
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়টা পড়লাম। আবু সাইদের হত্যা মামলার রায়টা দাঁড়িয়ে আছে প্রায় নিখুঁত একটা প্রমাণ-কাঠামোর ওপর। তদন্ত কর্মকর্তারা দুর্দান্ত কাজ করেছেন মামলার হত্যাকাণ্ড প্রমাণে। তদন্তকারীরা NTV-র লাইভ ফুটেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পাশাপাশি রেখে দেখেন যে ক্যাম্পাসের ফুটেজে টাইমস্ট্যাম্প বিকৃত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ফরেনসিক করে বের করেন যে NTV-র রেকর্ডিংটা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টাইমফ্রেমের সাথে মিলে যায়। এই টাইমস্ট্যাম্প-ভিত্তিক পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করেই ট্রাইব্যুনাল প্রায় সেকেন্ডের হিসাবে নির্ধারণ করে কে কখন গুলি চালিয়েছিল। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ওপর মৃত্যুর কারণ পরিবর্তনের চাপ আর তাঁর সেই চাপ প্রত্যাখ্যান করার সাক্ষ্যও পরবর্তীতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, এবং তাদের বক্তব্যকে স্পষ্ট, সংগতিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ পুরো বিচারিক শক্তিটাই কেন্দ্রীভূত হয় “কে গুলি চালিয়েছে”, এই হত্যাকাণ্ড নিপীড়ন উসকিয়েছে এই প্রশ্নের ফরেনসিক আর অকাট্য এভিডেনশিয়ারি প্রমাণের উত্তর দেওয়ার দিকে।
কিন্তু রায়ের ৩০ জন আসামির তালিকাটা দেখলেই বোঝা যায় ট্রাইব্যুনাল আসলে একটা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছিল, যেটা কেবল “কে গুলি করেছে” প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই তালিকায় আছেন সরাসরি গুলিকারী দুইজন পুলিশ কনস্টেবল (৮, ৯ নং), তাদের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা রংপুরের পুলিশ কমিশনারসহ (২-৭ নং), বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সাবেক উপাচার্য (১, ১০, ১৩-১৫ নং), শিক্ষক (১১, ১২ নং), বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী-নিরাপত্তারক্ষী (২৫-২৯ নং), আর ছাত্রলীগের নেতৃত্ব (১৬-২৪ নং)। এই বিন্যাসটাই বলে দেয় যে ট্রাইব্যুনাল নিজেই স্বীকার করে নিয়েছিল এই হত্যাকাণ্ড একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং প্রশাসনিক, রাজনৈতিক আর পুলিশি কাঠামোর সমন্বিত একটা প্রকল্প ছিল। অথচ সাজার বণ্টনে এই কাঠামোগত স্বীকৃতি প্রতিফলিত হয়নি। যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে তাদের মৃত্যুদণ্ড, অথচ পোমেল বড়ুয়ার মতো যিনি স্থানীয়ভাবে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ের সহিংসতা কো-অর্ডিনেট করেছেন বলে অভিযোগ, তাঁর সাজা মাত্র ১০ বছর। ফলে বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্নটা তাই সাজার পরিমাণ নিয়ে না, বরং প্রশ্নটা তৈরি হয়েছে কোন ধরনের প্রমাণকে ট্রাইব্যুনাল “নিষ্পত্তিযোগ্য” (adjudicable) মনে করেছে, আর কোনটাকে করেনি।
জাতিসংঘের ফ্যাক্টফাইন্ডিং রিপোর্টের দোহাই দিয়ে গতকাল বার্গ্ম্যান তর্ক করছিলেন যে, জাতিসংঘের তদন্ত আবু সাইদের হত্যাকে একটা ডেলিভারেট কিলিং হিসাবে দেখেছে । ওয়াইডস্প্রিড আকারে দেখেনি । এটা ঠিক , টাইম হিসাবে করে জাতিসংঘের ফ্যাক্টফাইন্ডিং রিপোর্ট যখন তৈরি করেছে তখন এটাকে রংপুরে ডেলিবারেট পুলিশি কিলিং মনে হতেই পারে। কারণ জাতিসংঘের ফ্যাক্টফাইন্ডিং যেসব তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই উপসংহারে এসেছিল সেখানে তারা কেন্দ্রীয় কোন নির্দেশনার তথ্য তখনও পায়নি, তারা যেটা পেয়েছিল সেটা ১৮জুলাই থেকে । স্বভাবতই স্বল্প টাইম ফ্রেমে সকল এভিডেন্স উদ্ধার করা তাদের পক্ষে সম্ভবও হয়ে উঠেনি। কিন্তু ট্রাইবুনাল নিজেই গতকাল ওবায়দুল কাদেরের মামলায় শক্ত এভিডেন্স হাজির করেছে যে ১৮তারিখের আগেই কেন্দ্রীয় নির্দেশনা দেয়ার অডিও তারা উদ্ধার করেছে। ওবায়দুল কাদে্রের মামলায় এন্টিএমসি থেকে উদ্ধার করা অডিও বার্তায় ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন সরাসরি প্রমাণ হাজির করে যে, ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের সাদ্দামকে ছাত্রদের পেটানোর জন্য এবং মারার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন। ফলে যে টেম্পোরালিটি নিয়ে আলাপ হচ্ছে, এই অডিও নির্দেশনা ঠিক এই সিস্টেমিসিটির প্রমাণ। দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রীদের উপর একযোগে হামলায় ছাত্রলীগকে ব্যবহার , এবং তারা ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে পিছিয়ে পড়ার পর একে একে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, মিলিটারি নামায় সেইসময়ের সরকার । সবচাইতে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হচ্ছে, মৃত লাশের তথ্য আর ময়নাতদন্তের উপরে রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ । আর সেখানে আবু সাইদ একা ভিক্টিমও ছিল না, অন্তত কয়েক ডজন শিক্ষার্থী সিভিয়ার টর্চারের শিকারও হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরসহ অনেক ছেলে জেলে গিয়েছে। এই কারণে আবু সাইদের কেইসে তার বাবা এবং আহত ভিক্টিমরা যখন স্বাক্ষ্য দিচ্ছিল বারবার নিপীড়ন অর্গানাইজের নির্দেশদাতার নাম উচ্চারণ করছিল।
কিন্তু আবু সাইদের মামলার রায়ে এই ধরনের কেন্দ্রীয়-কমান্ড উপাদানকে গুরুত্ব না দিয়ে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা অনেকাংশে নির্ভর করতে থাকেন ফরেনসিক এবং হত্যার স্বাক্ষ্য প্রমাণের উপর। ফলে দেশজুড়ে ছাত্রদের উপর একযোগে হামলার জন্য যেটা ছিল কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অংশ, বিচারিক প্র্যাকটিসে সেটা কার্যত রূপান্তরিত হয়ে যায় একটা ব্যক্তিগত হত্যা মামলার (individual homicide) মতো এভিডেনশিয়ারি স্ট্যান্ডার্ডে।
এবং এই কারণেই হত্যার যাবতীয় দায় এসে দাঁড়িয়েছে, পুলিশ কনস্টেবল আমির বা সুজন চন্দ্র রায়ের উপর, যারা গুলি চালিয়েছিল। সহিংসতার এক্সিকিউটর। কিন্তু তারা এমন একটা প্রাতিষ্ঠানিক চেইনের অংশ ছিল, যারা ছিল একটা মেশিনের মত, যেখানে আদেশ এসেছিল উপর থেকে সেটা অনেকটা চাপা পড়ে যায়। হানা আরেনড অবশ্য ব্যানালিটি অব ইভিলে বলেছিলেন, এই এক্সিকিউটররা নিজেরা আসলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্রাংশ, যাদের সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা সীমিত। অথচ বাংলাদেশের আইসিটি ট্রাইবুনালের বিচার যখন প্রমাণের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি জোর দেয় ঠিক এই যন্ত্রাংশের ওপর (কারণ এই যন্ট্রাংশের কাজ ক্যামেরায় ধরা পড়ে, টাইমস্ট্যাম্প-যোগ্য, ফরেনসিকভাবে অকাট্য), তখন এই বিচার ব্যবস্থাটা নিজেই একটা selective visibility তৈরি করে। যে কমান্ড স্ট্রাকচার এই সহিংসতাকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে সেটা থেকে যায় মৌখিক, অপ্রত্যক্ষ, রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত। আর তাই আইনি দৃষ্টির বাইরে। এমবেম্বে নেক্রোপলিটিক্সের প্রশ্নে ঠিক একথাটাই বলেছিলেন যে, কে মরবে সেটা নির্ধারণের সার্বভৌম ক্ষমতা আসলে বসেছিল টেলিফোন লাইনের ওপারে, ট্রিগারে না।
আবু সাইদের হত্যাকাণ্ড ছাড়াও হাসানুল হক ইনুসহ সাম্প্রতিক আরও কিছু মামলাতেও একই প্যাটার্ন দেখলাম। যেখানে ছোট, বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের এভিডেনশিয়ারি বিস্তারে ট্রাইব্যুনাল যতটা মনোযোগী, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার প্রশ্নে, এবং কেন্স্রীয়ভাবে এইসব হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষেত্রে যাদের অতি গুরুত্বপুর্ণ দায় ছিল সেটাকে ছোট করার মধ্য দিয়ে । এই প্যাটার্নটা একটা পদ্ধতিগত প্রবণতাও নির্দেশ করে। বিচার প্রক্রিয়া বারবার সেই প্রমাণকেই প্রাধান্য দিচ্ছে যা টেকনিক্যালি সহজে “বন্ধ” (closed) করা যায়। যেমন ফরেনসিক, ভিডিও, টাইমস্ট্যাম্প। আর এড়িয়ে যাচ্ছে সেই প্রমাণ যা রাজনৈতিকভাবে জটিল, দীর্ঘ তদন্তসাপেক্ষ, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। এভাবে বিচার নিজেই একটা কাঠামোগত ন্যারোয়িং (narrowing) তৈরি করছে, যেখানে অপরাধের ব্যাপ্তি প্রশ্নের বদলে অপরাধের প্রত্যক্ষতা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আবু সাঈদের বাবা দেখলাম এই রায় সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন, শহীদ আনাসের পিতার মত । ইত্তেফাককে আবু সাইদের বাবা বলেন,”‘যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হলো তারাই তো বেঁচে গেল। এ হত্যায় জড়িত আরও বড় বড় অপরাধীদের কোনো সাজা দেয়া হয়নি। আমার দাবি, কঠোরভাবে এর বিচার হোক।” আবু সাইদের বাবা মকবুল বারবার পোমেল বড়ুয়ার কথা বলছেন। তার এই রায় প্রত্যাখ্যানকে নিছক ব্যক্তিগত অসন্তোষ আকারে দেখার সুযোগ নেই । এটা একটা কাউন্টার-টেস্টিমনি, যা আসলে আইনিভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া (juridical closure) এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুভূতির (lived sense of justice) মধ্যেকার একটা দীর্ঘ ফাটল হাজির করে। মকবুলের কাছে বিচার তখনই সম্পূর্ণ হবে যখন যাদের নির্দেশে তাঁর ছেলে নিহত হয়েছে তাদেরও জবাবদিহি করা হবে। রায় আইনগতভাবে “শেষ” হলেও পরিবারের কাছে এটা অসম্পূর্ণ, কারণ তাদের অভিজ্ঞতায় হত্যাকাণ্ডটা কখনোই একটা বিচ্ছিন্ন পুলিশি অ্যাকশন ছিল না, এটা ছিল একটা সমন্বিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ, যেখানে পোমেল বড়ুয়াদের মত নির্দেশ দাতাদের আইনের জবাবদিহিতার কাঠামোতে প্রাধান্য দেয়ার চাইতে ট্রাইব্যুনাল জোর দিয়েছে সুজন চন্দ্র আর আমির আলিদের বিষয়ে হাজির থাকা এভিডেনশিয়ারি কাঠামোর উপর ।