মুন্না জিবরান | ১ম সংখ্যা · পৃষ্ঠা ৪৯
“তাদের আবার পাখনা থেকে পা গজাবে।”
— থিওডোর হার্ৎজেল
গাসসান কানাফানি (১৯৩৬-১৯৭২) ছিলেন ফিলিস্তিনি ঔপন্যাসিক ও বামপন্থী রাজনীতিক। বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন’ এর তিনি ছিলেন মুখপাত্র। বিংশ শতকের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আরব লেখক ও সাংবাদিকদের মধ্যে কানাফানি অন্যতম। ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস ও সাহিত্য সমালোচনার ওপর তার লিখিত বইয়ের সংখ্যা ১৮। এছাড়াও সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের ওপর লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। ১৯৪৮ সালে সংঘটিত ‘নাকবা’য় তিনি সপরিবারে বাস্তুচ্যুত হন। সিরিয়া, কুয়েত হয়ে শেষ পর্যন্ত থিতু হন লেবাননে। জীবনভর উদ্বাস্তু হওয়ার মর্মবেদনা তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে; আর তাই জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তনের সংগ্রামে তিনি তার সংক্ষিপ্ত জীবনের বেশিরভাগ সময়ই উৎসর্গ করেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত তার লেখালেখির কালপর্ব। অন্তর্ধানের পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কানাফানির রচনাবলি এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ছোটগল্পের মাধ্যমে সাহিত্যের হাতেখড়ি হলেও উপন্যাসই ছিল তার সাহিত্য রচনার মূল অনুষঙ্গ। ফিলিস্তিনি জীবনের খণ্ডিতচিত্রে ভরপুর তার উপন্যাস: শরণার্থী শিবিরের স্তব্ধ সময়ের মর্মপীড়া, পশ্চিমা সমরযন্ত্রের হৃদয়হীনতা, আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়াশীলতা। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে পিতৃভূমির প্রতি সপ্রেম উন্মত্ততা, নির্বাসিত জীবনের বিধুরতা আর প্রত্যাবর্তনের স্বপ্নকাতর মাধুরীতে সিক্ত দৃশ্যকল্পগুলো। কানাফানির উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: “মেন ইন দ্য সান” (১৯৬২), “অল দ্যাট’স লেফট টু ইউ” (১৯৬৬), “উম্ম সা’দ” (১৯৬৯) এবং “রিটার্ন টু হাইফা” (১৯৭০)। সমালোচনামূলক লেখনীর মধ্যে রয়েছে: “অধিকৃত ফিলিস্তিনে প্রতিরোধ সাহিত্য ১৯৪৮-৬৬” (১৯৬৬), “ইহুদিবাদী সাহিত্য প্রসঙ্গে” (১৯৬৭) এবং “দখলদারিত্বের কালে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য ১৯৪৮-৬৮ (১৯৬৮)।
এ প্রবন্ধে আলোচনা সীমিত থাকবে তার “ইহুদিবাদী সাহিত্য প্রসঙ্গে” (On Zionist Literature) শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে। এটি ছিল কোনো আরব কর্তৃক ইহুদিবাদী সাহিত্য ও এর চরিত্রের উপর আরবিতে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাকর্ম। আটটি অধ্যায়ে বিস্তৃত এ নিবন্ধে কানাফানি ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত প্রকাশিত ইহুদীবাদী (Zionist) সাহিত্যকর্মগুলো বিশ্লেষণ করে তার বিবর্তনীয় পথরেখা নির্দেশ করেছেন। একইসাথে দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, দখলদার উপনিবেশবাদ ইহুদীবাদের উত্থান ও তার পথচলাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। ইহুদিবাদী সাহিত্য রাজনৈতিক ইহুদিবাদের জনপ্রিয়তা এবং এ আন্দোলনের পরতে পরতে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
কানাফানির মতে, ইহুদি ও অ-ইহুদি জায়োনিস্টদের দ্বারা রচিত সাহিত্যকে ভবঘুরে ও মজলুমের সাহিত্য বলা হলেও প্রকৃত বিচারে এটা বুর্জোয়া কর্তৃত্ববাদেরই সাহিত্য। প্রচলিত মতে মনে করা হয় নিষ্পেষণের চূড়ান্তপর্বে অনিবার্য প্রতিক্রিয়ারূপে জায়নবাদের উত্থান; কিন্তু কানাফানি দেখিয়েছেন যে ইহুদিদের জন্য অপেক্ষাকৃত ‘স্বস্তির সময়ে’ (Times of reprieve) ইউরোপে ইহুদিবাদী মতাদর্শ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যকার সময়কালে ইহুদিরা বলা যায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। এ পর্বেই ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ইহুদি ব্যক্তিত্বরা জগতজোড়া খ্যাতি লাভ করেন এবং ইহুদিদের ধর্মীয় বিধানসমূহ পরিপূর্ণতা অর্জন করে। হিংসা, ঘৃণা আর চরমপন্থায় ঠাসা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তালমুদের সঙ্কলনও এ যুগেই সমাপ্ত হয়। “প্রতিশ্রুত ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের” ধারণা ইহুদি ইতিহাসের এ পর্বেই প্রথম বারের মতন জনমানসে অনুরণন তোলে। কানাফানির মতে, ইহুদিদের স্বর্ণযুগ ছিল আন্দালুসিয়ার স্পেনীয়-আরব শাসনের কালে। তখন ইয়েহুদা হালেভি তাঁর ধর্মীয় কাব্যমালা রচনা করেন যাকে হিব্রু সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়; সা’দিয়াহ বেন ইয়োসেফ তালমুদ ও দর্শনের উপর তাঁর অন্তর্দৃষ্টিমূলক রচনাসমূহ প্রচার করেন এবং প্রথমবারের মতো আরবিতে ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুবাদ করেন। আইজাক আল ফাসি আরবিতে তার দর্শনগ্রন্থ প্রকাশ করেন, মোজেস বেন মাইমন (পাশ্চাত্যে যিনি মাইমোনিডিস নামে সুবিদিত) তার ধর্মীয় ও দার্শনিক লেখাগুলো জনপরিসরে নিয়ে আসেন। এছাড়াও হাসদাই ইবন শাপ্রুত ও স্যামুয়েল হা-নাগিদ এ সময়েরই কৃতি ব্যক্তিত্ব। আন্দালুসিয়ার শাসনাধীন মরক্কো ও মিসরে ইহুদিরা পূর্ণ নাগরিক স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো হালেভির “My Heart is in the East”, “My Journey to Zion” এর মতো ভক্তিমূলক অনেক কবিতার গায়ে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ইহুদিবাদীরা রাজনীতির রঙ চড়িয়ে দেয়; অথচ এগুলো কিনা রচিত হয়েছিলো সিনাগগের ধর্মীয় যজ্ঞে গীত হওয়ার জন্য।
১৭৯১ সালের অক্টোবরে ফরাসি গণপরিষদ ইহুদিদের নিঃশর্তভাবে সব ধরণের নাগরিক অধিকার প্রদান করে। এর প্রভাবে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ইহুদি-বিরোধী মনোভাবে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কিন্তু এই ধারাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে আর্থ-সামাজিকভাবে প্রাগ্রসর ইহুদিরা এটিকে রুদ্ধ করে দিতে চায়। অলীক ধর্মীয় ও জাতিবাদী বিবেচনায় প্রভাবশালী ইহুদিরা তাদের সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে নেদারল্যান্ডসেও একই ঘটনা ঘটে। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ইহুদিদেরকে ডাচদের সমান নাগরিক স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিবাদে বর্ণশ্রেষ্ঠত্ববাদী ইহুদিরা বিক্ষোভ করে। তাদের ধারণা ছিল “নতুন প্রদত্ত স্বাধীনতা এবং এর সাথে আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে গেলে ইহুদিধর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” এগুলো ছিল ইউরোপীয় সমাজের মূলধারায় ইহুদিদের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধাচারণ এবং এর পেছনে উগ্র জাত্যাভিমান ছাড়া অন্য কোনো কারণ বর্তমান ছিল না। এই লাগামছাড়া জাত্যাভিমানই কালক্রমে জন্ম দেয় জায়োনিজম তথা ইহুদিবাদের। কানাফানির উদ্ধৃতি:
“Such racism has a long history. It represented a negative response to the Jewish question, which it never intended to resolve. The oppressed Jewish communities were confronted with two mutually exclusive possibilities: to either endure the pain of the struggle for equality and social integration or to cling to claims of superiority and the myth of exceptionalism – with the latter being a mere inversion of the same racist ideology that persecuted the Jews.”
এই বর্ণবাদের ব্যাপারটি এক শ্রেণীর ইহুদীদের মধ্যে অন্তরীণ ছিল। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছে তার এক বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন তার শিশু সন্তানটিকে ইহুদী নাকি খ্রিস্টান হিসেবে বড় করবেন। জবাবে ফ্রয়েড বলেছিলেন:
“If you do not want your son to grow up as a Jew, you would deprive him of all irreplaceable sources of vitality. He would have to struggle as a Jew, and you would have to cultivate within him every energy he would need for that struggle. . . do not deprive him of this characteristic.”
ফ্রয়েড সত্যিই বিশ্বাস করতেন ইহুদিদের অহম এবং শ্রেষ্ঠত্বে। এবং তার কারণ ছিল ইহুদিরা “ঈশ্বরের মনোনীত জাতি।” ফ্রয়েডের সরল স্বীকারোক্তি:
“Moses created a character for Jews when he gave them a religion that gave them confidence to such a degree that they came to believe to be superior to all other peoples. They survived as a result of this superiority.”
জার্মান ইহুদি সাহিত্যিক হাইনরিখ ভিয়ের্টেল ১৮৫৪ সালে লেখেন:
“আমার এখন মনে হয় গ্রিকরা ছিল সুদর্শন যুবা; অন্যদিকে ইহুদিরা সবসময়ই ছিল পুরুষ- শক্তিমান, অদম্য সুপুরুষ।”
এই শ্রেষ্ঠত্ববাদী গূঢ়ৈষার কারণেই ইহুদিবাদী সাহিত্যে ইহুদি চরিত্রসমূহের ক্রমবিবর্তনের ধারা এমন: (ডেভিডীয়/দাউদীয়) ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব” থেকে “শাইলকীয় চরিত্র”, “সন্দেহবাতিকগ্রস্ত”, ” নালিশকারী”, “দিগ্বিজয়ী”, এবং চূড়ান্তপর্বে “রাজনৈতিক ডেভিড/দাউদ”- এমন এক চরিত্র যা “শক্তিমত্তা ও নৈতিক উৎকর্ষে চরম ও পরম; যার সামনে পুরো পৃথিবীকেই মনে হয় গোলাইয়াথের অশরীরী কায়ার মতন এক দানবীয় সত্তা।” এমন অবস্থায় কোনো কিছুই আর অনৈতিক, অশুভ কিংবা অশোভন থাকে না।
‘ইহুদি প্রসঙ্গ’ সম্বলিত সাহিত্যের মধ্যে মারিয়া এজওয়ার্থের “হ্যারিংটন” (১৮১৭) এবং ওয়াল্টার স্কটের “ইভানহো”তে(১৮১৯) সর্বপ্রথম ইংরেজ সাহিত্যিকরা বর্ণবাদবিরোধী ও আত্তীকরণবাদী অবস্থান নেন যেখানে তারা ইহুদিদের সৎভাবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তার পরের সাহিত্যে ইহুদিবাদ মূর্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। ঔপন্যাসিক ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরায়েলি “The Wondrous Tale of Alroy” (প্রকাশিত: ১৮৩৩) তে দ্বাদশ শতাব্দীর ইরাকে একজন ইহুদি ত্রাণকর্তাকে খুঁজে নেন যে কি না ‘হিব্রু জনগোষ্ঠী’কে আবারও মহত্ত্বের স্বাদ এনে দেবে। দুঃখজনকভাবে তার সেই প্রচেষ্টার নির্মম পরিণতি ঘটে। এ অবস্থায় ডিজরায়েলি ঘোষণা করেন যে, একটি ‘বর্ণবাদী স্বপ্নে’র বাস্তবায়ন ঘটাতে না পারলে ইহুদি জাতি অসমতা ও অন্যায্যতার মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকবে। তার বর্ণশ্রেষ্ঠত্ববাদী নায়ক অ্যালরয় ‘অবিমিশ্র’ হিব্রু ‘জাতি’র একজন এবং তার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে ‘মহাজগতের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ভার।’ অ্যালরয় ঘোষণা করে:
“…empires and dynasties flourish and pass away [….] but Israel still remains [….] a word, a deed, a single day, a single man, and we might be a nation.”
ডিজরায়েলির পরবর্তী উপন্যাস “Tancred; or, The New Crusade” (১৮৪৭ সালে প্রকাশিত)- এর নায়ককে দেখা যায় ‘পবিত্র ভূমি’তে বসবাস করে ঔপনিবেশিক দায়দায়িত্ব সুনিপুণভাবে পালন করছে।
জায়োনিস্টদের এই শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং অন্যদের সাথে নিজেদের পার্থক্য করার উৎস তাদের জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গৌরব বোধ করার মধ্যে নয়, বরং অন্যদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করার মধ্যেই খুঁজতে হবে। এই ‘অন্য’দের নিয়ে ইহুদিবাদী সাহিত্যের চিত্রায়ণ হলো: “পোলিশরা কাপুরুষ, জার্মানরা বর্বর, তুর্কিরা দূষিত/ অসৎ, গ্রিকরা দাসতুল্য, [….] ইংরেজরা অপকর্মে সহায়তাকারী, মার্কিনীরা সুবিধাবাদী।” আরবদের প্রসঙ্গ আসলে জায়নবাদী সাহিত্যিকদের অভিমত: আরব শিশুদের ক্ষেত্রে- “there seemed to be no laughter or songs or games [….] it was a static existence”, আরব যোদ্ধাদের বেলায়- ” thugs slither(ing) along the ground with knives between their teeth”, আরব সভ্যতার ব্যাপারে- “[t]hey haven’t (produced) anything worth showing off, except cabarets and filthy postcards, from Tangier to Teheran.”
শ্রেষ্ঠত্ববাদের উপর এই গুরুত্বারোপের কারণ হতে পারে ইউরোপ ও এশিয়ায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো থাকা ইহুদিদের মধ্যে একটি ঐক্যের সূত্র বর্তমান রাখা এবং ‘স্বস্তির সময়ে’ ইউরোপীয় ইহুদিরা যাতে ‘আধ্যাত্মিক ঠিকানা’র কথা ভুলে না যায় সেটার নিশ্চয়তা বিধান করা। কানাফানি দেখান যে, ঐ সময়কালে যারা ইউরোপীয় সমাজে ইহুদিদের মিলনবিরোধী( Anti-integrationist) সাহিত্যের জোরদার পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন তারা ছিলেন ইহুদি বুর্জোয়া শ্রেণি যারা কিনা তৎকালীন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শিথিলীকরণের সুবিধাভোগী ছিলেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য হচ্ছেন লিওনেল নাথান ডি রথসচাইল্ড: প্রথম ব্রিটিশ-ইহুদি সাংসদ, ডেভিড স্যালোমন্স: লন্ডনের প্রথম ইহুদি মেয়র, বেঞ্জামিন ডিজরায়েলি: দুইবারের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এতদিন যাবত যে কল্পিত ‘পুণ্যভূমি’র স্বপ্ন তারা লালন করে আসছিলেন বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ স্থাপনের মহোৎসবে সেটা আর স্বপ্নতে আটকে রইলো না; সে স্বপ্নের মূর্ত হয়ে ওঠা তারা কল্পচোখে দিব্যি দেখতে পাচ্ছিলেন। এভাবেই সেই সময়কার সাহিত্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদের সাথে এক অশুভ আঁতাত গড়ে তুলেছিল। বস্তুত সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাভিলাষই ইহুদিবাদীদের ইউরোপীয় সমাজে আত্তীকৃত হতে বাধা দেয়।
ইহুদিবাদীরা মিলনকামী (Integrationist) ইহুদিদের নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছেড়েছিলো। ফলতঃ একটি উগ্র মতাদর্শের পালে নতুন হাওয়া লাগতে শুরু করে এবং শ্রম আন্দোলন (Labor Bundism), ইহুদি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন (Haskalah), ধর্মনিরপেক্ষ কমিউনিজম, ইডিশবাদ ও ডয়কায়েট (Yiddishism and Doikayt) প্রভৃতি প্রগতিশীল ধারাকে তা রুদ্ধ করে দিচ্ছিলো। ধারাগুলোর লক্ষ্য ছিল সম্প্রদায়গতভাবে ইহুদিদের ক্ষমতায়ন ও সংহতিকরণ। এই আন্দোলনসমূহের সাথে যুক্ত মিলনকামী ইহুদিদের বলির পাঁঠা বানিয়েছিল তৎকালীন ইহুদিবাদী সাহিত্য এবং নিত্যদিনই চলতো এদের নিন্দামন্দ। এটি এক বৃহদাকার ঔপনিবেশিক প্রকল্পকে সম্ভবপর করে তুলছিলো এবং ইহুদিদের কল্পিত ‘স্বদেশভূমি’র সাথে সম্পর্কের রসায়নকে বদলে দিচ্ছিল; ফিলিস্তিনে পৌঁছালেই তাদের ‘ইহুদি যুগে’র অবসান ঘটবে আর সূচনা হবে ‘হিব্রু যুগে’র।
এরপর কানাফানি নজর দেন ইহুদিবাদী সাহিত্যের কৌশলগত উপযোগিতার দিকে এবং দেখান কীভাবে ফিলিস্তিনে দখলদার উপনিবেশবাদ কায়েমের সাথে এর বিকাশ ঘটে। ঊনবিংশ শতকের শেষে ও বিংশ শতকের শুরুতে জায়োনিস্ট লেখকদের খোলামেলাভাবে ‘জাতীয় স্বার্থে’র ব্যাপারে সরব হতে দেখা যায়। এটা অনিবার্য ছিল। কারণ ১৮৪০ এর দশক থেকেই ফিলিস্তিনে সাম্রাজ্যবাদী ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করে; তখন থেকেই বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অটোমান সালতানাতকে সেখানে ইহুদি অভিবাসন উৎসাহিত করার জন্য তদবির করতে থাকে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ সবারই জানা- ১৮৯৭ তে প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস, ১৮৯৯ তে ইহুদি ঔপনিবেশিক ট্রাস্ট গঠন, পরিশেষে ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণা। ফিলিস্তিনে বাড়তে থাকে ইহুদি দখলদারের সংখ্যা। এর ফলশ্রুতিতে ইহুদিবাদীদের সাথে ফিলিস্তিনি আরবদের সরাসরি সংঘাত বেঁধে যায় এবং ইহুদিবাদী সাহিত্যে বড় ধরণের পরিবর্তন সূচিত হয়। তখন থেকে এটি জায়োনিস্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির সাথে কোনো রাখঢাক ছাড়াই সমান তালে সামনে এগুতে থাকে।
উপরোক্ত সময়কালেই ইহুদিবাদী টেক্সটে দখলদারি মনোভাব সংহত হয়ে যায়। কানাফানির দৃষ্টিতে জর্জ এলিয়ট রচিত ‘ড্যানিয়েল ডিরোন্ডা’য় (১৮৭৬) প্রথম পূর্ণ প্রস্ফুটিত ইহুদিবাদী নায়কের আবির্ভাব ঘটে। আর এজন্যই হয়তো কৃতজ্ঞতা স্বীকারপূর্বক ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই তেল আবিবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করা হয় এলিয়টের নামে। ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র কায়েমের প্রায় সাত দশক পূর্বেই এ উপন্যাসে সে স্বপ্ন আভাসিত হতে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় চরিত্র মর্দেচাই-
…advocated “funding, media and propaganda, organization (through the Zionist Congress), purchasing land, campaigns of hatred” in order to successfully achieve a state, “grand, simple, just, like the old.”
ইহুদিবাদী সাহিত্যের বিকাশের এই পর্বেই তাই জায়োনিস্ট কংগ্রেসে যোগদানকারীরা ঘোষণা করেছিলেন যে ইহুদিবাদ কেবল “একটি রাজনৈতিক দল/মত” নয়, এটি “স্বয়ং ইহুদিধর্ম।”
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত লিওন উরিসের বহুল-বিক্রিত উপন্যাস ‘এক্সোডাসে’ তিনি ইহুদিবাদকে ‘উদ্ধারকারী’ শক্তি বলে অভিহিত করেন যা ফিলিস্তিনি ভূমিকে এর বাসিন্দাদের কাছ থেকে ‘মুক্ত’ করেছে। ফিলিস্তিনের খেজুর ও পাম গাছগুলোকে তিনি এক কল্পিত গোয়েন্দা এজেন্টের মাধ্যমে আনিয়েছেন ইরাক থেকে। বেঞ্জামিন তাম্মুজের ছোটগল্প ‘একটি জলপাই গাছের কাহিনী’তে এক ইহুদি গ্যালিলির এক ফিলিস্তিনির জমি দখল করে। জলপাই গাছকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে সে কেটে ফেলে কারণ সে জানতো না এটি থেকে মূল্যবান তেল আহরণের প্রক্রিয়া। কানাফানির মতে এই জলপাই গাছটি অন্য সব স্থানীয় জিনিসের মতোই এক ‘অবাঞ্ছিত স্মৃতি’। এখানেই মেলে ইহুদিবাদীদের সেই আপ্তবাক্য: যা কিছু মনোরম- আমরা এনেছি, আর যা কিছু অদরকারি- গুঁড়িয়ে দিয়েছি!
আর্থার কোয়েস্টলারের ‘থিভস ইন দ্য নাইট’ (১৯৪৬) থেকে একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এ অংশের সমাপ্তি টানবো:
“এখানে কস্মিনকালেও ছিল না কোনো মানব বসতি। ছিল এক ঊষর মরু, আর এক পূতিগন্ধময় জলাভূমি। আর ছিল বসন্ত-উপদ্রুত একদল চাষাভুষা।….. তোমাদের লোকসংখ্যা পড়তির দিকে ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কেননা অর্ধেক শিশু মারা যাচ্ছিল দোলনা-জোড়া ক্লেদে আর কলুষে। ইহুদিদের আগমনের পর লোকসংখ্যায় তোমরা হয়েছো দ্বিগুণ। তারা ছিনিয়ে নেয় নি তোমাদের কাছ থেকে ‘সূচ্যগ্র মেদিনী’; হাঁ, তারা হরণ করেছে তোমাদের ম্যালেরিয়া, তোমাদের চক্ষুব্যাধি, তোমাদের জীবাণু-ভরপুর আঁতুড়ঘর, আর তোমাদের দারিদ্র্য।”
দুই ভিক্টোরিয়ো সাহিত্যিকের (এলিয়ট ও ডিজরায়েলি) জায়োনিস্ট সাহিত্যে নবজীবন সঞ্চারের পর এ ধারা নতুন দিকে মোড় নেয়। অন্যান্য ইহুদিবাদী লেখকেরা দ্বিগুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনায় এই বিষয়বস্তুকে উপজীব্য করে সাহিত্য রচনার ক্রুসেডে নামেন। এগুলোর অনিবার্য ধারাবাহিকতায় ইহুদিবাদের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়; এ ধাপটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক ইহুদিবাদ। ‘লেবার জায়োনিজমের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোজেস হেস, সাংস্কৃতিক ইহুদিবাদের প্রবক্তা আহাদ হা’ম, রাজনৈতিক ইহুদিবাদের জনক থিওডোর হার্ৎজেল; লিওন পিন্সকার, নাহুম সকোলো প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা এই পর্যায়ে ইহুদিবাদকে একটি শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ দেন। আর এই আন্দোলনের সফল রূপায়ণ ও এর কাঙ্খিত পরিসমাপ্তি সংঘটন করে ফিলিস্তিনি ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়ের।
কানাফানির সাহিত্যকর্মগুলো অনেক আগেই ইংরেজিতে অনূদিত হলেও সমালোচনামূলক গ্রন্থগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে নি। রচনার পাঁচ দশকেরও পর “অন জায়োনিস্ট লিটারেচার” ইংরেজিতে প্রকাশ পায় কেবল গতবছর। বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হলে কানাফানির মতো বিপ্লবী ও বুদ্ধিজীবীদের রচনাবলিকে পশ্চিমা পাঠককুলের দোরে পৌঁছে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ ফিলিস্তিন ইস্যুসহ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে এমন যেকোনো ব্যাপারেই পশ্চিমা ভাষ্য মানবতা, ন্যায্যতা ও মুক্তিকামী মানুষের স্বার্থের বিরোধী। এজন্যই তিনি তার সমালোচনা পশ্চিমের সাহিত্যতেই সীমিত রাখেন নি; বরং সেখানকার প্রকাশনা শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঔপনিবেশিক রাজনীতির অকুস্থল সাব্যস্থ করেন। এডওয়ার্ড সাইদ ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত তার প্রবন্ধ “Reflections on Recent American ‘Left’ Literary Criticism” এ বলেন- অ্যামেরিকান সাহিত্য সমালোচনায় একটি ইচ্ছাকৃত প্রায়োগিক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, যেখানে পদ্ধতিগত পরিশুদ্ধতা ও সৌকর্যের গুণগান করা হয়; কিন্তু সাহিত্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যে দিক- তাতে আলো ফেলা হয় না। সাইদের মতে:
This “‘left’ literary criticism” confronted the injustices of the midcentury “without so much [….] as a polite murmur” about Western imperialism; its unwillingness to challenge “prevailing values, institutions and definitions”, prefiguring what he called the coming era of “depressing quietism.”
পশ্চিমা সাহিত্যভাণ্ডার পাশ্চাত্যের শক্তির মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্র; সার্ত্রে যাকে বলেছিলেন এক ধরণের ‘ডাকিনীবিদ্যা’। সিলভিয়া উইন্টারের মতে এটি তৈরি করে ‘মৌনসম্মতি প্রদানকারী সমালোচক সমাজ’ এবং ‘প্রশান্তিদায়ক শিল্প’। কানাফানির সমালোচনা গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ পশ্চিমা মূলধারার ক্রিটিককে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে এবং তার রঙিন মোড়কের ভেতরকার অন্তঃসারশূন্যতাকে করে তুলতে পারে উদ্ভাসিত।
বৈরুতের শাতিলা শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনি শহীদদের জন্য নিবেদিত সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন গাসসান কানাফানি। ১৯৭২ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালিত এক অপারেশনে গাড়িতে পু্ঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের পর তার এক সাংবাদিক বন্ধু লেবাননের একটি পত্রিকায় লেখেন:
“Ghassan was the commando who never fired a gun. His weapon was a ballpoint pen and his arena newspaper pages, and he hurt the enemy more than a column of commandos.”
সাহিত্য সমালোচনা কানাফানির কাছে ছিল সশস্ত্র প্রতিরোধের অত্যাবশ্যকীয় বর্ধিত রূপ। তার শিল্প, সাহিত্য সবই আবর্তিত স্বীয় রাজনৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে। তিনি পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, ইহুদিবাদের সাথে ইহুদিধর্ম কিংবা ইহুদি জাতির সম্পর্ক কষ্টকল্পিত; জায়োনিজমের জন্মকোষ্ঠী বরং ইহুদিবাদীদের উগ্র ও শ্রেষ্ঠত্ববাদী জাতিবাদ এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ও বিকাশের মধ্যেই খুঁজতে হবে। আর তাই ইহুদিবাদকে প্রত্যাখ্যান করাই ইহুদিবাদী সাহিত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করার পথে প্রথম পদক্ষেপ। লেবানিজ ঔপন্যাসিক ইলিয়াস খৌরি কানাফানির স্মরণে লিখেছেন: “মরণস্মৃতি যেন ছাড়িয়ে যায় জীবনকেও!” মৃত্যুর পর বাস্তবিকই কানাফানি হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক। দ্রোহ আর প্রেমে একদা জ্বলেছিলো যে শিখা- যুগ যুগ ধরে তা দীপ্তি ছড়াবে মুক্তিকামী মানুষের মাঝে এবং অনুপ্রাণিত করে যাবে অসংখ্য বিপ্লবী আর প্রতিরোধ যোদ্ধাকে।