়া চরিত্রদের মধ্যে বাতচিত করিয়ে লেখক মূলত একটা থট এক্সপেরিমেন্টের ভিতর দিয়া যান। এইভাবে সেন্সিবল একটা আর্ট সৃষ্টি হয়, যেইটা লিটেরারি ফিকশনে ঢুকবার চান্স তৈরী হয়। যেই ফিকশন নতুন নতুন জিনিস এক্সপ্লোর করে সাহিত্যের দখলে নিয়ে আসে, হতে পারে তা কোন টেকনিক বা এক্সপ্রেশন অথবা মানব মনের গহীন কিছু কিম্বা এমন ব্যাপার যা আগে কখনো সাহিত্যে ছিলো না, তাই লিটারারি ফিকশন। এই ঘরানার ফিকশন সেন্টিমেন্টাল না, বরং সেন্সিবল হেতু লিটারারি। সেন্টিমেন্টাল ব্যাপার দিয়া সেন্সিবল কাজ যেহেতু কম হয়, সেহেতু অনেকসময় সেন্টিমেন্টাল লেখাজোঁকারে সেন্সিবল মনে হতে পারে, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তা উদাম হইয়া যায়। নয়া অর্থ দিতে পারে না সেইসব লেখাজোখা বা পাঠক আগ্রহ হারায় ওই আর্ট বা ফিকশনে এবং আর্টিস্টিক কন্ট্রিবিউশানের অজুহাতে ক্রিটিকও নাম নেয় না সমালোচনায় বা কম মর্যাদা দেয়। ধরা যাক ভ্লাদিমির নবোকভের কথা, যিনি রাশান সাহিত্য নিয়া ক্রিটিক করবার গিয়া দস্তয়ভস্কির সমালোচনা করেন ও অভিযোগ জানান, যে, দস্তয়ভস্কি’র আর্টিস্টিক ব্রিলিয়ান্সি ও সেন্সিবিলিটি ছিলো না। কারণ হিসেবে দেখাইছিলেন উনার ভিতর তৎকালীন ইউরোপীয়ান সস্তা রহস্য থ্রিলার উপন্যাসের প্রভাব। আমরা কুণ্ডেরার এই উপন্যাসে ‘হোয়াইট ইফ’ ব্যবহার করে তার আর্টিস্টিক এচিভমেন্টের দেখা পেতে পারি, যেহেতু লিটারেরি সাহিত্যিকদের জিনিয়াসের দেখা মিলে এই পথে। একইসময় উপন্যাসের একটা বিগার পিকচারও আমরা দেখি, যেইটার মাধ্যমে মনস্তত্ত্ব ও যৌনতার ভিতর দিয়া যে অস্তিত্ববাদের পারপাস সার্ভ করা হচ্ছে তা বুঝা যায়। বাঙলা সাহিত্যেও এই রকমের কাজকাম আছে, শহীদুল জহির ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে তা দেখা যায়, তবে শহীদুলে এক্ষেত্রে যেরকম স্বতঃস্ফূর্ততার ব্যাপার আছে মানিকে তা নাই, এক্ষনে ফিকশনের ভুবন তৈয়ারে বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বের কাছে বেশি আশ্রয় লওয়াটারে দায়ী করা যায় তত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বে জুতসই জোড়া বা গিট্টু না লাগার ব্যাপারটা। কারণ তত্ত্বের ধারণায় সত্তা হিসেবে মানুষের অতো আটবার কথা না, তার উপর মনস্তত্ত্ব ও মানবিক সব দোষ খোঁজা যদি হয় আর্টের মনজিলে মকসুদ, তাইলে ফিকশনের পুকুরের পানি ঘোলা হইয়া যাবার কথা, খালি হাতে মাছ ধরবার কারবারে তখন তা এক রিস্কি প্রজেক্ট বটে। কারণ তত্ত্বের যোগবিয়োগেই মনোযোগ উনার, ফিকশনে ততো না। হ্যারল্ড ব্লুমের নাম নিতে পারি এইখানে, সাহিত্যে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর অভিযোগে তিনি ওয়েস্টার্ন ক্যাননে দস্তয়েভস্কির নাম নেন নাই, জায়গা দেন নাই ওই জিনিয়াসরে জায়ান্টদের লিস্টে। এমনকি চেকভ ও নবোকভের রেফারেন্সে বলবার চাইছেন দস্তয়েভস্কি কম রাইটার বেশি প্রফেট…! এই দিক দিয়া কুণ্ডেরা তে মানুষ বটেন’ই, সাথে মনে হবে রক্তে-মাংসে বরাবর যেন হিসাব।
অনেকে কুণ্ডেরারে নারীর প্রতি অবজেক্টিফিকেশনের দায় দেয় এবং তা অনেকাংশেই প্রাসঙ্গিক মনে হবে। কিন্তু অবজেক্টিফাইড হওয়া নারীদের দিকে নজর দিলে বুঝা যাবে, ওরা নিজেরাই যেন অবজেক্টিফাইড হতে চাচ্ছে ওই ফিকশনাল রিয়েলিটিতে! এতোই শক্তিশালী এদের গড়ন, ইউরোপীয় ফ্রি উইলে একদম একহারা শরীর যেন, নিজেদের নিয়তি নিজেরাই বেছে নেয় মতো অবস্থা। এবং আপাত পরাজিত মনে হলেও চোখা চোখে ধরা দিবে তা মূলত দুঃখবিলাস বা স্বেচ্ছায় বেদনার্ত হতে চাওয়া। গডলেস স্পিরিচুয়ালিটির পারপাসও সার্ভ করে তা কখনো, এবং তা পশ্চিমা দর্শনের নিজস্ব বুঝাপড়ার ফিকশনী কোশেশ বললে যথাযথ হয়। ফলে তাও এক কিসিমের নারীবাদী অবস্থান, যেইটা একদম ফরাসি। কিন্তু আবার তা এরকমও না যে অযৌক্তিক, অনৈতিহাসিক বা প্রতিক্রিয়াশীল। যেমন এক ধরনের পপুলার বয়ান আছে, ভাষা যেহেতু পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি ফলে ওই দিয়া নারীদের অনুভূতিরে ধরা যাবে কম বা যাবে না। কিন্তু তা তো না, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নানান শব্দের যে অর্থ ওইগুলার বিপর্যয় ঘটে বটে, কিন্তু তাই বলে ভাষা নিজে পুরুষসৃষ্ট হয়ে যায় না। জিনগতভাবে ভাষার আগে পুরুষ জন্ম নিছে এমন অনুমানের গোড়া নড়বড়ে, ভিত্তি পাওয়া যায় না শক্তপোক্ত বা এখনো এরকম কিছু হইছে নামে কোন মালমশলা পাওয়া যায় না একাডেমিয়ায়। কিংবা পুরুষ আগে ভাষা সৃষ্টি করছে, আর পরে নারী তা শিখে নিছে এমন কল্পনার পক্ষেও কোনো উপাত্ত নাই। ধরা যাক হিউম্যান শব্দটার কথা, যেখানে হিউ এর উপর ভর দিয়া ম্যান দাঁড়ায়ে আছে, human এর লগে man কিম্বা woman এর উৎপত্তিগত কোন সম্পর্ক নাই। human শব্দটা আসছে ফরাসি humain থিকা যার সবচে পুরনো অর্থ হলো ভূমিজ বা ভূমির বাচ্চা মতো কিছু। এই কথা man, woman এর ক্ষেত্রেও, উৎপত্তি ঘাটলে দেখা যায় ‘ম্যান’এর আদি অর্থ মানুষ; এদের রূপমূলও এক মান- (সংস্কৃতে যেমন মনু, মনুর সন্তানরা মানুষ)।
হিস্ট্রি’তে আসেন, অনেকে history কেও his story -এর কোলাজ ধইরা থাকে এবং ইতিহাসের পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বলে চালায় এরে। কিন্তু গোড়ায় এখানে his কথাটা নাই। বরং শব্দটা আসছে হিস্টর থিকা, গ্রিকরা এটা পাইছে প্রোটো ইন্দো ইউরোপীয়ান (PIE) wid-tor থেইকা; সংস্কৃতে একই জিনিস বিদ+তৃ অর্থাৎ বেত্তা (অর্থ অভিজ্ঞ বা জ্ঞাত)। ইন্দো-ইয়োরোপীয়ানরা যেহেতু লিখে যায় নাই কিছু, এর সুবিধা নিয়া গ্রিকরা ডব্লিউ’রে এইচে (W=H) কনভার্ট কইরা নেয় নিজেদের জিহ্বার সুবিধার্থে। রোমনরাই মূলত হিস্ট্রি শব্দটার আজকের মিনিং যেইটা, ইতিহাস, ওইটা দিছিল। কিন্তু পপুলার বুঝে পিষ্ট হইয়া লোকজন অনলাইনে ডোমেইন কিনতেছে ‘herstory’ নামে, যেহেতু তাদের বুঝাপড়ার হিসেবে হিস্ট্রি মূলত “His story” ফলে জনম দিতে হচ্ছে নয়া শব্দের, দরকার পড়তেছে শুদ্ধিকরণের বা প্রতিশোধের! কিন্তু প্যাট্রিয়ার্কি কি কাজ করতেছে না ভাষায়? করছে, যেমন, werman এবং wifman এর wer আর wif বাদ দিলে যা থাকে, তার অর্থ করা যায় লোক, পুরুষলোক ও মাইয়ালোক। কিন্তু লোক বললে তো পপুলার অর্থে চলে পুরুষলোক! তাই বইলা তো বেজায়গায় এর প্রতিশোধ নেয়া যায় না। কবিতায় ছাড় দেয়া যায় বড়জোর, যেমন ফরহাদ মজহার লিখতেছেন,
“ঘোড়াশালে ঘোড়া আর হাতিশালে হাতির মতো মহলে মহলে থাকো
তাই তোমার নাম মহিলা”
কিন্তু মহিলা শব্দটার মূল কিন্তু ‘মহ’, যেইটা মহানের মূল ‘মহ’। মহাশয়, মহিলা একই মূল থিকা আসছে। মহলে থাকেন বইলা মহিলা না নারীরা। ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’ কাব্যের যেই ‘মহল’ তা আরবি শব্দ, কিন্তু মহিলা’র আগমন ঘটেছে সংস্কৃত রূপমূল থেইকা। কিন্তু আর্টের নাম যেহেতু ‘কর্তৃত্ব গ্রহণ কর, নারী’, এবং একিসাথে এটা যেহেতু কবিতা ফরম্যাটের জিনিস ফলে এরে ছাড় দেয়া যেতে পারে…
মার্ক্সিস্ট হওয়াটা নাকি মার্ক্স নিজেও পছন্দ করতেন না। কিন্তু যুগের প্রয়োজনে মার্ক্সের কিছু বুঝাপড়া যখন কমনসেন্সে রূপান্তরিত হয় তখন ‘মার্ক্সবাদী না’ এরকম অবস্থানও সুবিধার না। কারণ যেই যেই পাটাতনে দাঁড়িয়ে আমাদের পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা পক্ষে অবস্থান অথবা সংস্কারের প্রস্তাব দিতে হচ্ছে, তার লগে উনার বুঝাপড়ার একটা যোগসাজশ আছে, বা থাকেই। এই তো গেলো বই-পুস্তকের কথা, কিন্তু বাস্তবতা তো একি নাও হতে পারে, এই যখন অবস্থা তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন দেখা কুণ্ডেরা উপন্যাসটায় লিখেন,
“When the crimes of the country called the Soviet Union became too scandalous, a leftist had two choices: either to spit on his former life and stop marching or (more or less sheepishly) to reclassify the Soviet Union as an obstacle to the Grand March and march on.”
কুণ্ডেরা ভাবতেছেন, যেহেতু স্তালিনের অন্যায়গুলা প্রকাশ হইয়া গেছে সেহেতু কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সেই পাপকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিলনা। কমিউনিস্টদের পক্ষে তো তা আরও অসম্ভব, যেহেতু বস্তুবাদী তারা, ফলে ভাববাদে কম যাবে। সুতরাং নিজ দেশে সোভিয়েত পার্জের খবর শুনা মাত্রই বামপন্থীরা একধরনের মোরাল ডিলেমায় পতিত হবে, নৈতিকতার দ্বিধাবোধে খাবি খাবে তারা। কারণ যে দুইটি পথ তিনি খোলা আছে বলে ভাইবা নিছিলেন, কোনটাই সোভিয়েত পাপকে অস্বীকার করেনা। কুণ্ডেরা ধইরা নিছিলেন পাপকে অস্বীকার করা যাবে না, যায় না। কিন্তু ডগমাকে তো পুনর্বিবেচনা করা যেতেই পারে। পাপ যে তার দায়দায়িত্ব এড়াতে পারে না কুণ্ডেরার প্রধান চরিত্র এই নিয়া একটা প্রবন্ধ লেখে। সেখানে সফেক্লিসের ইডিপাসের প্রসঙ্গ থেকে টমাস দেখায় যে, যখন ইডিপাস সত্য জানে, যে, না জেনেই সে তার পিতাকে হত্যা করছিল এবং তার মায়ের সাথে বিছানায় গেছিল, তখন সে নিজহাতে নিজের চোখ দুইটা নষ্ট কইরা দেয় এবং থিবস নগরী থিকা অজানার পথে পাড়ি জমায় ও ভবঘুরের মত হারায়ে যায়, ফেলে যায় তার ক্ষমতা। ইডিপাস এই বইলা স্বান্তনা দেয়না নিজেরে, যে, সে সত্য জানতো না বা আসলে ভালো করতে গিয়া খারাপ কইরা ফেলছে অথবা অন্য কেউ ইনসেস্টে লিপ্ত আছে কিনা তা খুঁজতে যায় না ইতিহাসের পাতায় পাতায়। বরং নিজের পাপের দায় সে এড়ায় না, নাই। কারণ পাপ হচ্ছে পুণ্যের বিপরীত। ফলে এর জন্যে যারা দায়ী, জ্ঞানের অভাবে হোক আর ইচ্ছা কইরাই হোক, তারা দায় এড়াতে পারে না। পাপীর কোন এথিকাল অবস্থান থাকেনা অন্যের পাপের হিসেব নেবার।
কথা আসতে পারে, পাপের সাথে তো রিলিজিয়ন এর ওতোপ্রোতো সম্পর্ক, ধর্মরা না থাকলে কি পাপ বইলা কিছু থাকবে না, ছিলো না? অথবা যেসব এলাকায় যখন প্রাতিষ্ঠানিক রিলিজিয়ন গড়ে উঠে নাই, তখন ওই এলাকার লোকেরা কি অপরাধই করতো খালি, পাপের অনুভূতি কি অনুপস্থিত ছিলো? হাম্বুরাবি কোডেরও আগে যখন রুলসগুলো লিখিত হয় নাই, মৌখিক ছিলো, তখনকার লোকদের ভালো বা খারাপ অনুভব করার ফীলিংস কি ছিলো না? দলবেঁধে থাকতে গিয়া নিয়মবহির্ভূত কিন্তু ভালো এরকমের কাজ কি তাদের ভিতর কেউ করে নাই? অথবা নিয়মবিরুদ্ধ খারাপের বিপরীতে কারো কি কোন খারাপ লাগা কাজ করে নাই? যদি করে, সেই ভালো বা খারাপ লাগারে সিন বা ভার্চুর আম্মা বলা যায় কিনা? অথবা অরগানাইজড রিলিজিয়নের অবর্তমানে হয়তো ওইগুলাই সমাজের লক্ষ্য ঠিক রাখতো, রুলস বা কোডগুলার যেহেতু পানিশমেন্টের মতো আরেক আইডিয়া ডীল করবার ব্যাপার ছিলো। অপরাধ কখনো কিন্তু সওয়াবের মতো ব্যাপার, অনপরাধ কিসিমের পাপের ব্যাপারও সেহেতু থাকবার কথা। মানুষের আমলনামা ধরে যদি আগাই, আমরা দেখবো, নিজেনিজে প্রতিশোধ নেয়া কখনো সওয়াবের যা রাষ্ট্র কর্তৃক অপরাধ বলে স্বীকৃত, যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। আবার অনেক পাপকে বাধ্য হইয়া মেনে নেয়ার মতো ব্যাপার আছে, নাগরিক হওয়ার লোভে এক্ষেত্রে পাপী হতে হয় লোকেদের, এইভাবে ধর্মকে পাপের অনুভূতি বা খারাপ লাগার বোধ আরো প্রাসঙ্গিক বানাচ্ছে মানুষের যাপনে।
নৈতিকতা ধইরা আগাইলে ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করা যেতে পারে। এরকম একটা কথা আছে যে, যে যাই বলুক না কেন তা পাত্তা না দিয়া ঠিক কাজ করার নামই হলো, মোরালিটি ও এথিক্সের সমন্বয়, নৈতিকতা। এরকম অনেকগুলো ঠিক কাজ যখন একটা কমন পাটাতনে হাজির হইছে তখন এ নাম পাল্টে হলো রিলিজিয়ন বা ধর্ম। তখন রিলিজিয়নের সংজ্ঞা হইয়া গেলো, ন্যায় যাই হোক না কেন তাতে মাথা না ঘামিয়ে যা বলা হইছে তা ঠিকঠাকভাবে করাই হলো ধর্ম। প্রাথমিকভাবে এই দুই বাইনারি’তে নৈতিকতারে তুলনামূলক বেটার পজিশন মনে হবে, কিন্তু একটু খেয়াল করলে বুঝা যাবে, অনেকগুলো ধর্মের মতো অনেকগুলো নৈতিকতাও এক্সিস্ট করে দুনিয়ায়, ধর্মের আগমনে কিছু নৈতিকতা ধর্ম নাম পাইছে মাত্র! যখন নৈতিকতা ধর্মহীনভাবে এক্সিস্ট করতেছে তখন কিন্তু তাও একটা পাটাতনের নীচে দাঁড়ানো, এবং তা হলো ইডিওলজি। তার মানে বর্তমানে নৈতিকতারে নিউট্রাল কোন পজিশনে লোকেট করলেও তা অতো নিরপেক্ষ নাই কিন্তু, যেকোন একটা ইডিওলজির পারপাস সার্ভ করতেছে মোরালিটি। কিন্তু নৈতিকতারে ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে ধরা যায় কখনো, যখন ধর্ম ও ইডিওলজির প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। নৈতিকতা যখন বেশি পার্সোনাল, তখন ভালো ও মন্দ বা ন্যায় ও অন্যায়ও সাবজেক্টিভ, ফলে সভ্যতার শুরুর দিকে ওইসব অনুভূতি মানুষের ছিলো, কিন্তু ধর্ম ফর্ম না করায় তা পাপ ও পুণ্যে বিভাজিত ছিলো না হয়তো, কিন্তু ফীল গুড ও ব্যাডের ব্যাপার যে ছিলো তার আন্দাজ অযৌক্তিক নয়।
প্লেটো, ভার্চু এথিক্সের ড্যাডি, এর যেই দর্শন তার লগে সক্রেটিসের বিবেকবাদের তফাত আছে। মিথ্যা বলা ভার্চু না, ফলাফল যতোই ন্যায়সঙ্গত বা ভালো হোক না কেন মিথ্যা ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের দুর্বলতার চিহ্ন, ফলে ভালো উদ্দেশ্যে মিথ্যা বললেও এর বিপরীতে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। সক্রেটিসের বয়ান হলো, বিবেক হলো মানুষের স্বাভাবিক গুণ, ফলে নিজেকে মূল্যায়ন করতে হবে বিবেকের সহযোগিতায়। ডিওন্টোলজিকাল এথিক্সে দায়িত্ব একতরফা, নিয়মানুযায়ী যা করবার বাধ্যবাধকতা আছে তা করতেই হবে, কান্ট এ ধরনের নৈতিকতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন ক্যাটাগরিকাল ইম্পারাটিভ বা নিঃশর্ত নৈতিক দায়িত্ব’কে। কোন রেপিস্ট যদি আপনার মাইয়ার ঠিকানা জানতে চায়, যে, শে কই লুকাইয়া আছে, বাপ হইয়াও তারে তা বলতে হবে, কারণ মানুষ হিসেবে সত্য বলা আপনার মানবিক কর্তব্য বটে। পরিণামবাদী নৈতিকতার উস্তাদ এরিস্টটল বলেন, কোন কাজের নৈতিক ঔচিত্য নির্ণয়ের একমাত্র উপায় হলো তার পরিণাম বিশ্লেষণ করা, কোন কাজই এমনিতে নৈতিক বা অনৈতিক না, পরিণামই নির্ধারণ করে কোন কাজ সঠিক ও কোন কাজ ভুল।
তো, নৈতিকতা নিয়া এতো বাতচিতের কারণ হলো, পোস্ট-মডার্ন সময়ে পোস্ট-মডার্নিস্ট হিসেবে কুণ্ডেরা পাপের প্রাসঙ্গিকতা কিভাবে জায়েজ করতেছেন তা বুঝা। রাজনৈতিক রেথোরিকে (Rhetoric) পাপের ধারণা যে জরুরি ও কার্যকরী গুজব বা বিপ্লবী কাজ হিসেবে হাজির হতে পারে তার সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে তেনার উপন্যাসে। সমসাময়িক সময়ের রাজনীতিতে থার্ড ওয়ার্ল্ড তো বটেই ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের ক্ষমতাসীনরাও (ভোটে বা ভোটচুরি) যে নিজেরে লেজিটিমেট দেখানোর জন্যে যে পুরানো ঘটনাবলীরে ভাইরাল করে করে কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করবার কোশেশ চালায় যায় ও তাতে সফলও হয়, তার বিরুদ্ধে কুণ্ডেরার উপন্যাসের চরিত্র কথা বলে, অথোরেটেরিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে যুক্তি হাজির করে, ইভেন তাতে ধর্মের ছোঁয়া থাকলেও, এমনকি ম্যাটা-ন্যারাটিভকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত না করবার রিস্ক লইয়াও। টমাসের চোখে প্রাগে সোভিয়েতের এটাক অনেকগুলো পাপের মধ্যকার একটা পাপ। এজন্যে পার্টির প্রতি তার আর কোন সহানুভূতি নাই, এবং সে মেটাফোরিকালি বুঝায়, যে, যেহেতু পাপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তখন সেই পাপের গ্রেকো-শাস্তি হিসেবে নিজেদের চোখ উপড়ে ফেলে অজানার পথে হাঁটা উচিত দখলদারদের। এইভাবে পাপের একটা সংজ্ঞাও আবিষ্কার করা যাচ্ছে, যে পাপে জনসাধারণের ভুক্ত হবার ব্যাপার নাই, শাসন করবার দায়িত্ব যাদের উপর, নির্বাচিত বা অনির্বাচিত, তারাই এতে বিদ্ধ হবে এবং ক্ষমতা ও দৃষ্টিশক্তি বিসর্জন দিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করবে।
এই উপন্যাসের একটা নোট করবার মতো ব্যাপার হচ্ছে, একটা ঘটনা একাধিক পারস্পেক্টিভ থেইকা বর্ণনা করার ভঙ্গি। জাপানিজ রাশোমন ইফেক্ট নামে যেই জিনিস আর্ট-কালচারে পাওয়া যায় তারে ধরতে চাওয়ার কোশেশের মতো, কুণ্ডেরা এই দিয়া যে দুই-তৃতীয়াংশও ধরবার পারেন নাই তাও না। একই ঘটনা বিভিন্ন ব্যক্তি স্ববিরোধীভাবে যখন বয়ান করে তখন যে অবস্থার উদয় হয় তারে বলা হয় “রাশোমন ইফেক্ট”। এর কারণ হিসেবে আকিরা কুরোসাওয়া তার অটোবায়োগ্রাফিতে বলতেছেন, যে, মানুষ নিজের সম্পর্কে সৎ হইতে পারে না। তো, এটারে খুব নয়া কোন ন্যারেটিভ না হলেও ঐ সময়ের প্রেক্ষিতে ওইটা ছিলো বহুল ব্যবহারে জং না ধরা এক গুরুত্বপূর্ণ ন্যারেটিভ টেকনিক। এর লগে মিলিয়ে আমরা যদি কুণ্ডেরার যৌনতা নিয়ে কারবার দেখি তাহলে এই উপন্যাসকে লিটারেরি ফিকশন বলাটা বাড়াবাড়ি মনে হবে না। এই উদ্দেশ্যে আমরা সামারিটা বলি এখানে। যদিও লিটারেরি ফিকশনের লেনদেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যারেক্টার এক্সপ্লোরেশনে, তবুও পোয়েটিক্সে এরিস্টটলের ফরমুলা অনুযায়ী যদি নভেলের সব ঘটনাগুলারে থ্রি-এক্ট স্ট্র্যাকচারে বাঁধি, এবং তাহলে একটা করে বিগিনিং, মিডল ও এন্ডিং দেখবো আমরা। রাশোমন ইফেক্টের বদৌলতে লেখকের বর্ণনার ফুলঝুরি এক কিসিমের জাপানি রৌশন ছড়াচ্ছে। কিন্তু তার গড়ন যে অনেকটা ইউরোপীয় ধাঁচের বা কম জাপানিজ তা স্বীকার করতে হয়। ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানের একচেটিয়া আধিপত্যের যেই ‘সিভিলাইজেশ্যনাল’ দাবি তার বিপরীতে যেমন মেসোপোটেমিয়ার কথা বলি আমরা, সেভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারও তর্কে বা রেকর্ডেড হিস্ট্রির আওতায় আনতে হবে, নাইলে অন্যান্য অনেক কিছুর মতো মডার্ণ ট্যাটুর আলোচনা যেরকম জাপানি অরিজিনের বিস্তারিত ব্যাপার না এসে আমেরিকান বা ইংলিশ হিস্ট্রির গুণকীর্তন দিয়া শুরু হয় অথবা মানচিত্রের কেন্দ্রটা যেরকম চিরতরে ইউরোপীয় বানানো হইছে ওইরকম সবকিছুর গোড়ায় পাবো একখণ্ড আদিপাপে মোড়ানো ইউরোপ।
এই উপন্যাসের কয়েকটি অনুবাদ পড়া হইছিলো। একটা আশপাশ দিয়া গেলেও বাকিগুলো মনে হয় না কুণ্ডেরার যেটা স্টোরি ড্রাইভার ওইটাকে ধরতে পেরেছে। উইয়ার্ড এবং কমিক টোনের ভিতর দিয়া কুণ্ডেরা এক্সিস্টেনশিয়ালিজম নিয়ে ডীল করেন। এবং এটাই সম্ভবত তার এলিমেন্ট এটাচমেন্ট। মানে, গল্পো যখন লিখেন কোন গল্পকার তখন লিখতে লিখতে কিছু এলিমেন্টের সাথে তার সম্পর্ক বাড়ে, বৃদ্ধলোকের যেরকম লাঠি থাকে ওইরকম, বৃদ্ধ হতে লাঠি থাকা বাধ্যতামূলক না কিন্তু কোন বৃদ্ধের চিত্রায়ণ যখন আমরা করি তখন অজান্তে একটা লাঠি চলে আসে কল্পনায়, ওইরকম লেখকের লেখার অভ্যস্ততা কিছু ডিভাইসের সাথে তার এটাচমেন্ট বাড়ায়, যেইটাকে ন্যারেটোলজির ভাষায় এলিমেন্ট এটাচমেন্ট বলা হয়। এই লাঠি লেখকের সিগনেচার হিসেবে কাজ করে, নিজস্ব ভয়েস দেয় গল্পে, আর পার্সোনাল স্টাইল তৈয়ারে সাহায্য করে। আবার এমনও হয়, যখন ওই লাঠি ছাড়া বৃদ্ধ হাটতে পারে না মতো সময়, তখন ওই পার্সোনাল স্টাইল বাহুবল বা স্ট্রেন্থ বনে যায় লেখকের, সিগনেচার হিসেবে কাজ করে। এই ব্যাপারটা যদি কোন অনুবাদক মিস করে তখন অনুবাদ বোরিং হয়, পাঠক বুঝতে পারে না মূল লেখকের নামডাকের রহস্য, ফাঁপা জিনিসরে মহান করছে ধরে নিয়ে অনুবাদ কিসিমের বই কিনাটারে লস প্রজেক্ট মনে করে। বিদেশি সাহিত্যের বাঙলা তর্জমা নিয়া নোক্তা রাখা গেলো এখানটায়, পরে কোথাও আরো বিস্তৃত লেখা যাবে এদেশের তর্জমা ইন্ডাস্ট্রির নানান সম্ভাবনার কথাদের।
কুণ্ডেরার পলিটিকাল হওয়া বলতে কি বুঝতেন, যেইটা পরে নানান ইন্টারভিউ ও লেখাজোঁকায় পরিষ্কার করছিলেন, এর একটা সামগ্রিক চিত্র আমরা এই নভেলে পাই। উনি পুরোপুরি পলিটিকাল, কিন্তু পার্টিজান বা কোন পার্টির হয়ে কাজ করার লোক না। কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে উনার বহিষ্কারের ঘটনাগুলোসহ এক কিসিমের রূপকের ভিতর দিয়া তিনি নভেলের চরিত্রদের নিয়া কথা বলান। অবশ্য এইভাবে ক্রিটিসিজম করাটা রিস্কিও বটে, কারণ ফিকশনের সাথে বাস্তবের সম্পর্ক থাকাটা বাধ্যতামূলক না বরং অনভিপ্রেত, এক ঢিলে দুই পাখিই পলাইতে পারে কখনো, কিন্তু চরিত্রগুলোর সেটিং এতো বেশি ইউরোপীয় ও সমসাময়িক যে বোল্ড গেস করবার লোভ সামলানোও কঠিন। হে পাঠক, ক্ষমা করো!
এইক্ষণে আমাদের আর্ট বনাম কিশে (Kitsch) এর আলাপে যেতে হবে। আর্ট তো চিনি আমরা, কিশে হইলো প্রোপাগান্ডা বা আর্টের বাজে রূপ। টমাস রেডিকাল লেফট এক ম্যাগাজিনে “কিং ওডিপাস” নামের এক লেখা লিখে, যেখানে সফোক্লিসের যেই আর্টি ডিসিশন, মোরালিটির চাপে ওডিপাসের চোখ তুইলা নেয়া নিজে নিজে, তার এপ্রিসিয়েশন নিয়া ক্রিটিকাল এনালিসিসের মতো লেখাটার কথা আগে বলা হইছিলো। কুণ্ডেরা ওইটারে আর্ট বলতেছেন, কিন্তু পরে ওইটার আউটকাম যা রূপান্তরিত হইতেছে তারে বলতেছেন কিশে। কিভাবে? ওই লেখা যখন ভাইরাল হয়, পত্রিকায়, তখন টমাস’রে ধরে চেকপ্রজাতন্ত্রের কম্যুনিস্ট রেজিম, বলে যে, তুমি এখানে এলিগরির আশ্রয় লইয়া মসনদে বসাদের চোখ তুইলা নিতে কইছো। মানে, টমাসের আমাদের শওকত ওসমানী নসীব ছিলো না আরকি, যে, ক্রীতদাস কি দেইখা হাসে তা বুঝতে ব্যাকুল হয়ে আছে সোভিয়েত কম্যুনিস্টদের পাপেট শাসক। আবার, ওই ক্রিয়েটিভ রাইটিং যাদের পক্ষে যায় সেই অপজিশনও এর ফলে ঘটা পলিটিকাল চাপ সামলাতে পারতেছিল না, ফলে তারাও লেখকের পক্ষ নিতে পারতেছে না স্বতন্ত্রভাবে। মূলত, কুণ্ডেরা এখানে কিশের সেন্টিমেন্টালিটি দেখান, সাবিনার মতো টমাসের কাছেও যা ফকফকা হয়, কারণ নায়ক দেখে যে, শাসকশ্রেণী আর বিরোধী পার্টি দুই গোষ্ঠীই চাইতেছে ব্যক্তি ইচ্ছা হটাতে! মানে, স্বৈরাচারী সরকার বলতেছে রাইটার ওইটা বোঝায়ই নাই আর, অপজিশন বলতেছে তাদের লোকের উপর হামলা হইতেছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি টমাসের কোন জায়গা নাই কারো কাছে, সবাই তারে ইউজ করতে চাচ্ছে। ফলে, নভেলে দেখা যায়, ডাক্তারি ছাইড়া দিয়া বা করতে না পাইরা রংমিস্ত্রীর কাজ নেয় সে। নভেলের শেষে আমরা টমাস ও টেরেজা দুইজনরেই দেখি নন-পলিটিকাল হিসাবে, মানে পলিটিকাল পজিশন আছে, কিন্তু তা নন-পার্টিজান ঘরানার। কুণ্ডেরা হয়তো বলতে চাচ্ছেন, আর্টিস্টের নিজের ইজ্জত বাঁচাইতে চাইলে আর্ট করতে হবে নন-পার্টিজান হইয়া, কারণ সকল পক্ষই কিশে খাইতে চায়, ইন্ডিভিজ্যুয়াল হজম করা পলিটিকাল পার্টিগুলোর পক্ষে টাফ।
কুণ্ডেরার প্রো-পিপল পজিশন বুঝার জন্যে টেরেজার সাংবাদিকটার একটা ঘটনা বলা যাক। সোভিয়েত যখন চেকের দখল নিচ্ছে তখন শে জোরেশোরে ফটো জার্নালিজম শুরু করে। এবং জেনেভা থিকা ছবিগুলা প্রকাশ করার জন্যে শে আন্দোলনকারীদের রিভোল্টের বিভিন্ন ভঙ্গি নেয়, মেয়েদের পায়ের ফাঁক দিয়া ট্যাঙ্ক দেখানো ফেমিনিস্ট ছবি, কমরেডদের শহীদি মরণপ্রীতির নানা এঙ্গেলসহ আরো অনেক ধরনের। তো, শে ওইগুলা পাঠায়ও জায়গা বরাবর, কিন্তু দিনশেষে তা সোভিয়েতের হাতে পড়ে। তো, দখলদাররা কি ফটোগ্রাফার’রে মাইরা ফেলে? না। বরং তার স্বীকারোক্তি নিয়া ওই আন্দোলনকারীদের ছবি ধইরা ধইরা গণ-গ্রেফতারের দিকে আগায় দখলদার। তাতে টেরেজা ভয়াবহ ডিপ্রেশনে পড়ে যায়, বেহাত বিপ্লবের মতো দশা, জনমত তৈরির উদ্দেশ্য তোলা ছবিগুলো ব্যবহার হচ্ছে জন (নাগরিক) দংশনে। এইভাবে কুণ্ডেরা আমাদের স্বৈরাচার ঠেকাতে স্মার্ট হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে বুঝেশুনে করা যায় দখলদার হটানোর কাজ, এবং এই করতে গিয়া যাতে সুইসাইডালও না হই আমরা বাস্তব রাজনীতিতে বা এক্টিভিজমে।
যেহেতু হিস্ট্রিকাল টাইপে নভেল করছেন এটি কুণ্ডেরা, সেহেতু এক্টিভিজম, ইন্টেলেকচুয়ালিটি বা পলিটিক্স নিয়া আজকের দুনিয়ার টোটালিটেরিয়ানিজমের বিরুদ্ধে ক্যামনে ফাইট দেয়া দরকার তার ফিকশনাল রিয়ালিটির ছবকও আমরা পাইতে পারি তাতে। মানে, উইটি কেন প্রোপাগান্ডা বা মহান কেন কর্মসূচি যে থাকতেই হবে তা না, কিন্তু ওই সময়ের চেকে তেনার নভেলটা নিষিদ্ধ হইছিল বলে যেহেতু জানা যাইতেছে, ট্রাই মারতে দোষ নাই তো। তো, এই লাইনে আমরা সাবিনা চরিত্ররে ধইরা আগাইতে পারি। যার বসতি ইন্ডিভিজ্যুয়ালজম, বিশ্বাসঘাতকতা, আইরনির বস্তা আর নন-ট্রেডিশনাল লাইফস্টাইল লইয়া। এবং এইগুলারে সম্বল ধইরাই শে মাঠে থাইকা আর্টের নামে খাড়ানো কিশের বিরুদ্ধে ফাইট দিছিল। যেইগুলা সোসাইটিতে সাপ্রেসড হইয়া থাইকা যায়, এবং তাতে দরকারি ক্রিটিকের সন্ধান পাওয়া যায় না তখনো-এখনো, এবং এর ফলে কিশে বা সরকারি ব্যাখ্যায় আস্থা বাড়তে থাকে লোকের। সাবিনার বয়ানে, এমতাবস্থায় যতোই মিছিল, পাল্টা-মিছিল হোক না কেন, তা সমূহ মনের সিম্পলিফিকেশন বাড়াবে, শ্লোগান হয়ে রবে ভজন! এজন্যেই শে ‘গ্র্যান্ড মার্চ’গুলা থেইকা তফাতে চলে। এই কইরা শে বুঝায়, ইন্ডিভিজ্যুয়াল হওয়ার লগে লগে সরকারি লোক না হইয়া অপজিশন পার্টিগুলার ঐক্যের ভিতরকার অগণতান্ত্রিক ব্যাপারগুলার বিরোধিতা কইরাই মূলত টোটালিটেরিয়ানিজমের বিরুদ্ধে ফাইট দিতে হবে। ডেভিড থরোর গুঞ্জন শুনতেছেন? ডেমোক্রেসির আরো বিস্তারের আলাপ দিতেছেন কুণ্ডেরা। প্রতিনিধিত্বশীল ও উদার গণতন্ত্র থিকা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে পৌঁছানোর ইরাদা তেনার, থুকিডিসিসের বইয়ে পেরিক্লিসের “Power is in the hands not of a minority but of the whole people” বয়ান মিলাইতে পারেন, নানান সীমাবদ্ধতা লইয়াও এথেনিয়ান ডেমোক্রেসির যেই প্রত্যক্ষ হইতে চাওয়ার বাসনা তার ফিকশনাল প্রতিফলন দেখা যায় কুণ্ডেরার ক্যারেক্টারগুলার বাতচিতে।
একি নামে নভেলটার ফিল্ম হইছে, রিমেক না বলে এরে এডাপটেশন বলা ভালো। সিনেমা যে লিটারারি ফিকশনের নাগাল পাইতে পারে কখনো কখনো তা এই সিনেমা দেইখা ঠাহর করা যায়। ড্যানিয়েল ডি লুইসের টমাস চিত্রায়ন চমৎকার, দেয়ার উইল বি ব্লাডে যেমন শিশুর ইনোসেন্স বেচা কড়া ক্যাপিটালিস্ট হওয়ানি নিখুঁত হইছে তেনার, তেমনি এই মুভিতে প্রথমে লাইটনেস ভিজ্যুয়ালাইজেশন ও পরে হেভিনেস’রে পছন্দ কইরা নেয়াটাও। অবশ্য কুণ্ডেরার ওই রিমেক মন কাড়তে পারে নাই, এতো বিরক্ত হইছেন যে, জীবনে কভু কোন কাজের ভিজ্যুয়ালে মত দিবেন না বইলা জানাইছিলেন তিনি। এইখানে আসে ড্রামা ও লিটেরারি ফিকশনের সেই পুরানা প্যাচাল অথবা পাঠক ও লেখকরা কেন বেশিরভাগ সময় টেক্সটের সিনেম্যাটিক এডাপটেশনে নাখোশ থাকে তার সুলুকসন্ধান।
সিনেমা অভিযোজিত হইছে ড্রামা থেইকা, জার্মান ও গ্রীক ভাষার। ফলে তা স্পষ্টভাবে এরিস্টটলের প্রতি ঈমানদার থাকে। মানে এরিস্টোটলিয়ান যেই থ্রি এক্ট স্ট্রাকচারের বয়ান আছে তার বাইরে যায় না, বরং কোন না কোনভাবে ফলো করে একটা বা কয়েকটা গল্পো বলে যায়। ফলে মিডিয়াম স্পেসিফিক হওয়ার যেই ব্যাপার আছে সিনেমার তা হতে গিয়া লিটারেরি ফিকশন হওয়া আর হয় না তার। মানে, কবিতায় মিউজিক লাগায় দিলে যেরকম ওইটা গানে রূপান্তরিত হওয়ার রিস্ক থাকে ওইরকম, বা গান থিকা মিউজিক নিয়া নিলে তা কবিতায় পতন বা উত্থানের মতো ব্যাপার থাকে মতো। ফলে, লিটারেরি ফিকশন জনরার ক্যারেকটার এক্সপ্লোরেশনের প্রতি যেই অবসেশন বা আগ্রহ তা দমাইতে হয় সিনেমায়। কারণ ড্রামা ফরম্যাটে ইমেজ বা ভিজ্যুয়াল লাগে, লিটারারি ফিকশন ওই কাজ ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়া সাইরা ফেলে। এবং ভাষার ওই বর্ণনা যদি ইমেজ ধরতে চায় সেক্ষেত্রে তা সার্বজনীন হয় না, কারণ ভাষা পাঠকের মনে যেইভাবে পার্সোনাল ইমোশন বা জার্নির এক্সপেরিয়েন্স দেয় তা ভিজ্যুয়ালাইজেশন দিতে পারে না। ফলে মিডিয়াম হিসেবে সিনেমা বা ইমেজের সীমাবদ্ধতা তখন চোখা হইয়া রইবে পাঠকের চোখে যে দর্শক হতে রাজি না। এইদিক দিয়া দেখলে কুণ্ডেরার ওই বিরক্তি লেজিট বা যৌক্তিক। আবার ফিলিপ কফম্যানের এডাপটেশনও তো প্রশংসার দাবিদার! সেক্ষেত্রে আলাদা মিডিয়ামের কাছ থিকা আলাদা প্রত্যাশা রাখবার মতো ব্যাপার কইরা মধ্যপন্থী হতে পারি আমরা, লিটেরারি ফিকশনের ম্যাটেরিয়াল কিভাবে ফিল্মের মতো মিডিয়ামে হাজির করেন ডিরেক্টর তা খেয়াল করতে পারি। এইভাবে ভিজ্যুয়ালাইজেশনের দুনিয়ার যেই ‘জনরা এক্সপেকটেশন’ দর্শকের তাও পূরণ করা যায়, একিসাথে কুণ্ডেরাদের সাথেও একাত্মতা পোষণ করা যায়।
এইক্ষণে ইউরোপ নামের আইডিয়ার সাথে তার সম্পর্ক বুঝার জন্যে তেনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘দি আর্ট অব নভেলা’র প্রসঙ্গ আনা যায়। বইটাতে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও ভাষণ-এই চার ফর্মে উপন্যাস নিয়া কুণ্ডেরা খোলাখুলি কথা বলছিলেন। আধুনিক ইউরোপীয় উপন্যাসের বিষয়বস্তুর বয়ান ফরমাইতে ফরমাইতে তিনি সন্ধান দিতেছিলেন ‘অনৈতিক’ উপন্যাসের, বলতেছিলেন, মানুষের ভাবাভাবি দেইখা খোদা হাসেন, কারণ মানুষ যত ভাবে সত্য ততোই দূরে সইরা যায়। এবং খোদার ওই হাসি থেইকাই জন্ম নেয় ইউরোপের উপন্যাস। কিন্তু মানুষকে ভাবতে দেইখা ঈশ্বর হাসেন কেন? কারণ মানুষ যখন চিন্তা করে তখন সত্য তার থিকা পলায়ে যায়। কারণ একজন ব্যক্তি যত বেশি চিন্তা করে, আরেকজনের চিন্তার লগে তার তত বেশি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। মধ্যযুগ থেইকা বের হওয়ার সময় আধুনিক সময়ের শুরুটা মানুষের এই মৌলিক পরিস্থিতি প্রকাশ করছিল। ফলে ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকরা মানুষের সেই নয়া পরিস্থিতি উপলব্ধি কইরা উপন্যাসের শিল্প নির্মাণ করছিলেন। এইভাবে কুণ্ডেরা দাবি করেন, উপন্যাস ইউরোপের সৃষ্টি, যদিও এর আবিষ্কারগুলা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় হইছিলো। এই করতে করতে কুণ্ডেরা কাফকার হাতে বায়াত নেন বলে জানান, যদিও নিজেরে তিনি সারভেন্তাস আর হাইডেগারের সিলসিলায় দেখেন বইলা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কুণ্ডেরার টলস্টয়প্রীতির ব্যাপার দিয়া লেখাটা শেষ করি। তিনি দস্তয়েভস্কির চাইতে টলস্টয়’রে বেশি আধুনিক মনে করতেন! কারণ হিসেবে বলেন, টলস্টয়ই প্রথম, সম্ভবত, মানুষের আচরণে অযৌক্তিক ভূমিকা নিয়া ভাবাভাবি চালাইছিলেন। অথচ কুণ্ডেরার যেই ফিল্ড, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম, সেখানকার জায়ান্ট হইতেছেন দস্তয়েভস্কি! অবশ্য সাহিত্য সমালোচনায় কন্ট্রিবিউশান খোঁজার একটা ব্যাপার আছে, যে, কোন লেখকের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সে মৌলিক কোন অবদান রাখছে কিনা তা দেখতে হবে, হতে পারে তা নয়া কোন টেকনিক বা এমনকিছু ধরণ যা আগে দেখা যায় নাই এমনকিছুর আগমন। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, যে, উড়োজাহাজ কে আবিষ্কার করছে টাইপের এমসিকিউ’র মতো, পরে যে অনেকে অনেক কিসিমের উড়োজাহাজ আবিষ্কার করছে তাদের নাম বহুনির্বাচনিতে আসে না, আসে শুধু রাইট ব্রাদার্সের নাম, কারণ ওদেরই মনে রাখা হবে, বাকিরা ওই আইডিয়ার ডেভলপার মাত্র, আবিষ্কারক না। এইভাবে সাহিত্য সমালোচনায় কুণ্ডেরার দেখায় টলস্টয় হয়তো আবিষ্কারক, এবং দস্তয়েভস্কি ডেভলপার মাত্র, ফলে কম গুরুত্বপূর্ণ। এই লিটেরারি ক্রিটিসিজমের কার্টেসিও দেখি আমরা এই নভেলের নামকরণে! “ওয়ার এন্ড পীস” নামের যেই উপন্যাস তার অন্যতম প্রোটাগনিস্ট এন্ড্রো ব্রোকানস্কির মউতের বর্ণনা দিবার সময় তলস্তয় লেখতেছিলেন, “আ স্ট্রেঞ্জ লাইটনেস অব বিইং…” এই থিকাই নিজের উপন্যাসের নাম ঠিক করছেন বইলা জানান কুণ্ডেরা। এইভাবে টলস্টয়ের “অযৌক্তিকতা” ডীলিং কুণ্ডেরায় এসে পোস্ট-মডার্ণ হয়ে এক রকমের চেক-ফরাসি রূপ পায়। এবং এইরকম সব কারণেই তিনি দর্শন ও বিজ্ঞানের চাইতে উপন্যাসকে এগিয়ে রাখতেন। মনে করতেন, মানব ইতিহাসে সবার আগে আধুনিক জীবন আনছে উপন্যাস। ফিলোসোফি ও সায়েন্স যা এক্সপ্লোর করতে পারে না তা পারে উপন্যাস, ফলে তার দাবি, নভেল হইতেছে দুনিয়া বুঝার থার্ড ওয়ে…