সাইফুল ইসলাম সাজিদ | ১ম সংখ্যা
গল্পকে দৃষ্টিলব্ধ মাধ্যমে বলবার প্রচলন হওয়ার সময় থেকে, অর্থাৎ শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের অভিষেক হওয়ার শুরু থেকেই চলচ্চিত্র তার বিষয়, চরিত্র ও গল্পের জন্য সাহিত্যকে ব্যবহার করে আসছে। সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার উভয়েই গল্প বলেন, গল্পের ভেতর দিয়ে জীবনের অদেখা খাদ, পর্বত বা গভীর সমুদ্রকে আবিষ্কার করতে চান। দুজনেই শিল্প রচনা করেন, লেখেন; একজন লেখেন কলম দিয়ে, অপরজন ক্যামেরা দিয়ে। কলমে লেখা গল্পকে পুনর্বার ক্যামেরায় লেখেন কেউ কেউ। তবে এ লেখা মূলতই পুনর্লিখন, পুনরাবৃত্তি নয়। তাই সাহিত্যকর্মে ভর করে তৈরি হওয়া চলচ্চিত্র কোনো গৌণ শিল্পকর্ম নয়, বরং সাহিত্যকর্মের মতোই অপর একটি বুনিয়াদি শিল্পকর্ম। যার শিল্পী হলেন পরিচালক। তিনি ক্যামেরা দিয়ে গল্পটিকে পুনরায় লেখেন। আগেই বলেছি তিনি পুনরাবৃত্তি মাত্র করেন না, পুনরায় গল্পের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেন— তাঁর ভিন্ন সমসময়ে, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে, সমসাময়িক সংকটের প্রেক্ষিতে এবং নতুনতর জীবন জিজ্ঞাসার ভিত্তিতে। তিনি গল্পটিতে সময় অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ যোগ করেন, যোগ করেন নতুন মাত্রা, যা কখনো কখনো উৎসের গল্পটিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আবার প্রয়োজনে তিনি বিয়োগও করেন এমন সব অনুষঙ্গ যার চলচ্চিত্রীয় আবেদন নাই অথবা যা সময়ের ব্যবধানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়৷ এভাবে একজন নির্মাতা চলচ্চিত্রীয় মাধ্যমে সাহিত্যের নতুন ব্যাখ্যা সামনে আনেন, সাহিত্যিকের বা তাঁর সময়ের দার্শনিক সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করেন। সর্বোপরি, তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের লেখক।
নির্মাতার এভাবে চলচ্চিত্রের লেখক হয়ে ওঠা ঘটনার তত্ত্বীয় নাম হলো অটারিজম (Auteurism)। ফরাসী শব্দ অটার (Auteur) মানে হলো লেখক। সাহিত্যকে চিত্রায়িত করার প্রক্রিয়ায় যে নির্মাতা চলচ্চিত্রের লেখকস্বত্ত্ব ধারণ করেন— অর্থাৎ চলচ্চিত্রের যাবতীয় সৃজনশীল প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি সাহিত্যকর্মকে সিনেমার পর্দায় নতুনভাবে উপস্থাপন তথা ব্যাখ্যা করেন তিনি বিবেচিত হন অটার বা চলচ্চিত্রের লেখক হিসেবে। মানে কিনা তিনি শুধু সাহিত্যকে ভিন্ন একটা মাধ্যমে রূপান্তরের কারিগর হয়ে থাকেন না, হয়ে ওঠেন নতুন নির্মিত সেই শিল্পকর্মের স্বতন্ত্র রচয়িতা।
তো চলচ্চিত্র নির্মাতাকে অটার, যার অর্থ লেখক, তা হিসেবে বিবেচনা করবার প্রয়োজন হলো কেন? পৃথিবীতে লেখকেরা বিবেচিত হন তাদের সময়ের ময়নাতদন্তকারী হিসেবে। অর্থাৎ তাঁরা পৃথিবীতে নিজেদের বসবাসের সময়টিকে ভেঙেচুরে, নিঙড়ে বুঝতে চেষ্টা করেন। তারপর তা কলমের খোঁচায় টুকে রাখেন সাহিত্যে, লেখায়। লাইব্রেরিকে রবীন্দ্রনাথ তুলনা করেছিলেন মহাসমুদ্রের শতবৎসরের ঢেউয়ের সঙ্গে, যে ঢেউকে লেখকেরা কালো অক্ষরে বন্দী করে রাখেন বইয়ের পাতায়। ইতিহাসের সেই ঢেউ তথা সময়কে জানতে হলে তাই আমাদেরকে দ্বারস্থ হতে হয় সেই সময়ের লেখকদের কাছে।
গল্প বলবার মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের অভ্যুদয় হওয়ার পর সময়ের অনেক মেধাবী স্বাক্ষীই তাদের কথা বলবার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন সিনেমাকে। সিনেমা এমন এক সর্বভুক শিল্পমাধ্যম যা মোটামুটি সকল শিল্পকে নিজের মধ্যে টেনে নিতে পারে৷ চিত্র, সংলাপ, সঙ্গীত, কবিতা, নৃত্য, স্থাপত্য ইত্যাদির সন্নিবেশে চলচ্চিত্র এত বিস্তৃত এক শিল্পে পরিণত হয় যে তাতে কোনো সময়ের বিচিত্র দিক টুকে রাখা সম্ভব হয় অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে। লেখকের লেখা প্রত্যেকটি অক্ষর যেমন তাঁর বক্তব্য বহন করে, তেমনি চলচ্চিত্রে কোনো একটি দৃশ্যের প্রতিটি বস্তু, রঙ, বিন্যাস ইত্যাদি নির্মাতার বক্তব্য বা দর্শন প্রকাশ করে। ফলে লেখকের যা কাজ, তা কখনো কখনো অধিক ফলপ্রসূভাবে, করতে পারেন চলচ্চিত্র নির্মাতা। কিন্তু নির্মাতার লেখার মাধ্যম কলম না হওয়ায় লেখকের গুরুত্ব জোটেনি তাঁর বহুকাল। সময়ের সংকটগুলোকে দৃশ্য-সংলাপে সিনেমায় তুলে আনার কৃতিত্ব দিতে পঞ্চাশের দশকে ফঁসোয়া ট্রুফো, অ্যান্ড্রু স্যারিস প্রমুখ ‘অটার’ শব্দটি ব্যবহার করেন নির্মাতাদের জন্য। ক্রমান্বয়ে চলচ্চিত্র তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় অটারিজম।
এই তত্ত্ব চলচ্চিত্রে শুধু পরিচালকের কৃতিত্বের দিকেই মনোযোগী। ফলে সিনেমার মতো যৌথ কর্মযজ্ঞে অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদকসহ অন্যান্য কলাকুশলীদের ভূমিকা কিছুটা ফিকে দেখায়, যা তত্ত্বটির সীমাবদ্ধতাও বটে। তবে মোটাদাগে চলচ্চিত্র মূলত পরিচালকের বয়ান, এবং অন্য সকল কলাকুশলী পরিচালকের কল্পনাকে পর্দায় দৃশ্যমান করার জন্যই শ্রম দেন, তাই সিনেমার কর্তৃপক্ষ হিসেবে পরিচালককেই বিবেচনা করে অটার তত্ত্ব। আবার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক বিখ্যাত পরিচালক আছেন যারা অন্যের চিত্রনাট্যে দারুণ শিল্পিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এক্ষেত্রেও অটার তত্ত্ব তাদের প্রতি মনোযোগী নয়। নির্মাতা সিনেমার চিত্রনাট্য লেখাসহ যাবতীয় সৃজনশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেই তবে এই তত্ত্ব তাকে স্বীকৃতি দেয় চলচ্চিত্রের লেখক হিসেবে। তত্ত্বীয় মাপকাঠির এই সরু পথ বেয়ে এগোলে তাই ভুরি ভুরি অটারের দেখা মিলবে না, আর তা যদি হয় কিছুটা স্থানিক পাটাতনে অর্থাৎ উপমহাদেশীয় গণ্ডিতে, তাহলে তা আরো সীমিত হয়ে আসে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ের উপমহাদেশীয় সিনেমার মানচিত্রে চোখ রাখলে পরিচালক থেকে চলচ্চিত্রের লেখক হয়ে উঠছেন এমন নির্মাতা খুব বেশি পাওয়া যায় না।
সাহিত্যের চলচ্চিত্রীয়করণের ক্ষেত্রে ধ্রুপদী সাহিত্যকে বেছে নিলে সেখানে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নির্মাতার সৃজনশীলতার ছাপ রাখার ব্যাপ্তিও বৃদ্ধি পায়। আবার সাম্প্রতিক বা নিকট অতীতের স্থানীয় সাহিত্যের চেয়ে দূর অতীতের, দূর দেশের সাহিত্যকে ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রে স্থান, কাল ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের ফলে পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজনজনিত বিবিধ আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। তাছাড়া অন্য দেশের গল্পের প্রেক্ষাপট, সংস্কৃতি ও চরিত্রদেরকে নির্মাতার ভুগোলে অভিযোজিত করার যে সৃজনশীল প্রক্রিয়া তার বিশ্লেষণও আমলে নেয়ার অবকাশ থাকে।
সাহিত্যজগতে চিরায়ত কীর্তি খুঁজতে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয় বোধহয় শেক্সপিয়ারের নাম। তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা, তাদের আবেগ, অনুভূতি বা প্রতিশোধস্পৃহা আজকের পৃথিবীতেও বিদ্যমান। শেক্সপিয়ারের চরিত্ররা যেন স্থান-কালহীন। রচনার পাঁচশো বছর পরেও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের পাঠক-দর্শক হ্যামলেট, ওথেলো ম্যাকবেথদের দ্বিধা, সংশয়, লোভ একইভাবে অনুধাবন করতে পারে। তাঁর রচিত নাটকগুলো আজকের পৃথিবীতেও সমানভাবে আবেদনময়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নির্মাতারা আজও শেক্সপিয়ারের নাটককে অবলম্বন করে চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে থাকেন। তাঁর বিখ্যাত ট্রাজেডিত্রয়ে ভর করে, উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া তিনটি চলচ্চিত্র হলো : মকবুল (২০০৩), ওমকারা (২০০৬) ও হায়দার (২০১৪)। সিনেমা তিনটি যথাক্রমে শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ, ওথেলো ও হ্যামলেট নাটককে কেন্দ্র করে শেকড় গজায়, তারপর ডালপালা ছড়িয়ে দেয় ভারতের স্থানীয় জনপদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে। ভারতীয় নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ চলচ্চিত্র তিনটি নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্র তৈরি করতে গিয়ে তিনি শেক্সপিয়ারের পুনরাবৃত্তি করেন না, বরং পুনর্লিখন করেন প্রেক্ষাপটের, পুনর্নির্মাণ করেন চরিত্রদের। মূল শেক্সপিয়ার থেকে নান্দনিক বিচ্যুতি ঘটিয়ে হ্যামলেট, ওথেলো ও ম্যাকবেথকে সমসাময়িক ভারতের মাটিতে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন ভরদ্বাজ। শেক্সপিয়ারের নাটককে সিনেমার চিত্রনাট্যে রূপান্তর, স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে অভিযোজন, সাঙ্গীতিক সংযোজন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তত্ত্বীয় মাপকাঠির সরু পথ অতিক্রম করে ভরদ্বাজ চলচ্চিত্রের লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন। অটার তত্ত্বের (The Auteur Theory) প্রেক্ষিতে তাঁর নির্মাণত্রয় বিশ্লেষণ করার তরেই এই খুচরো লেখার অবতারণা।
হায়দার
হায়দার হলো শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট নাটকের চলচ্চিত্রীয় অভিযোজন। ডেনমার্কের যুবরাজ হ্যামলেটকে একদিন তার সদ্য প্রয়াত বাবা রাজা-হ্যামলেটের প্রেতাত্মা এসে বলে— আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আমাকে খুন করেছে তোমারই চাচা ক্লডিয়াস। সে তোমার মাকেও ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছে এবং আমার রাজত্ব দখল করেছে। তুমি এর প্রতিশোধ নাও।
হ্যামলেট পড়ে যায় উভয় সংকটে। সে জানে না সত্য কী। সে কি প্রেতাত্মার কথামতো পিতা হত্যার প্রতিশোধ নেবে নাকি ঘটনার সত্যতা যাচাই করবে? দ্বিধায় পড়ে সে কালহরণ করতে থাকে। আর এদিকে ষড়যন্ত্রকারী চাচা ক্লডিয়াস হ্যামলেটকেও সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে। একপর্যায়ে হ্যামলেট মঞ্চনাটকের আয়োজন করে, যেখানে প্রেতাত্মার বর্ণনা অনুযায়ী রাজা-হ্যামলেটের হত্যা দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়। তা দেখে চাচা ক্লডিয়াস ভড়কে যায় আর হ্যামলেট বুঝতে পারে আসল সত্য। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি। বিবিধ ঘটনার সমাপতনে, এক তলোয়ার যুদ্ধের মঞ্চে নিহত হয় হ্যামলেট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী লেয়ার্টেজ, চাচা ক্লডিয়াস, মা গারট্রুড… আর প্রেমিকা ওফেলিয়া তো আগেই পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছিল। এভাবেই এক ট্রাজিক পরিণতিতে এসে শেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটক হ্যামলেট সমাপ্ত হয়।

হায়দার সিনেমা নির্মাণ করা হয় কাশ্মীর সংঘাতের পটভূমিতে। কাশ্মীরের কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের সংঘাত ষোড়শ শতাব্দীর শেক্সপিয়ারীয় হ্যামলেটে ডেনমার্ক-নরওয়ের সংঘাতের আবহ জিইয়ে রাখে। ভোগ-দখলের চিরায়ত মানব-প্রবণতা স্থান-কাল নির্বিশেষে সার্বজনীন নিয়তি হয়ে দেখা দেয় যেন। তবে সংঘাতের তীব্র চিত্র অঙ্কন করলেও নির্মাতা তাঁর দার্শনিক অবস্থান পরিষ্কার করেন সিনেমার শুরুতেই। স্থানীয় ডাক্তার হিলাল মীর মিলিট্যান্ট নেতা ইখলাককে প্রবল ঝুঁকি নিয়ে নিজের বাসগৃহে চিকিৎসা দিতে নিয়ে এলে তার স্ত্রী গাজালার মনে প্রশ্ন তৈরি হয় এই আদর্শিক ডাক্তার কোন পক্ষে। সে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল নাকি সহিংস বিদ্রোহে আজাদীকাঙ্ক্ষী? কাশ্মীর সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া সিনেমায়, এই প্রশ্ন আসলে দর্শকেরও। সিনেমার উদ্বোধনী দৃশ্যে একজন আদর্শবান ডাক্তারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া এই নির্মাতা আসলে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে সিনেমাটি বলবেন? উত্তরে ডাক্তার মীর বলে, ‘আমি জীবনের পক্ষে।’ শেষ অবধি নির্মাতার অবস্থানও দেখা যায় জীবনের পক্ষেই। তিনি হ্যামলেটের উপসংহার বদলে ফেলেন। হ্যামলেট ও ক্লডিয়াসকে জীবিত রেখে প্রতিশোধ পরম্পরার ক্ষান্তি টানেন। কাশ্মীর সংঘাতের সমাধান খোঁজার প্রশ্নে নিজের দার্শনিক অবস্থানের পক্ষে সৃজনশীল উপস্থাপনা তৈরি করেন নির্মাতা।
হায়দারের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র হায়দার নয়, বরং তার মা গাজালা। শেক্সপিয়ারীয় বাস্তবতার পুরুষশাসিত সমাজের অবলা নারীর বিপরীতে একবিংশ শতাব্দীর ভরদ্বাজীয় নারী চরিত্রগুলো বরাবরই দৃঢ়, শক্তিশালী। হায়দার আখ্যানের গন্তব্য নির্ধারিত হয় গাজালারই হাতে। ছোট্ট হায়দারকে বাইরে পড়তে যাওয়ায় প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে সিনেমার শেষে প্রতিশোধ চক্রের ইতি টানা পর্যন্ত সর্বত্রই গাজালার সক্রিয় উপস্থিতি। কাশ্মীরী গারট্রুড সংকটময় মুহূর্তে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তাতে অনড় থেকে পুত্র হায়দারের প্রতিশোধ-স্পৃহায় লাগাম টানতে সক্ষম হয়। যা মূলত কাশ্মীরী সিলসিলায় প্রতিশোধ চক্র বন্ধের প্রতি একটি বার্তা। যেখানে শেক্সপিয়ারীয় গারট্রুড দুর্ঘটনাবশত মৃত্যুবরণ করে গাজালা সেখানে নিজের মৃত্যুর সিদ্ধান্তটিও নিজে নেয়। হায়দার সিনেমায় সংঘাত-বিধ্বস্ত কাশ্মীরের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীকে পরিণত হয় গাজালা। যে নিজে না চাইলেও বাহ্যিক হস্তক্ষেপে (খুররামের ধোঁকা ও হায়দারের প্রতিশোধস্পৃহার ফলে) ট্রাজিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয়। কেবল অপরের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গাজালার জীবনে চূড়ান্ত দুর্ভোগ নেমে আসে যা প্রবলভাবে কাশ্মীরের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে।
বিষয়টি আরো বেশি স্পষ্ট হয় রাস্তার মোড়ে হায়দারের তাৎপর্যপূর্ণ মনোলগটিতে। যেখানে সে প্রকাশ করে ভারত-পাকিস্তানের বর্ডার-বর্ডার খেলার চক্করে পড়ে কাশ্মীরবাসীর ‘চুৎযপা’ বনে যাওয়ার রহস্য। রাষ্ট্রীয় আইনের (AFSPA) সমালোচনা করার অনবদ্য সৃজনশীল উপস্থাপনা এটি।
সিনেমার শেষে হায়দারের মা গাজালা নিজের শরীরে বোমা বিষ্ফোরনের মাধ্যমে মূলত প্রজন্ম পরম্পরায় চলতে থাকা প্রতিশোধ খেলার ইতি টানে। এই উপসংহারের মধ্য দিয়ে নির্মাতা চক্রবৃদ্ধি প্রতিশোধ প্রবণতার শেষ দেখাতে চেয়েছেন। মাতৃ-চরিত্র গাজালার বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রতিশোধ পরম্পরার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে দেশমাতার ধ্বংসের প্রতি ইঙ্গিত করেন তিনি। প্রতিশোধ পরম্পরার ইতি টেনে সম্প্রীত রাষ্ট্র গঠনের পরামর্শ দেন নির্মাতা। তিনি হায়দারকে জীবিত রাখেন এবং ক্লডিয়াস তথা চাচা খুররামকে পেছনে ফেলে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেন।
হায়দারের প্রেমিকা আরশিয়া চরিত্রটিও হ্যামলেটের ওফেলিয়ার তুলনায় যথেষ্ট সক্রিয়। সে হায়দারের মানসিক টানাপোড়নে ক্রমাগত পাশে থাকে; নিজের বাবা-ভাইয়ের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। একুশ শতকের ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ভরদ্বাজ শেক্সপিয়ারীয় সমাজের নারীর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার প্রয়াস নেন আরশিয়ার এই চরিত্রায়নের মধ্য দিয়ে।

হায়দারে নির্মাতার আর এক সৃজনশীল সংযোজন হলো রূহদার। সে বন্দী হিলাল মীরের কারাসঙ্গী। হ্যামলেটে রাজা হ্যামলেটের প্রেতাত্মার বিপরীতে হায়দারে আমরা পাই রূহদারকে। হ্যামলেটীয় প্রেতাত্মার সমান্তরালে হায়দারে জীবন্ত রূহদার হায়দারের প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। এক চোখে পুঁজ নিয়ে রূহদার যেন দর্শককে গান্ধীর বাণী স্মরণ করিয়ে দেয় : চোখের বদলে চোখ তুলে নিলে পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে। নির্মাতা রূহদারকে মোটাদাগে একচোখা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীকরূপেই হাজির করেন সিনেমায়, যে এককভাবে শুধু প্রতিশোধের দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে এবং এর পরিণাম সম্পর্কে হয়ে থাকে বেখেয়াল।
সিনেমার একটি দৃশ্যে এক গণকবরস্থানে মৃতের খুলি হাতে দেখা যায় হায়দারকে। কাশ্মীরী হ্যামলেটের এই দৃশ্য শেক্সপিয়ারীয় হ্যামলেটের সঙ্গে একধরনের বেদনাগত আন্তঃপাঠ্যতা তৈরি করে, যা সংঘাত-জর্জরিত কাশ্মীরের প্রেক্ষাপটে অধিকতর বাঙময় হয়। হ্যামলেটে ইয়োরিকের একক খুলির বিপরীতে হায়দারে কাশ্মীরের গণসমাধির দৃশ্যায়ন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সামগ্রিক ক্ষতির ইশারা বহন করে। মৃতের খুলি আর গণসমাধি একইসাথে হায়দারের ব্যক্তিগত ক্ষত এবং কাশ্মীরের সামগ্রিক ক্ষতির প্রতীক হয়ে ওঠে। হ্যামলেটের চিরাচরিত শোকের সঙ্গে কাশ্মীরী শোকের সেতু স্থাপন করে, ক্ষত ও বেদনার সার্বজনীনতাকে মূর্ত করে তোলে এই ধ্রুপদী দৃশ্য।
হায়দারের অবিচ্ছেদ্য একটি অনুষঙ্গ হলো এর সঙ্গীত। চরিত্রদের অব্যক্ত আবেগসমূহ সঙ্গীতের সুরধারায় বইয়ে দিতে পেরেছেন নির্মাতা। ‘প্লে উইদিন প্লে’র আবহে বিসমিল গানটি তাঁর অসাধারণ সৃজনশীল সংযোজন। কাশ্মীরের লোকসংস্কৃতি উপস্থাপনার পাশাপাশি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাইমেক্স বহন করে এই গান।
এভাবে শেক্সপিয়ারীয় আখ্যানের কাশ্মীরি পুনর্বিন্যাস, সাঙ্গীতিক সংযোজন, চরিত্রদের স্থান-কালগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম এবং ব্যক্তিগত দর্শনের অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্মাতা ভরদ্বাজ সফলভাবে হ্যামলেটের ভারতীয় অভিযোজন সম্পন্ন করেন।
ওমকারা
ওমকারার উৎসস্থল শেক্সপিয়ারের ওথেলো নাটক। ওথেলো হলো তৎকালীন ভেনিসে দায়িত্বরত একজন কৃষ্ণাঙ্গ সেনাপতি। সে ভালোবেসে ভেনিসের সুন্দরী ডেসডিমোনাকে বিয়ে করে। মুর ওথেলো শ্বেতাঙ্গ ডেসডিমোনাকে বিয়ে করায় অনেকেরই তা অপছন্দ হয়। এর কিছুদিন পর ঘটনাক্রমে ওথেলো তার অধীনস্থ সেনা ক্যাসিয়োকে পদোন্নতি দেয় প্রধান লেফটেন্যান্ট হিসেবে। এদিকে অন্য এক পদোন্নতি-প্রার্থী সেনা ইয়াগো এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং তলে তলে ওথেলোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে।
সাইপ্রাসে যুদ্ধজয়ের উৎসব চলাকালীন ডেসডিমোনা মনের ভুলে ওথেলোর দেয়া অতি প্রিয় রুমালটি হারিয়ে ফেলে এবং তা গিয়ে পড়ে ইয়াগোর স্ত্রী এমিলিয়ার হাতে। সুযোগ লুফে নেয় ইয়াগো। পদোন্নতি না পাওয়ার প্রতিশোধ নিতে সে এই রুমাল দিয়েই ষড়যন্ত্র আঁটে ডেসডিমোনা ও ক্যাসিওর বিরুদ্ধে। সে ওথেলোর কানে বিষ ঢালে এই বলে যে ডেসডিমোনা আর ক্যাসিও অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত এবং প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে ডেসডিমোনার হারিয়ে যাওয়া সেই রুমাল যা ইয়াগো ইতিমধ্যেই অগোচরে ক্যাসিওর ঘরে রেখে আসে। সাজানো ঘটনা ওথেলো বুঝতে পারে না। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সে।
সন্দেহপ্রবণ ওথেলো ঈর্ষা ও ক্ষোভে ডেসডিমোনাকে হত্যা করে। এদিকে এমিলিয়া বুঝতে পারে এসবের মূল কারিগর তার স্বামী ইয়াগো। সে বিস্তারিত খুলে বলে ওথেলোকে। অতঃপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজের বুকে ছুরি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করে ওথেলো। এভাবে সন্দেহ, ঈর্ষা আর আপদগ্রস্ত মনোভাবের বলী হয় ওথেলোর চরিত্রেরা, ট্রাজিক সমাপ্তি ঘটে নাটকের।

ওথেলোর বর্ণ বৈষম্য ওমকারা সিনেমায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আবহমান কাল ধরে চলে আসা জাত বৈষম্যে স্থানান্তরিত হয়। সিনেমার প্রধান কুশীলব ওমকারাকে নিচু জাতের হিন্দু গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করে তার বিবাহের প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের সংকট দেখানোর মধ্য দিয়ে নির্মাতা মূলত তাঁর সময় ও অঞ্চলের সামাজিক সংকটকে পর্দায় চিত্রিত করেন। তৎকালীন ভেনেসীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে তিনি উপমহাদেশীয় রাজনীতির চেনা-জানা পটভূমিতে অভিযোজিত করেন। এভাবে শেক্সপিয়ারীয় আখ্যানকে স্থান-কালের ঊর্ধ্বে নিয়ে এক সার্বজনীন ব্যঞ্জনায় মূর্ত করে তোলেন পরিচালক ভরদ্বাজ।
রাজনৈতিক উথান পতনের সমান্তরালে ওমকারা ডলিকে নিয়ে ঘর বাঁধলেও, তাতে সন্দেহের বীজ বপন করে ইয়াগোরূপী লাংদা। ওথেলোতে ইয়াগোর ঘৃণ্য ক্রোধের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপটটুকু (ওথেলো কর্তৃক ইয়াগোকে ডিঙিয়ে ক্যাসিওকে পদোন্নতি প্রদান) অনেকক্ষেত্রেই তার কৃত ষড়যন্ত্রের পটভূমি নির্মাণে যথেষ্ট নয়। এই শূন্যস্থান ভরদ্বাজ পূরণ করেন ওমকারার সঙ্গে লাংদার নিবেদিত সম্পর্কের ঘটনাবলী চিত্রায়নের মাধ্যমে। সিনেমার শুরুতে ডলিকে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়া থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক গণ্ডগোলের সময় ওমকারার আস্থাশীল সহচরের ভূমিকায় আবির্ভূত হয় লাংদা। এর মাধ্যমে ওমকারার সঙ্গে তার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও অধিকার তৈরি হয় তার মাধ্যমে লাংদার প্রত্যাশার যৌক্তিক প্রেক্ষাপট নির্মিত হয় সিনেমায়। ফলত তাকে বাদ দিয়ে কেসুকে পদোন্নতি দেয়ায় ওমকারার প্রতি তার প্রত্যাশাভঙ্গের ক্রোধ এবং প্রতিশোধপরায়ণ ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিক পটভূমি রচিত হয়। ফলে ইয়াগোর অবোধ্য ক্রোধের বিপরীতে লাংদার ক্রমে গড়ে ওঠা ক্রোধের কারণ অনুভব করার অবকাশ থাকে দর্শকের। এছাড়া ভারতের সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যে ওথেলোর রুমাল ওমকারায় পরিণত হয় কোমরের বিছায়। বিয়াংকার পতিতাবৃত্তি এবং তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনার ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিত্রকে বহন করে।
ওমকারার ডলি ওথেলোর ডেসডিমোনার চেয়ে খুব পৃথক কিছু নয়। নির্মাতা এই আখ্যানে ঘুড়ির নাটাই তুলে দিয়েছেন এমিলিয়ার স্থলাভিষিক্ত ইন্দুর হাতে, যে ইয়াগোরূপী লাংদার স্ত্রী। সমাজে পুরুষের অন্যায্য কর্তৃত্বের সমালোচনা থেকে শুরু করে, ডলির জীবনে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনায় বিজ্ঞ মন্তব্য করার মাধ্যমে ইন্দু সিনেমার মধ্যে ওমকারা চরিত্রের (মূলত সমাজে নারী-পুরুষের অবস্থান ও পুরুষের অসম কর্তৃত্বের) সমালোচনা হাজির করে। সিনেমার শেষে পোয়েটিক জাস্টিসের অংশ হিসেবে লাংদার মৃত্যুশূলটিও নির্মাতা তুলে দেন ইন্দুর হাতে। ফলত ছবিজুড়ে বিদ্যমান ইন্দুর মন্তব্যগুলোকে তিনি যেন একধরনের সমর্থন জানাতে চান এই দৃশ্যে।

ওমকারার সমাপ্ত দৃশ্যটি পুরো সিনেমার ট্রাজিক আবহে হীরকখণ্ডের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন সন্দেহ আর জীবন-বিরুদ্ধতার প্রতীকী চিত্র অঙ্কিত হচ্ছে দৃশ্যজুড়ে। দোলনার নিচে পড়ে থাকা ওমকারার মৃতদেহকে দোলনায় থাকা ডলির নিথর দেহ এসে ঢেকে দেয় বারবার। পেছনে বাজতে থাকে দোলনা নড়ার করুণ সুর। যেনবা সন্দেহের সূর্যগ্রহণে ঢেকে যাচ্ছে জীবনের আলো। নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষায় সজ্জিত, লাল শাড়িতে রঞ্জিত ডলির মৃতদেহের আড়ালে ওমকারার সন্দেহগ্রস্ত জীবনের অবয়ব ঢেকে যাচ্ছে বেদনাঘন শব্দে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা দোলনার ছায়ায়।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে স্থানিকতার প্রাসঙ্গিক আবহে, দৃশ্যের শৈল্পিকতা আর চরিত্রদের অগ্রগামিতায় ওথেলোর এক শিল্পিত অভিযোজনে পরিণত হয় বিশাল ভরদ্বাজের এই সিনেমা।
মকবুল
ভরদ্বাজ মকবুলের বীজ নিয়েছেন শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ থেকে। একদিন যুদ্ধে জয়লাভ করে ফেরার পথে স্কটিশ জেনারেল ম্যাকবেথের সঙ্গে দেখা করে তিনজন কুহকিনী। তারা তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে— অচিরেই ম্যাকবেথ কওডরের শাসক নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তীতে হবে স্কটল্যান্ডের রাজা। জেনারেল ম্যাকবেথ একথা শুনে আশ্চর্যান্বিত হয়। এদিকে ম্যাকবেথের যুদ্ধজয়ের খবর পেয়ে রাজা ডানকান খুশি হয়ে ম্যাকবেথকে কওডরের শাসক ঘোষণা করে। পথিমধ্যেই রাজার বার্তাবাহক দূত এসে পদোন্নতি প্রাপ্তির খবর দেয় ম্যাকবেথকে আর সে কুহকিনীদের ভবিষ্যদ্বাণীর ফাঁদে পড়ে যায়। ম্যাকবেথ রাজা হওয়ার গোপন লোভ পুষতে থাকে মনের ভেতর।
এইসব ঘটনা ম্যাকবেথ তার স্ত্রী লেডি ম্যাকবেথকে জানালে সে মরিয়া হয়ে ওঠে স্কটল্যান্ডের রানী হওয়ার জন্য। অগত্যা সে এক গোপন পরিকল্পনা ফেঁদে বসে। রাজা ডানকানকে নিমন্ত্রণ করে নিজেদের প্রাসাদে নিয়ে আসে আপ্যায়ন করার জন্য। রাজা যখন ঘুমে, তখন বাইরে তার প্রহরীদের মদ্যপান করিয়ে বেখেয়াল করে রাখে লেডি ম্যাকবেথ। আর ম্যাকবেথ তখন রাজার শোবার ঘরে গিয়ে তাকে খুন করে। অতঃপর তারা দুজন কিছু না জানার ভান করে রাজার মৃত্যুতে শোকাহত হবার অভিনয় করে এবং ম্যাকবেথ রাজার প্রহরীদেরকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করার অপরাধে তৎক্ষনাৎ হত্যা করে। স্কটল্যান্ডের নতুন রাজা হয় ম্যাকবেথ।

কিন্তু তাদের সুখ দীর্ঘ হয় না। অপরাধবোধের গ্লানিময় ভারে ক্রমে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে ম্যাকবেথ দম্পতি। একদিন ভরা মজলিশে হ্যালুসিনেশন-আক্রান্ত ম্যাকবেথ রাজার অদৃশ্য অবয়ব দেখে আঁতকে উঠলে রাজা-হত্যার গোমর ফাঁস হয়ে যায়। অতঃপর নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ফাইফের শাসক ম্যাকডাফ ও রাজা-পুত্র ম্যালকম যৌথভাবে আক্রমণ করে ম্যাকবেথকে। ম্যাকডাফের হাতে নিহত হয় ম্যাকবেথ। স্কটল্যান্ডের রাজত্ব ফিরে যায় রাজা ডানকানের পুত্র ম্যালকমের হাতে। এভাবে ম্যাকবেথের পতনের মধ্য দিয়ে ট্রাজিক গন্তব্যে পৌঁছায় নাটক।
ভরদ্বাজের শেক্সপিয়ার ট্রিলজির প্রথম সিনেমা মকবুল তিনি স্থাপন করেন তৎকালীন ভারতের টালমাটাল গ্যাংস্টার প্রেক্ষাপটে। ম্যাকবেথের লোভ, প্রতারণা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরিচালক স্থানিক আবহে ফুটিয়ে তোলেন মুম্বাইয়ের অস্থির রাজনৈতিক পটভূমিতে। শেক্সপিয়ারীয় ম্যাকবেথের কুহকীয় ভবিষ্যদ্বাণী মকবুলে ধ্বনিত হয় দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের কণ্ঠে। হিন্দু সংস্কৃতির কুণ্ডলী গণনা করে সে মকবুলের পরবর্তী গ্যাংস্টার হওয়ার আভাস পায়। নির্মাতার সৃজনশীলতায় ভারতীয় মকবুল তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হয়। সিনেমার উদ্বোধনী দৃশ্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন গাড়ির ঘোলাটে কাঁচে আঙুল ঘোরানোর ক্লোজ-আপ দৃশ্যায়নে আসন্ন ঘটনাপ্রবাহে মকবুলের এলোমেলো নিয়তির মানচিত্র ভেসে ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে আনা আসামীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আসন্ন আখ্যানে রক্তাক্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার পাশাপাশি আন্ডারওয়ার্ল্ড বাস্তবতায় পুলিশি অরাজকতার দৃষ্টান্ত দেখান নির্মাতা।
ম্যাকবেথ শেক্সপিয়ারের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ট্রাজেডি। অনেক সমালোচকই মনে করেন নাটকটি অসম্পূর্ণ। কেবল কুহকীয় ভবিষ্যদ্বাণী এবং অবধারিত ভাগ্যের চক্রান্তেই একরকম পতন নেমে আসে ম্যাকবেথের জীবনে। শেক্সপিয়ারের অন্যান্য নাটকের তুলনায় ম্যাকবেথের প্লট তাই অনেকটাই একরৈখিক। এক্ষেত্রে শেক্সপিয়ার হতে কিছুটা এগিয়ে যান ভরদ্বাজ। তিনি মকবুলের উন্মত্ততার পেছনে যথেষ্ট কার্যকারণ যুক্ত করেন। লেডি ম্যাকবেথকে তিনি পরিণত করেন কিং ডানকান তথা আব্বাজীর উপপত্নীতে। লেডি ম্যাকবেথের স্থলাভিষিক্ত নিম্মির সঙ্গে আব্বাজীর একান্ত সহচর মকবুলের গোপন সম্পর্ক ব্যক্ত করার মাধ্যমে নির্মাতা একইসাথে পরকীয়া, বিশ্বাসঘাতকতা এবং তৎকালীন ধনিক সমাজে উপপত্নী হিসেবে নারীর বন্দি হয়ে থাকার চিত্র আঁকেন। ক্ষমতালিপ্সার পাশাপাশি নারীর প্রতি আকর্ষণও মকবুলের কৃতকর্মের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাকবেথের লোভ-লালসা ও রাজনীতির বাইরে গিয়ে মকবুল সম্পর্ক-সংকটেরও এক আখ্যানে পরিণত হয়।
শেক্সপিয়ারীয় আখ্যানের আবহের মধ্যেও স্বভাবসুলভ কায়দায় বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রসঙ্গ আনেন নির্মাতা। সিনেমার এক পর্যায়ে আব্বাজীর মনোরঞ্জনের জন্য বোম্বের এক নায়িকার আবির্ভাব ঘটে। তখন আব্বাজীর বিদ্যমান উপপত্নী নিম্মির মানসিক টানাপোড়নে মনোযোগ দেন নির্মাতা। তিনি অভিজাত সমাজে নারীর পণ্যায়ন চিত্রিত করার সমান্তরালে গ্যাংস্টার কর্তৃক বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ন্ত্রিত হবার অপ্রিয় বাস্তবতাও হাজির করেন সিনেমায়।

সিনেমায় মকবুল কর্তৃক আব্বাজীর হত্যাকাণ্ডের অভিনব দৃশ্যটি নির্মাতার অভিযোজন-মুন্সিয়ানার একটি উদাহরণ। নাট্যমঞ্চের ম্যাকবেথকে জোর করে মকবুলীয় বাস্তবতায় প্রতিস্থাপিত করার কোনো প্রয়াস তাঁর নেই। বরং মকবুল আখ্যানের পরিস্থিতি ও বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়া এক স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্যই তিনি কাহিনীর প্রবাহে সেঁটে দেন। ঘটনাক্রমে নিম্মির উস্কানিতে আব্বাজী তার ধার্মিক দেহরক্ষীকে মদ্যপানে বাধ্য করে। সুযোগ বুঝে নিম্মি মকবুলকে প্ররোচিত করে ঘুমন্ত আব্বাজীকে খুন করতে। অতঃপর খুনের দায় ফেলে নেশাগ্রস্ত দেহরক্ষীর ওপর। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বিশ্বস্ত দেহরক্ষী দ্বারা আব্বাজীর খুন হওয়ার সাজানো ঘটনা, বিশ্বস্ত সহচর মকবুলের বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে মিলে এক নাটকীয় বিদ্রূপ তৈরি করে সিনেমায়।
এভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট পুনর্নির্মাণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্য রচনার মাধ্যমে নির্মাতা ভরদ্বাজ ম্যাকবেথের সফল পুনর্লিখন করেন তাঁর মকবুল সিনেমায়।
ক্লাসিক সাহিত্যের আধুনিক অভিযোজনে নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর দেখি হায়দার, ওমকারা ও মকবুল সিনেমায়। সিনেমার চিত্রনাট্য, সংলাপ, সঙ্গীত ইত্যাদি যাবতীয় উপাদান নির্মাতার আসনে বসে তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। ধ্রুপদী এই নাটকগুলোকে চলচ্চিত্রায়িত করার ক্ষেত্রে তিনি কেন্দ্রীয় আখ্যান ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা নেন, প্রাসঙ্গিক ও নান্দনিক বিচ্যুতি ঘটান মূল থেকে; সমসময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেন; গল্পের বয়নে ব্যক্তিগত দর্শন প্রকাশ করেন। চরিত্রকে নতুন মাত্রা দান করেন; তার ভেতরের ব্যথা-বেদনা-দ্বিধাকে প্রকাশ করেন দৃশ্যের কাব্যিকতায়, সঙ্গীতের লহরীতে। এভাবে সিনেমায় সাহিত্যের পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের এক স্বতন্ত্র লেখক, তথা অটার।