চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতাদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও চর্যাপদ যে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন সে ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। চর্যাপদের রচনাকাল যদি ৭৫০ থেকে শুরু হয়, একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলা সাহিত্যের বয়স দাঁড়ায় প্রায় ১৩শ বছর। বাংলা সাহিত্যের আজকের যে অবস্থান তা এই ১৩শ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে পথ চলার ফসল। এই ১৩শ বছরে বাংলা সাহিত্যের গতিধারা একই খাতে প্রবাহিত হয়নি। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এ অঞ্চলের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে। আর এসব পরিবর্তনের আঁচড় লেগেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। এ দীর্ঘ ১৩শ বছর ধরে বাংলা সাহিত্য নানান উত্থান-পতন এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
বিচিত্র পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বিচার করে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতারা বাংলা সাহিত্যকে প্রাচীন যুগ (৭৫০-১২০০), মধ্য যুগ (১২০০-১৮০০) এবং আধুনিক যুগ (১৮০০-) এ তিন ভাগে বিভক্ত করেন। আর মধ্যযুগের ভিতর ১২০০ সাল থেকে ১৩৫০ সাল—এই দেড়শ বছরকে বাংলা সাহিত্যের ‘তামস যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এবং মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী করা হয় তুর্কী তথা মুসলমানদেরকে। বক্ষ্যমাণ এই আলাপে আমরা তথাকথিত অন্ধকার যুগ এবং এর প্রকৃত কারণ নিয়ে একটা নির্মোহ বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
আমাদের কথা হলো বাংলা সাহিত্যের যে ডার্ক এইজ বা অন্ধকার যুগের কথা বলা হয় সেটা তুর্কী আমল বা ১২০৪ সাল থেকে শুরু হয়নি। বরং বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের শুরু হয় সেন আমল থেকে। তুর্কী আগমনের পর যে সময়টাতে কোনো বাংলা সাহিত্য হয়নি সেটা মুসলমানদের বাংলা বিদ্বেষ, ধর্মীয় নিপীড়ন, গণহত্যা, বীভৎস হিংস্রতা, লুণ্ঠন ইত্যাদি কোনোটার কারণে নয় বরং সেনদের বাংলা বিদ্বেষের কারণে। পাল আমলে বাংলা সাহিত্যের যে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয় তার গতিরুদ্ধ হয়ে যায়। থেমে যায় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ। আর সে সংকট থেকে উত্তরণে ব্যয় হয়েছিল দীর্ঘ দেড়শ বছর।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের অন্তরায়
বাংলা ভাষা বলতে বর্তমানে যে ভাষাকে বুঝায় সে ভাষার সাহিত্যের জানা ইতিহাস থেকে আমরা যা জানতে পারি তা হলো পাল আমল থেকে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু। পালরা ছিলো ধর্মে বৌদ্ধ। তাঁদের শাসনামলে বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিলো। ধর্ম পালন ও ভাষা ব্যাবহারে ছিলো না কোনো বিধিনিষেধ। আর এ আমলে রচিত হয় বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ।
পালদের পর বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে সেনরা। ভারতের দক্ষিণ অঞ্চল কর্ণাটক ছিলো সেনদের আদি নিবাস। সেনরা জাতিতে ব্রহ্মক্ষত্রিয় অর্থাৎ তারা একসময় ব্রাহ্মণ ছিলেন পরে কোনো এক সময় ক্ষত্রিয় বৃত্তি গ্রহণ করেন। তো, বাংলায় সেনরা পালদের অধীনে সৈনিকের চাকরি করতেন। পাল রাজারা দুর্বল হয়ে পড়লে সেনরা সুযোগ বুঝে বাংলার মসনদ দখল করে নেন। এ বংশের শক্তিশালী রাজা বিজয় সেন পাল রাজা রামপালকে পরাজিত ও হত্যা করে ক্ষমতার ভিত মজবুত করেন। আর এ শক্ত ভিতের উপর বিশাল সাম্রাজ্যের প্রাসাদ তৈরি করেন সেন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বল্লাল সেন, যা ভেঙে পড়তে শুরু করে লক্ষ্মণ সেনের হাতে।
সেনরা ছিলো কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী। তারা পাল রাজাদের মতো উদার ছিলো না। ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনরা বাংলায় এক ভাষা, এক বর্ণ, এক ধর্ম, এক আদর্শের আধিপত্য কায়েম করে। তাদের বর্ণ ব্রাহ্মণ্যবর্ণ, ধর্ম ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, ভাষা সংস্কৃত ভাষা, আদর্শ পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য সমাজাদর্শ। সেনদের অত্যাচার-নিপীড়নে বাংলার আত্মজ শ্রেণি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যবাদি জীবনাদর্শের রোষানলে পড়ে বাংলার অন্ত্যজ শ্রেণির ভাষা ও সংস্কৃতি দীর্ঘ সময়ের জন্য কোমায় চলে যায়।
সেনরা যে শিল্প সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নাই তা কিন্তু না। সেন আমলে সংস্কৃত সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। সেন রাজারাও সংস্কৃতে বড় বড় গ্রন্থ রচনা করেন। সেন রাজা বল্লাল সেনের রচিত ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ সংস্কৃত ভাষার অমর গ্রন্থ। শেষ সেন শাসক লক্ষ্মণ সেনও একজন কবি ছিলেন। তাঁর রাজসভায় সে যুগের প্রতিভাধর কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য সংস্কৃত ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন।
সেনরা যখন বাংলা শাসন করেছেন, সে দ্বাদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতের বিশাল অংশ মুসলিম শাসকদের অধীনে চলে আসে। তাদের এ বিজয় অভিযান অব্যাহত থাকে। ভারতবর্ষের একের পর এক রাজ্য তাদের করতলগত হতে থাকে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলা বিজয় হওয়াটাও ছিলো সময়ের ব্যাপার মাত্র এবং সে কাজটা সম্পন্ন হয় এক ভাগ্যান্বেষী তুর্কী সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির হাতে। বলা হয়ে থাকে বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ঢুকে পড়ে লক্ষ্মণ সেনের রাজপ্রাসাদে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাজা নগ্ন পদে পালিয়ে যায় পিছনের দরজা দিয়ে। প্রায় বিনা বাধায়, বিনা রক্তপাতে বাংলার ক্ষমতার পরিবর্তন হয়।
তুর্কি মুসলমানরা বাংলার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংস্কৃত ভাষা তার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে ফেলে। সেনদের মতো তুর্কী মুসলমানরা সংস্কৃতকে পবিত্র কোনো ভাষা মনে করে না। সংস্কৃত তাদের কাছে অন্যান্য ভাষার মতোই একটা ভাষা ছিলো। ফলে তুর্কী মুসলমানদের হাতে সংস্কৃতের কদর কমে যায়। আস্তে আস্তে এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যেকদিনের ভাষা ‘বাংলা’ দীর্ঘদিনের জোরপূর্বক দমন থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে। আবার তাদের কাছে যেটা পবিত্র ভাষা, সেই আরবিও ওই শূন্যস্থান পূরণ করে না। বরং ‘তুর্কি বিজয়ের পর প্রাকৃতজনেরা প্রশ্রয় পেয়ে বাংলা রচনা করেছে মুখে মুখে।’ তবে বাংলা লেখ্য রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই দেড়শো বছরকে আমরা বাংলা ভাষা গঠনের সময় বলতে পারি।
তারপর আস্তে আস্তে লেখকেরা বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা আরম্ভ করেন। যার দরুন, সুলতানি আমলে ব্যাপকহারে বাংলা সাহিত্য রচিত হয়। সেখানে হিন্দু-মুসলিম সমানে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন।
তাহলে কেন ১২০০-১৩৫০, এই দেড়শ বছর বাংলা সাহিত্য হয়নি?
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৭০) তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা’ গ্রন্থে অন্ধকার যুগের কারণ বর্ণনা করেছেন এভাবে, “তুর্কীরা শুধু দেশ জয় করেই সন্তুষ্ট হয়নি, তারা বংলার জীবনে গুরুতর আঘাত হেনেছিল। তুর্কী মুসলমানরা হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ মঠবিহারের মধ্যে একটি ব্যাপক ধ্বংস অভিযান চালিয়েছিল। এই হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ মঠই ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এবং এই কারণেই বোধ হয় তুর্কী বিজয়ের প্রায় দুইশত বছর ধরে বাংলা সাহিত্য রচনার আর কোন নিদর্শন মেলে না। মঠ-মন্দিরে রক্ষিত গ্রন্থাবলী বিনষ্ট হয়েছিল। এবং এই অন্তর্বর্তীকালে সমস্ত বাংলা রচনাও এই বিনাশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। সেই জন্য চর্যাপদের পর বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (১৩৫০) পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে একটি বিরাট শূন্যতার যুগ।”
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’-এ গ্রন্থে লিখেছেন, “শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার দ্বারা মুসলমানেরা অমানুষিক বর্বরতার মাধ্যমে বঙ্গসংস্কৃতির ক্ষেত্রে তামস যুগের সৃষ্টি করে।” তিনি মনে করেন, ‘বর্বর শক্তির নির্মম আঘাতে বাঙালি চৈতন্য’ হারিয়েছিল।” তিনি আরও লিখেছেন, “তুর্কি রাজত্বের আশি বছরের মধ্যে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রাণহীন অখণ্ড জড়তা ও নাম-পরিচয়হীন সন্ত্রাস বিরাজ করিতেছিল। কারণ সেমীয় জাতির মজ্জাগত জাতিদ্বেষণা ও ধর্মীয় অনুদারতা। ১৩শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই বাংলাদেশ মুসলমান শাসনকর্তা, সেনাবাহিনী ও পীর ফকির গাজীর উৎপাতে উৎসন্নে যাইতে বসিয়াছিল।”
ভূদেব চৌধুরীরও বলেছেন — ‘বাংলার মাটিতে রাজ্যলিপ্সা, জিঘাংসা, যুদ্ধ, হত্যা, আততায়ীর হস্তে মৃত্যু নারকীয়তার যেন আর সীমা ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর প্রজাসাধারণের জীবনের উৎপীড়ন, লুণ্ঠন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মহানির সম্ভাবনা উত্তরোত্তর উৎকট হয়ে উঠেছে। স্বভাবতই জীবনের এই বিপর্যয় লগ্নে কোন সৃজনকর্ম সম্ভব হয় নি।’
ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুকুমার সেনও (১৯০১-৯২) এ ব্যাপারে শ্রীকুমারের সে একই বয়ান প্রচার করেছেন — ‘তুর্কি আক্রমণের ফলে বাঙালির বিদ্যা ও সাহিত্যচর্চার মূলে কুঠারাঘাত পড়িল। প্রায় আড়াই শত বৎসরের মতো দেশ সকল দিকেই পিছাইয়া পড়িল। দেশে শান্তি নাই, সুতরাং সাহিত্যচর্চা তো হইতেই পারে না। প্রধানত এই কারণেই ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ এই দুই শতাব্দীতে রচিত কোনো বাঙ্গালা সাহিত্য পাওয়া যায় নাই।’
উপরের প্রত্যেকটা বক্তব্য একটি কারণ, একটি বয়ান ও একটি প্রোপাগাণ্ডা-ই প্রচার করে— তা হলো তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণ। তাদের হাজির করা এ বয়ানটি যদি বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ এবং নিরেপক্ষ হতো, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকতো না। কিন্তু তারা স্রেফ একটি জাতির আগমনকে কলঙ্কিত করতে বিদ্বেষবশত ১২০০ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ গণনা করে।
কেন এ সময়টাতে উল্লেখ করার মতো কোনো সাহিত্য হয়নি এর পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। অথচ এ ঐতিহাসিকদের আলাপ ঘুরেফিরে যেখানে এসে স্থির হয় তা হলো তুর্কী মুসলমানদের আক্রমণ, তাদের কথার ভাবখানা এই যে— বখতিয়ার খিলজি এখানে রেইন অফ টেরর কায়েম করেছেন। সে গোটা বাংলাকে একটা মৃত্যুপুরি বানিয়ে রেখেছে, বাংলা ভাষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে, এখানে কেউ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে সাহস পায়নি।
প্রশ্ন হলো আসলেই কি বখতিয়ার খিলজি বাংলায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন, নির্বিচার গণহত্যা চালিয়েছেন এবং বাংলা ভাষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন?
স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত ‘History of Bengal (Vol.ii)’ গ্রন্থে শাসক হিসেবে বখতিয়ার খিলজির চরিত্র অঙ্কন করেছেন এভাবে — “মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার পরবর্তী দুই বছর তার বিজিত রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন… সে কোনো রক্তপিপাসু ছিলেন না এবং প্রজাদের উপর জুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে কোনো আনন্দ পেতেন না।”১
মুসলমানদের বাংলা বিজয় বাংলার প্রাকৃতজনদের জন্য কতটা আশীর্বাদ ছিলো তা দীনেশচন্দ্র সেনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়।
দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেছেন, “বৌদ্ধগণ এতটা উৎপীড়িত হইয়াছিল যে তাহারা… মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়কে ভগবানের দানস্বরূপ মনে করিয়াছিল। শূন্য পুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়— তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল। …ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে, সেন রাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমতো কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে, বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়াছে।”
অন্ধকার যুগের প্রকৃত কারণ
তুর্কী মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের কারণে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়নি বরং তাদের বাংলা বিজয় প্রায় বিপন্ন বাংলা ভাষাকে নতুন জীবন দান করেছে। তবে ১২০০ সাল থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত দেড়শ বছর যাবৎ কেনো বাংলা সাহিত্য হয়নি এর পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। এখন, আমরা সে ব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ কারণ পেশ করার চেষ্টা করবো।
চর্যাপদের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের জার্নি শুরু হয়েছিল। কিন্তু এ জার্নি হঠাৎ থেমে যায় কেন এবং কখন থেমে যায়?
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতারা মনে করেন ৭৫০-১০৫০ সনের মধ্যে চর্যাগীতিগুলো রচিত হয়েছিল। আর তখন বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলো পালরা। এরপর ১০৭০ থেকে ১২৩০ পর্যন্ত সেনরা বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলো। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, পাল আমলে চর্যাপদ রচনার যে ধারাবাহিকতা ছিলো, সেনরা বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর চর্যাপদের সে ধারাবাহিকতা আর পাওয়া যায়নি। আর চর্যাপদের ধারাবাহিকতা যখন থেকে বন্ধ হয় তখন থেকেই বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের শুরু হয়।
তার মানে এ নয় যে, সেন আমলে সাহিত্য চর্চা হয়নি। সেন আমলে দেদারছে সাহিত্য হয়েছে। তবে তা বাংলা ভাষায় নয়, সংস্কৃত ভাষায়। সেন যুগ ছিলো সংস্কৃত সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। সেনরা যদি প্রাকৃতজনদের মুখের ভাষার প্রতি পালদের মতো একটু উদার হতো তাহলে সেনযুগ বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হতো। কিন্তু, তারা বাংলা ভাষায় ধর্মচর্চার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা তো শাস্ত্রীয় বাণী উচ্চারণ বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্থ শ্রবণকারীদের নরকের ভয় দেখায়— “অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।” এর অর্থ হলো, অষ্টাদশ পুরাণ, রামচরিত ইত্যাদি শাস্ত্রগ্রন্থ যে বঙ্গানুবাদে শুনবে তাঁর ঠিকানা হবে রৌরব নামক নরক।
শ্রী দীনেশচন্দ্র সেনের জবানীতে সেন আমলে বাংলা ভাষার মর্যাদা কেমন ছিলো তা পরিষ্কারভাবে উঠে আসে। উনি লিখেন — “ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে পণ্ডিতমণ্ডলী দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাঁড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণ্যেরা যেরূপ দূরে থাকেন, বঙ্গভাষা তেমনি সুধীজনের অপাঙ্ক্তেয় ছিল, তেমনি ঘৃণার, অনাদরের ও উপেক্ষার পাত্র ছিল।” (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫)
অনেকে অভিযোগ করেন যে মুসলমান শাসকরা শিল্প-সাহিত্যের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা সে আমলের গ্রন্থসমূহ নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু আসলেই কি তাই? সেন আমলে রচিত গ্রন্থ — দানসাগর, অদ্ভুতসাগর, সদুক্তিকর্ণামৃত ইত্যাদি সাহিত্যকর্ম আমাদের সামনে হাজির। মুসলমান শাসকরা এগুলো কেন ধ্বংস করেনি? তারা কি শুধু বেছে বেছে বাংলা সাহিত্যের রচনাগুলো নষ্ট করেছে? যেটা অবিশ্বাস্য এবং হাস্যকর।
বাংলা ভাষা রক্ষায় মুসলমানদের অবদান স্বীকার করে দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, “আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গৌড়ের সম্রাটগণের প্রবর্তনায় হিন্দুশাস্ত্র গ্রন্থের অনুবাদ আরম্ভ হইল।” তিনি আরও বলেন, “মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হইতেই আসুন না কেন, এ দেশে আসিয়া সম্পূর্ণরূপে বাঙালি হইয়া পড়িলেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ মধ্যযুগের তথাকথিত অন্ধকার যুগে কোনো বাংলা সাহিত্য না হওয়ার অনেকগুলো কারণ শনাক্ত করেছেন, সেগুলো হলো—
১. ধর্মমত প্রচারের কিংবা রাজ্যশাসনের বাহন হয়নি বলে বাংলা তুর্কি বিজয়ের পূর্বে লেখ্য ভাষার মর্যাদা পায়নি।
২. তের-চৌদ্দ শতক অবধি বাংলা ভাষা উচ্চবিত্তের সাহিত্য রচনার যোগ্য হয়ে ওঠেনি। এ সময় প্রাকৃতজনের মুখে মুখে গাথা ও ছড়া-পাঁচালিই চলত। কোনো ভাষাতেই রসসাহিত্য চৌদ্দ শতকের পূর্বে রচিত হয়নি। তুর্কি বিজয়ের পর প্রাকৃতজনেরা প্রশ্রয় পেয়ে বাংলা রচনা করেছে মুখে মুখে। তাই লিখিত সাহিত্য অনেককাল গড়ে ওঠেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভাষা বিকশিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনই তার বড় প্রমাণ।
৪. তের-চৌদ্দ শতক সংস্কৃত চর্চার কেন্দ্র ছিল হিন্দু শাসিত মিথিলায়, তাই এ সময় বাংলাদেশে সংস্কৃত চর্চা বিশেষ হয়নি। শুধু কিছু কিছু শাস্ত্র গ্রন্থের অনুশীলন হয়েছিল।
৫. আলোচ্য যুগে বাংলায় কিছু পুঁথিপত্র রচিত হলেও জনপ্রিয়তার অভাবে, ভাষার বিবর্তনে এবং অনুলিপিকরণের গরজ ও আগ্রহের অভাবে তা নষ্ট হয়েছে। অযত্নে অপ্রিয় বা বাজে ছাপা বইও অকালে লুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আগুন-জল-উই কীট তো রয়েইছে।
৬. লিখিত হলেও কালে লুপ্ত হওয়ার বড় প্রমাণ চর্যাগীতি, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শেখ শুভোদয়া প্রভৃতির একাধিক পাণ্ডুলিপির অভাব।
৭. চর্যাগীতি রচনার শেষ সীমা যদি বার শতক হয়, তাহলে তের-চৌদ্দ শতক বাংলা ভাষার গঠন যুগ তথা স্বরূপ প্রাপ্তির যুগ। কাজেই এ সময়কার কোনও লিখিত রচনা না থাকারই কথা। তখনকার সমাজে বাংলা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় আমরা বাংলা-কবিও দেখতে পেতাম।
৮. দেশজ মুসলমানের ভাষা চিরকালই বাংলা। বাংলায় লেখ্য রচনার রেওয়াজ থাকলে তুর্কি বিজয়ের পূর্বের বা পরের মুসলমানের রচনা নষ্ট হবার কারণ ছিল না। হিন্দুরা যে অশ্রদ্ধাবশত বাংলা ভাষায় কখনও সাহিত্য সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়নি, লৌকিক দেবতার পূজা প্রচারেই প্রয়াসী ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে আঠার শতক অবধি লিখিত হিন্দুর রচনায়।
সাহিত্যে যুগ বিভাজনের অনেক স্কেল রয়েছে। কিন্তু আমাদের এ লেখকেরা যে স্কেল দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাজন করেছেন তা হলো বিদ্বেষের স্কেল। শ্রীকুমার, অসিতকুমার, ভূদেব চৌধুরী প্রমুখ, যারা ১২০০ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ গণনা করেছেন, তারা স্রেফ একটা জাতির গায়ে কালিমা লেপন করার জন্য বাংলা সাহিত্যে ১২০০ থেকে ১৩৫০ এ সময়টাকে অন্ধকার যুগ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানদেরকে বাংলা ভাষার শত্রু বানানোর অপতৎপরতা চালিয়েছেন।
আমরা জানি পুরো মধ্যযুগ ধরে বাংলায় মুসলিম শাসকদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো। মুসলিম শাসকদের ক্রমবর্ধমান সে প্রতাপ-প্রতিপত্তি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ বাংলায় মুসলমানদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার পর তারা যদি হিন্দু উৎখাতে মনোযোগ দিতো তাহলে এই বাংলামুলকে হিন্দু ধর্ম বলে কোনো কিছু থাকতো না। অথচ আমরা দেখছি হিন্দু ধর্ম বহাল তবিয়তে আছে। তলোয়ার দিয়ে ইসলাম প্রচারের অভিযোগ যে ভিত্তিহীন তার মত তো অনেক ঐতিহাসিকরা দিয়েছেন।
সবশেষে আমাদের বক্তব্য হলো, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০০ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত যে সময়টাকে অন্ধকার যুগ বলে ধরা হয় সেটা সত্য নয়। সত্য হলো, বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ বলে কোনো কিছু থেকে থাকলে তা শুরু হয় সেনদের বাংলা দখলের পর থেকে। আর তুর্কীদের আগমন পরবর্তী যে দেড়শ বছর বাংলা সাহিত্য হয়নি তার কারণ — সংস্কৃত ভাষার পদদলিত হয়ে বিলীয়মান বাংলা ভাষা তাঁর স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে লেগেছে আরও ১৫০ বছর।