হুসার্ল কে?
দার্শনিক অনুসন্ধানের বিশাল ক্যানভাসে, যেখানে মানবমন বোঝা এবং অর্থের সন্ধানে অগণিত পথ ও পদ্ধতি দেখা যায়, সেখানে একটি নাম তার নিজস্ব উজ্জ্বলতায় জ্বলছে: এদমুন্ড হুসার্ল। ১৮৫৯ সালে জন্মগ্রহণকারী এই জার্মান দার্শনিক ফেনোমেনোলজি১ (বাংলা তর্জমায় বিষয়বিদ্যা, অবভাসবিদ্যা, প্রতিভাসবিজ্ঞান, সংবেদনবিদ্যা প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়) নামে পরিচিত একটি যুগান্তকারী দার্শনিক পদ্ধতির পথপ্রদর্শক ছিলেন, যা ধ্রুপদী দর্শনের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং চিরকালের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার নতুন শাখার সৃষ্টি করে। সূক্ষ্ম ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে হুসার্ল তাঁর দার্শনিক অভিযান শুরু করেছিলেন যার লক্ষ্য ছিল মানুষের চেতনার সারমর্ম এবং যে কাঠামোর মাধ্যমে আমরা বস্তুজগৎ-কে উপলব্ধি করি এবং অনুভব করি তা উন্মোচন করা। একজন দক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো, তিনি বিষয়গত অভিজ্ঞতার স্তরগুলি খনন করেছিলেন, নির্দেশনা এবং অতীন্দ্রিয় বিষয়ের লুকানোর উপাদান উন্মোচন করেছিলেন।
তাঁর লেখা এবং শিক্ষার মাধ্যমে আমরা এমন একটি বৌদ্ধিক তীর্থযাত্রার দিকে যাই যেখানে আমরা আমাদের অস্তিত্ব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সজাগ হই। তাঁর দার্শনিক আলোচনার প্রভাব আমরা তাঁর ছাত্র ও পরবর্তীতে প্রতিদ্বন্দ্বী মার্টিন হাইডেগারের দর্শনে দেখতে পাই। বিংশ শতাব্দীতে সাত্রে, মার্লো পঁতি, পল রিক্যোঁরসহ অসংখ্য মহাদেশীয় ও বিশ্লেষণী দার্শনিকদের দর্শনের রসদ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন হুসার্ল। দার্শনিক বিশ্লেষণকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছেন গণিত ও পদার্থবিদ্যায় শিক্ষাপ্রাপ্ত এই দার্শনিক।
পূর্বসূত্র
ফেনোমেনোলজি আলোচনার আগে যার নাম স্মরণ করতে হয় তিনি হলেন ফ্রাঞ্জ ব্রেনতানো। ফেনোমেনোলজির পূর্বধারণা তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া যায় এবং তিনি ধ্রুপদী জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফেনোমেনোলজির আলোচনার সূত্রপাত ঘটান। প্রশ্নটি ছিলঃ বাস্তুজগতের পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তুগুলো কী? বাস্তবতার সাথে আমাদের চিন্তার যে সম্পর্ক রয়েছে তা প্রমাণ করার জন্য, দার্শনিকরা হয় কোনো না কোনো ধরনের সরল বাস্তববাদকে গ্রহণ করেছেন, অথবা কোনো কোনো দিক থেকে ইন্দ্রিয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু ব্রেনতানো বলেছেন যে বাস্তবতা অনিবার্যভাবে আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রকৃতপক্ষে বস্তুজগতের দিকে নিয়ে যায়, এবং আমাদের এই চিন্তা বস্তুজগতের সাথে সম্পর্কিত কারণ আমাদের চেতনার মাধ্যমেই সে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমাদের চিন্তা যেটাই প্রকাশ করুক না কেন, সেগুলো সর্বদাই কিছু না কিছুর সাথে সম্পর্কিত থাকে, তা হতে পারে কাল্পনিক সত্তা বা কোন সার্বজনীন বিশ্বাস। ব্রেনতানো যখন এই ধরনের ধারণার প্রথম সূত্রপাত ঘটান, তখন তাঁর ছাত্র হুসার্লই এই দাবির উপর ভিত্তি করে তাঁর ফেনোমেনোলজির দর্শন গড়ে তুলেছিলেন, যা একটি দুর্দান্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল। এবং হুসার্লের প্রশ্নটি ছিলঃ আমরা কীভাবে বস্তুগতকে জানি?
হুসার্লের ফেনোমেনোলজি হল একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক পদ্ধতি যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং সচেতন অভিজ্ঞতার বর্ণনার উপর জোর দেয়। বিংশ শতাব্দীর দার্শনিক ধারায় দেখা যায় যে অধিকাংশ দার্শনিক বিমূর্ত ধারণা এবং তত্ত্বের উপর মনোনিবেশ করে দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। হুসার্ল ঐতিহ্যগত এই পদ্ধতির বিপরীতে, ফেনোমেনোলজিকে অভিজ্ঞতা ও বাস্তবের নিরিখে এবং এর প্রকৃতি বুঝবার উপর জোর দেন। কীভাবে চেতনা একটি বস্তু বা ঘটনার দিকে পরিচালিত হয়, তা হুসার্লের ফেনোমেনোলজির একটি মূল বৈশিষ্ট্য। উদ্দেশ্যমূলকতার এই ধারণাটি আমাদের উপলব্ধি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে কারণ আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে পারি যে উপলব্ধি একটি নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া নয় বরং জগতের সাথে এটি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত।
প্রারম্ভিক আলোচনা
হুসার্লকে ফেনোমেনোলজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তিনি চেতনার (Consciousness) উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন এবং ফেনোমেনোলজিকে একটি বর্ণনামূলক প্রচেষ্টা ও পদ্ধতি হিশেবে দেখেছিলেন যার মাধ্যমে বস্তুজগৎ-এর অন্তর্নিহিত কাঠামোগুলি চিহ্নিত করা যায় এবং কিভাবে আমরা বস্তুজগৎ সম্পর্কে সচেতন অভিজ্ঞতাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। ব্যক্তির অভিজ্ঞতার উপর জোর দিয়ে হুসার্ল এটি বলবেন যে ফেনোমেনোলজি মূলত জগতে মানুষ যে বেঁচে থাকে সে তার চেতনার পর্যবেক্ষক হিসাবে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলি পরীক্ষা করে। তাই সোকোলোস্কি ফেনোমেনোলজিকে “মানুষের অভিজ্ঞতার অধ্যয়ন এবং এই বস্তুজগৎ কীভাবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় সেটির বিশ্লেষণ” বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
উত্তর-আধুনিকতাবাদ অনুযায়ী বস্তুজগৎ-এর ব্যাখ্যা মূলত ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফেনোমেনোলজি মনে করে যে বস্তুজগৎ হচ্ছে কতগুলো খণ্ডে বিভক্ত এবং ব্যক্তি তার চেতনা (Consciousness) ও নির্দেশনতার২ (Intentionality) মাধ্যমে সম্পূরক ধারণা পেয়ে থাকে। ফেনোমেনোলজি মূলত জোর দেয় যে বস্তুর অন্তর্নিহিত পরিচয় এবং বোধগম্যতা রয়েছে এবং এই বস্তুজগতের পর্যবেক্ষক হিসাবে আমরা জগতে যা কিছু উপস্থিত ও অনুপস্থিত সে ব্যাপারে ধারণা পেয়ে থাকি। বস্তুজগৎ-এর প্রকৃতির সাথেসাথে আমরা কেবল বস্তুই আবিষ্কার করি না, আমরা নিজেকে প্রকাশের প্রাপক (Active Receiver) হিসাবেও আবিষ্কার করি। ফেনোমেনোলজি কেবল আমরা যা অনুভব করি সে সম্পর্কেই নয়, চিন্তাবিদ হিসেবে নিজেদের (Subject) সম্পর্কেও চিন্তা করতে দেয়। তাহলে বলা যায় ফেনোমেনোলজি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি বুদ্ধির মাধ্যমে বস্তুজগৎকে আবিষ্কার করে। হুসার্লের বহুল প্রচলিত উক্তিটি হলো “সমস্ত চেতনা হল কিছু না কিছুর চেতনা” (All consciousness is consciousness of something) যার মাধ্যমে আমরা ফেনোমেনোলজির সার্বিক একটি ধারণা পেয়ে থাকি। জ্যাঁ পল সাত্রে নিজেও হুসার্লের ফেনোমেনোলজির উপর নির্ভর করে তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনের উম্মেষ ঘটিয়েছেন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক অস্তিত্ববাদী ধারার আন্দোলন শুরু করেন।
হুসার্লের ফেনোমেনোলজির চুম্বক অংশ
হুসার্লের ফেনোমেনোলজির প্রধান কেন্দ্রীয় অংশ হল ‘নির্দেশনতা’ (Intentionality)-এর ধারণা। সুতরাং, হুসার্লের ফেনোমেনোলজি হল এমন একটি দার্শনিক কাঠামো যা চেতনার প্রকৃতি এবং জগৎ সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতাকে অনুসন্ধান করতে সহায়তা করে। ফেনোমেনোলজির ভিত্তি হল এমন একটি উদ্দেশ্যমূলকতার ধারণা, যা বস্তুর প্রতি সচেতনতার সহজাত নির্দেশনাকে বোঝায়। হুসার্লের মতে আমাদের মানসিক প্রক্রিয়াগুলি ক্রমাগত বাহ্যিক জগতের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভ্যন্তরের সন্নিবেশ ঘটায়। হুসার্ল নির্দেশনতা বা অভিপ্রায় বলতে এমন একটি সম্পর্ককে বুঝাতে চেয়েছেন যেটির মাধ্যমে আমাদের সমস্ত সচেতনতা বস্তুর দিকে পরিচালিত হয়। ধরুন, আমরা যখন একটি ফুল দেখি, আমাদের মন সে ফুলের দিকেই পরিচালিত হয়। আমরা সেই ফুলের রং, আকৃতি এবং সুবাস উপলব্ধি করি এবং এইভাবে ফুল আমাদের চেতনার বস্তু হয়ে ওঠে। এই সম্পর্কেই হুসার্ল অভিপ্রায় বা নির্দেশনতা বলছেন। মূলত নির্দেশনতা বা অভিপ্রায় এমন একটি মানসিক ক্রিয়া (Mental Act) যা বাস্তুজগতের দিকে ব্যক্তিকে পরিচালনা করে। তাই বলা যায় যে নির্দেশনতা বা অভিপ্রায় বলতে এমন অবস্থাকে বোঝায় যে আমাদের চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতা ব্যক্তিমন থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং তা বস্তুজগতের সাথে সংযুক্ত থাকে। ব্যক্তি কেবল নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক নয়; আমাদের চেতনা সক্রিয়ভাবে এই জগৎ-এর সাথে জড়িত অর্থাৎ ব্যক্তিমনের বাইরে অন্য কিছুর চেতনা হিসেবে চেতনার অস্তিত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনকে হুসার্ল বলছেন নির্দেশনতা (Intentionality)।
হুসার্লের ফেনোমেনোলজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে ব্রাকেটিং (Epoche)। ব্রাকেটিং অর্থ হচ্ছে কোন কিছুকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা (Suspension of Judgment)। জগৎ সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভের জন্য ব্রাকেটিংকে হুসার্ল গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন কারণ এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে আমরা প্রকৃতি বা বস্তুজগৎ সম্পর্কে যা জানি সেই জানার অবস্থানকে ক্ষণিকের জন্য স্থগিত রেখে খাঁটি, নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার দিকে এগিয়ে যাই। হুসার্ল মনে করেন ব্রাকেটিং-এর মাধ্যমে আমরা চেতনা ও নির্দেশনতার সম্পর্ক বুঝতে পারি এবং এর মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় অহং৩ (Transcendental Ego) সম্পর্কে সচেতন হই।
হুসার্লের মতে নির্দেশনতা বা অভিপ্রায় মানুষের অভিজ্ঞতার একটি মৌলিক দিক যা আমাদের বস্তুজগৎ ব্যাখ্যায় সহযোগিতা করে এবং আমরা কীভাবে উপলব্ধি করি, চিন্তা করি ও বাস্তবতার সাথে জড়িত বিভিন্ন সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। সুতরাং, যখনই আপনি কিছু নিয়ে ভাবছেন বা অনুভব করছেন, মনে রাখবেন যে আপনি অভিপ্রায় বা নির্দেশনতার খেলার মধ্যে রয়েছেন এবং এই খেলার মাধ্যমে আপনার মন আপনার চারপাশের বস্তুজগৎ সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ফেনোমেনোলজি কোন তত্ত্ব নয়, এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে আমরা বস্তুজগৎকে বুঝতে পারি।
অস্তিত্ববাদ ও বিষয়বিদ্যা: অস্তিত্ববাদ হল একটি দার্শনিক আন্দোলন যা বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সে শুরু হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে জ্যাঁ-পল সাত্রে এবং সিমোন দ্য বিভোয়ার-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। অস্তিত্ববাদ মূলত ব্যক্তি অস্তিত্ব, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত দায়িত্বের উপর আলোকপাত করে। অপরদিকে হুসার্লের ফেনোমেনোলজি মূলত সচেতন অভিজ্ঞতার কাঠামো এবং এর ভিত্তি অনুসন্ধান করে। অস্তিত্ববাদ মানব অস্তিত্বের বিষয়গত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকলেও তা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জীবনের অর্থের উপর জোর দেয়।
কাঠামোবাদ ও বিষয়বিদ্যা: কাঠামোবাদ মূলত ষাটের দশকে ক্লদি লেভি-স্ত্রস, রোলা বার্থ এবং মিশেল ফুকোর মতো দার্শনিকদের আলোচনার মাধ্যমে ফ্রান্সে বিকাশ লাভ করে। কাঠামোবাদ মানব সংস্কৃতি, ভাষা এবং চিন্তাভাবনাকে গঠন করে এমন অন্তর্নিহিত কাঠামো বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন দিক আলোচনা করে। কাঠামোবাদ যেখানে ভাষা, চিহ্ন এবং চিহ্নের পরীক্ষার মাধ্যমে লুকানো নিদর্শন এবং রাষ্ট্রের নানা যন্ত্রাংশের৪ (Apparatus) ব্যাখ্যা দেয় সেখানে হুসার্লের ফেনোমেনোলজি প্রথম ব্যক্তির বিষয়গত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত, যা চেতনা ও অভিপ্রায়ের সম্পর্কের উপর আলোকপাত করে।
উত্তর-কাঠামোবাদ ও বিষয়বিদ্যা: উত্তর-কাঠামোবাদ মূলত কাঠামোবাদের প্রতিক্রিয়া হিশেবে বিকশিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উত্তর-আধুনিকতাবাদের আলোচনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। জাঁক দেরিদা, মিশেল ফুকো এবং জিল দেল্যুজের মত চিন্তাবিদরা কাঠামোবাদের ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ভাষা ও অর্থের পরিবর্তনশীলতা এবং অনির্দিষ্টতার উপর জোর দিয়েছিলেন। উত্তর-কাঠামোবাদ ও উত্তর-আধুনিকতাবাদ যেখানে ব্যাখ্যাতত্ত্বের৫ (Hermeneutics) উপর জোর দেয় সেখানে ফেনোমেনোলজির প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
হুসার্লের চোখে ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও মানবের সংকট
হুসার্লের অসমাপ্ত কাজটি হচ্ছে The Crisis of European Sciences and Transcendental Phenomenology (Die Krisis der europäischen Wissenschaften und die transzendentale Phänomenologie: Eine Einleitung in die phänomenologische Philosophie) বা ইউরোপীয় বিজ্ঞানের সংকট এবং অতীন্দ্রিয় বিষয়বিদ্যাঃ ফেনোমেনোলজি দর্শনের একটি ভূমিকা ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং এর ইংরেজি অনুবাদ তাঁর মৃত্যুর ২২ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। হুসার্লের ফেনোমেনোলজির এই কাজটিকে অনেকসময় হেগেলের ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিটের (১৮০৭) সাথে তুলনা করা হয়। Logical Investigations/Logische Untersuchungen (১৯০০) ও Ideas (১৯১৩)-এ মূলত ভাষা, যুক্তি ও অধিবিদ্যার উপর আলোকপাত করেন এবং মনস্তত্ত্ববাদের (Psychologism) সমালোচনা করেন, কিন্তু The Crisis of European Sciences and Transcendental Phenomenology-এ দেখান যে সমসাময়িক বিজ্ঞান যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে তার কারণ হচ্ছে কেবল বস্তুগত বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া ও বিষয়গত দিককে উপেক্ষা করা। তিনি মনে করেন যে প্রাকৃতিক মনোভাব (Natural Attitude) মূলত বৈজ্ঞানিক বিশ্বদর্শনকে চিহ্নিত করে চেতনা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বাহ্যিক বস্তু এবং তাদের পরিমাপযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলির উপর গুরুত্ব দেয় সেখানে বিজ্ঞান ও মানবের সংকট অনিবার্য। তাই বিষয়গত অভিজ্ঞতার এই উপেক্ষার ফলে আধুনিক বিজ্ঞানে জ্ঞানের বিভাজন ঘটেছে এবং এটি তার নিজস্ব অর্থ হারিয়েছে।
সংকটের পর্যালোচনা
হুসার্লের মতে, রেনেসাঁর পর ইউরোপীয় বিজ্ঞান একটি বিপজ্জনক পথে এগিয়ে গেছে। বিশ্বজনীন বিজ্ঞানের (Universal Science) ভুল বুঝাবুঝির কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টবাদমূলক বিজ্ঞানের৬ (Positivistic Science) এহেন দৃষ্টিভঙ্গি ও এর সফলতার মধ্যে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে এবং ব্যক্তিচেতনার অর্থ সংকটে পড়েছে। যার ফলে, ইউরোপীয় মানব সম্প্রদায় মানবের অর্থ (The Meaning of Man) বুঝতে ভুল করেছে। হুসার্ল মনে করতেন বিজ্ঞানের ভিত্তি বস্তুগত নয় বরং বিষয়গত ভাবের উপর৭ (Human Spirit) ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা উচিৎ। ইউরোপ এই হিউম্যান স্পিরিটকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেছে যার ফলে মানব অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি হয়েছে, উদাহরণস্বরূপ আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলতে পারি। হুসার্লের মতে নতুন যুগের বিজ্ঞান মোটেও মানব অস্তিত্বের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখেনি বরং সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
প্রকৃতিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং অন্ধভাবে (তারা এই বক্তব্যকে যতই আক্রমণ করুকনা কেন) মানবতাবাদীরা সার্বজনীন সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিশুদ্ধ মানবতাবাদী বিজ্ঞানের শাখা হিশেবে আত্মার (Spirit) সারাংশের তত্ত্ব অনুসন্ধান করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। আত্মাকে সর্বজনীন, আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রের উপাদানকে উপেক্ষা করে চূড়ান্ত অর্থে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়েও তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তাহলে বলা যায় যে ইউরোপের মানবতাবাদী বিজ্ঞান প্রাকৃতিক আদর্শের আইনকে উপেক্ষা করেছে। ইউরোপীয় মানুষের যুক্তিতে এই ধরনের ব্যর্থতার ফলে দ্বৈতবাদী দার্শনিক অচলাবস্থার৮ (A Dualistic Philosophic Impasse)৯ সৃষ্টি হয়েছে। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে বিষয়বাদী ভাববাদ এবং সরল বস্তুবাদী বাস্তববাদের মধ্যে একটি বিভেদ তৈরি হয়েছে। এটি বিংশ শতাব্দীতে এমন এক বিভ্রান্তি বা সংকটের সৃষ্টি করেছে যা প্রতিটি ইউরোপীয় নাগরিকের একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের গোড়া বিশ্লেষণ
সংকটের মূল বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ভাববাদের আসল প্রকৃতি কেমন এবং হুসার্ল নিজেও ভাববাদের আসল প্রকৃতি বুঝবার উপর গুরত্ব দিয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীতে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের১০ যে প্রভাব আমরা বিজ্ঞানে দেখি সে ধারার সমালোচক ছিলেন হুসার্ল। তাঁর মতে প্রত্যক্ষবাদীরা মূলত ব্যক্তির ‘আমি/I’ হয়ে প্রকাশ করার যে ক্ষমতা রয়েছে সেটিকে অস্বীকার করেছে যার ফলে বিজ্ঞানের সত্যিকার অর্থ বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
রেনেসাঁসের প্রভাবে সৃষ্ট মতবাদসমূহ এবং এর প্রভাবে পরবর্তী সময়ে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রভাব ইউরোপীয় চিন্তাধারায় পরিলক্ষিত হয়, সেখানে হুসার্ল এর সমালোচনা করে বলেন যে এই প্রচলিত ধারণাসমূহ সত্ত্বার এবং বিজ্ঞানের মূল অর্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সমস্যা সৃষ্টির পিছনে রয়েছে নিজেকে (Self) বোঝার ক্ষেত্রে বিষয়গত অভিজ্ঞতার (Subjective Experience) প্রভাব এবং যার ফলে সেই যুগের বুদ্ধিবাদীরা যখন পজিটিভিজম বা যৌক্তিকবাদকে গ্রহণ করতে গেলেন ঠিক সেই সময়ে তারা আমি (I)-এর ধারণা থেকে দূরে সরে গেলেন। হুসার্ল মূলত এই ধারণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করেছিলেন।
হুসার্ল ভাববাদ এবং বাস্তব জগতের একটি সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থার কল্পনা করেছিলেন যেখানে, বেঁচে থাকার জগৎ থেকে (Living World) মানুষ বিচ্ছিন্ন (Alienated) থাকবেনা বরং পারিপার্শ্বিকতার উপর মানুষ নির্ভরশীল হবে। তাঁর মতে প্রত্যক্ষবাদীরা বিজ্ঞানের কৃত্রিম ব্যাখ্যা দেবার ফলেই ইউরোপীয় সমাজে এই বিচ্ছিন্নতার১১ সৃষ্টি হয়েছে, এবং এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে সেটি তিনি আগাম বুঝতে পেরেছিলেন।১২
অনেক সমাজ তাদের নিজস্ব আত্মা (Self) সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে “বিচ্ছিন্নতায়” পর্যবসিত হয়েছে।
তাই ইউরোপীয় মানবের সংকট সম্পর্কে হুসার্লের বিশ্লেষণ আধুনিক সমাজের বিচ্ছিন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য মানব অস্তিত্বের বিষয়গত, আন্তঃবিষয়িক এবং অস্তিত্বসম্পর্কিত নানা দিকগুলো পুনরায় আবিষ্কার এবং পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সংকট সমাধানের উপায় কি আছে?
সংকটের প্রকৃতি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর হুসার্ল রূপক অর্থে বলতে চাইছেন যে ইউরোপীয় মানব তার বেঁচে থাকার জগতের সবগুলো দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এবং এই দরজা খোলার জন্য প্রয়োজন এক নতুন চেতনার। কিন্তু এই নতুন চেতনার প্রয়োগ ঘটবে কিভাবে? হুসার্ল বিজ্ঞানীদের ও প্রত্যক্ষবাদীদের আধ্যাত্মবাদ (Spiritualism) গ্রহণ করার কথা বলছেন, কারণ আধ্যাত্মবাদের মাধ্যমেই ব্যক্তির ‘আমি/I’ এই বস্তুজগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। এই আধ্যাত্মবাদ গ্রহণ করার জন্য কোন বিজ্ঞানীকে আগে দার্শনিক হতে হবে, এর মানে এই যে এই দার্শনিক হবার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে মানুষের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং অস্তিত্ব সম্পর্কে “বাস্তব” প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য সচেষ্ট হবেন।
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পদ্ধতিকে অবশ্যই আত্মার রহস্যকে আলিঙ্গন করতে হবে এবং আত্মার বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।১৩
হুসার্ল মনে করতেন বিজ্ঞান কেবল পরীক্ষামূলক ঘটনার সাথে (Facts) সম্পর্কযুক্ত থাকলে ব্যক্তি ও বুদ্ধির মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি হয়ে যাবে। তাই বিজ্ঞানের শুধুমাত্র ফ্যাকচুয়াল বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয় বরং এর একটি আদর্শনিষ্ঠ (Normative) ভিত্তির প্রয়োজন রয়েছে। হুসার্ল মূলত বিজ্ঞান-ব্যক্তি-আধ্যাত্মবাদ-অতীন্দ্রিয় বিষয়াদিকে এক রেখায় এনে সংকট মোকাবেলার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ইউরোপীয় অস্তিত্বের সংকট দুটির যেকোন একটি উপায়ে শেষ হতে পারে:
- ইউরোপ নিজেকে বুদ্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং নিজের আত্মাকে সে আলাদা করে ফেলেছে, যা আত্মার প্রতি বর্বর বিদ্বেষে পতিত হয়েছে; (এখানে বলে রাখা ভালো হুসার্লের লেখার মধ্যে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখতে পাই)।
- দর্শনের চেতনা থেকে ইউরোপের পুনর্জন্মে, যুক্তির বীরত্বের মাধ্যমে যা নিশ্চিতভাবে প্রকৃতিবাদকে অতিক্রম করবে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় বিপদ হল অবসন্নতা। আসুন আমরা ‘ভাল ইউরোপীয়’ হিসাবে এই বিপদের সাথে এমন সাহসের সাথে লড়াই করি যা অন্তহীন যুদ্ধকেও এড়িয়ে যায় না (হুসার্লের এই বক্তব্যের পরেও আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখি)। যদি আমরা তা করি, তাহলে অবিশ্বাসের ধ্বংসাত্মক উদ্দীপনা থেকে, মানবতার প্রতি পশ্চিমের মিশনের হতাশার জ্বলন্ত স্রোত থেকে, মহান ক্লান্তির ছাই থেকে, আমরা আত্মার একটি নতুন অভ্যন্তরীণ জীবনে গড়ে তুলবো যা হবে ফিনিক্স পাখির মতন। যেখানে মহান এবং দূর মানব ভবিষ্যত নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে কারণ আত্মা অমর।১৪
সহায়ক গ্রন্থাবলি
- Gallagher, Shaun. Phenomenology. Palgrave Macmillan, 2013.
- Hopkins, B.C. (2011). The Philosophy of Husserl. McGill-Queen’s University Press: Kingston.
- Husserl, E. Philosophy and the Crisis of European Man: The Vienna Lecture, Vienna, 10 May 1935.
- Husserl, E. The Crisis of the European Sciences and Transcendental Phenomenology, trans. D. Carr (Evanston, 1970).
- Husserl, E. (1975). The Paris Lectures. Springer Shop: New York.
- Husserl, E. (2014). Ideas for a Pure Phenomenology and Phenomenological Philosophy. Hackett Publishing Company: Cambridge.