সম্পাদকীয় – ১ম সংখ্যা

বাংলা ভাষায় চিন্তামূলক লেখাজোখার পরিসর ছোট, এবং দিনদিন তা আরো সংকুচিত হয়ে আসতেছে। কেন আসতেছে তা নিয়ে আমরা অজস্র আড্ডা দিতে পারি, দেখাতে পারি নানানরকম কারণ, কিন্তু কমে যে আসতেছে তা সচেতন পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন। সোশাল মিডিয়ার অনেকগুলা ফজিলতের ভিতর এও একটা বটে, যে, “আমার মনে হয়” হলো ইদানীং জনপ্রিয় হওয়া চিন্তা প্রকাশের সবচে ভাইরাল টুল। যেইটার সহযোগিতায় বক্তা হাজেরানে মজলিশে নিজের যুক্তির অকাট্যতা তুলে ধরবার প্রয়াস চালায়। আবহমানকাল ধরে আড্ডার ধর্ম অনুযায়ী তা হালে পানি পেতো কম। কিন্তু যুগপৎ ফেসবুক ও পোস্ট-মডার্নিজমের জয়জয়কারে “আমি”, “মন”, “হওয়া”, “সত্য” এগুলা নতুন নতুন সংজ্ঞায়ন সহকারে তর্কের ময়দানে বীরদর্পে নয়াভাবে নিজের উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। “আমার মনে হয়” আর ফেলনা কোনো ব্যাপার না এখন, বরং আধিপত্য বিস্তারমূলক তার্কিক প্রপোজাল! ফলে, আগে যেভাবে তর্কে জিতবার ব্যাপার ছিলো বা নিরপেক্ষভাবে জয় কার হলো বুঝা যেতো, তা এখন সনাতনী দোষে বিলুপ্তপ্রায়! কিন্তু ওই বিষয়গুলোর নতুন সংজ্ঞায়ন যে মূলত ওই ওই বিষয়গুলোকে ভালো করে বুঝে যতদূর সম্ভব গোড়ায় গিয়ে আসল ব্যাপারটা আরো ভালো করে বুঝবার প্রয়াস বা ‘আসল’ কিভাবে গঠিত হচ্ছে তা ঝালিয়ে দেখবার কোশেশ, তা চোখা নাই আর। সব মতে সত্যের একটু একটু রেশ দেখতে অভ্যস্ত হওয়া আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারতেছি কম, ক্ষমতা যে জ্ঞান উৎপাদন করতে পারে তা ধরে নিয়েও যুক্তিপ্রদানের জালেম বনাম মজলুম পক্ষ বের করা কঠিন হয়ে গেছে এখন। আবার পজিশন হিসেবে ধূসর বা গ্রে এরিয়ার জরুরত বুঝেও এর ফাঁকফোকরের যে যথেচ্ছ অপব্যবহার হচ্ছে এই নিয়ে মাথাব্যথাও খুব কম আমাদের। সিংহ আর গাধার যেই ঈশপের গল্প জানতাম আমরা, তাতে পানি ঘোলা করবার যে সিংহীয় যুক্তিপদ্ধতি তা যে ভুয়া এবং আক্রমণের জন্যে একটা ক্রিয়েটিভ ফন্দি মাত্র তা বুঝতাম আমরা আগে, কিন্তু এখন সিংহের পার্সপেক্টিভও দেখা লাগে আমাদের, দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে তাই ডমিন্যান্ট বনে গেছে, ফলে গাধা তার সিগনেচার গাধামি নিয়েই থেকে যায়, আমাদের মন পায় না আর।

এই তো গেলো একটা। তারপর আছে জনরুচির তোষামোদ করবার নিয়তে “মূলধারা”র পত্রিকাগুলোর অবিরত লেখালেখি। পপুলিজমের এহেন জয়জয়কার দরকারি লেখায় লেখকদের মনোযোগ দিতে দিচ্ছে না, নন-ফিকশন রাইটার হওয়া এতো বেশি সহজ করে রাখছি আমরা। তাছাড়া, পুরোনো চিন্তার পুনরুৎপাদন এতোই ফ্যাশনের মতো ব্যাপার হয়ে আছে, যে, বর্ষাকালে গায়ে কাদা না লাগে মতো অতি সন্তর্পণে হাঁটবার কোশেশ করা লাগে চিন্তামূলক সাময়িকীগুলায়। যেই স্কুল অব থটের লেখাই উল্টানো হোক না কেনো তা তো ওই নির্দিষ্ট স্কুলের সমালোচনা নিবেই না, বেদনার ব্যাপার হলো যারা নিরপেক্ষ হবার ওয়াদা দিয়ে বাজার দখল করছিলো তারাও বাজে রকমের দলকানা!

এবং সর্বোপরি একাডেমিক আলাপে আঁতকা-মত (কমেন্ট) ধরনের লেখাজোঁকায় অতিষ্ঠ হয়ে আমরা চিন্তাচর্চার একটা ষান্মাসিক করার পরিকল্পনা করি। এবং এর নাম দিই “বাহাছ”। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই ফেসবুকের কল্যাণেই তুলনামূলক তরুণদের ভিতর চিন্তার ব্যাপারে সিরিয়াসনেস দেখে আমরা সাহস পাই। ফেসবুক ও টুইটার ফিডকে একটু কায়দা করে এঞ্জিনিয়ারিং করলে তত্ত্বীয় ঘরানার জ্ঞানচর্চার নয়া নয়া নানান ইশারা দেখে থাকবেন আপনারাও। লেখক ও টপিকদের প্রবন্ধ ঘরানায় তুলনামূলক দায়িত্বশীল একটা জনরায় নিয়ে আসা যায় কিনা তার একটা কোশেশ বলতে পারেন “বাহাছ” এর এই এন্তেজাম।

ষান্মাসিক কেন? নামকরণ ‘বাহাছ’ কেন? অনলাইন না কেন? টপিক কি হবে লেখার? এটাও যে পুনরুৎপাদনের সেই পুরোনো ব্যাপার না তা বুঝা যাবে কিভাবে? এরকম কিছু পয়েন্ট ধরে ধরে আমরা কথাবার্তা এগিয়ে নিই।

আমরা যেরকম লেখা ছাপাতে ও বিলাতে চাচ্ছি তার লেখক সংখ্যা নিতান্তই কম। কারণ পশ্চিমা বা অন্য কোনো অঞ্চলের জ্ঞানকে বাঙলায় পুনরুৎপাদন আমাদের মনজিলে মকসুদ নয়। তাছাড়া আমরা যারা এই দায়িত্ব বা চাকরি নিচ্ছি তাদেরও জীবিকার তাগিদসহ আরো নানান ব্যস্ততার ব্যাপার আছে। ফলে ষান্মাসিক হলে প্যারা একটু কম হবে আমাদের, এরকম ধারণা।

অফলাইনে মনোযোগ আমাদের। কিন্তু কখনো সুযোগ হলে যে অনলাইনে যাবো না, তা না। আপাতত আমাদের মনে হচ্ছে, প্রিন্টেড সাময়িকীর বড় পরিসর ও সবসময় নেড়েচেড়ে পড়তে পারবার আরাম থাকায় আমরা যা চাচ্ছি তার প্রকাশ ঘটাতে কাগুজে জার্নাল বেশ ভালো রকমের অপশন।

এবার নামকরণে আসা যাক। বাহাছ শব্দটা আরবি থিকা আইসা ঘুরা পথে ফারসি অর্থে বাঙলায় গদিনশিন হইছে। মানে, বাহাছ বলতে বর্তমানে যে তর্ক বুঝি, তা ফার্সির অবদান, আরবিতে বাহাছ ছিলো তল্লাশি-মতোন কিছু একটা। ব্রিটিশ আমলেই নাকি বাহাছ তার নয়া অর্থ লইয়া ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে আসীন হয়! মুঘল ভারতে বাহাছ বলতে আমরা যা বুঝি তা বুঝাতে মুনাজারা বা মজলিস নামের শব্দগুলা ব্যবহার হতো বেশি। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও আকবরের সভায় মুসলিম বনাম খ্রিস্টান মুনাজারা ব্যবস্থার কথা শোনা যায়। তবে বাহাছের সাথে মুনাজারা-মজলিশের তফাত হচ্ছে পরিপ্রেক্ষিত! প্রাক-ব্রিটিশ মুনাজারা অনুষ্ঠিত হতো রাজদরবারে, আর বাহাছের আয়োজন হতো বাজারকেন্দ্রিক এলাকায়, যেখানে আমজনতার অংশগ্রহণ ছিলো। এবং এইগুলার ভিতর দিয়া এক কিসিমের কম্যুনিটি লিডারশীপ গড়ে উঠবার ব্যাপার ছিলো। কারণ বাহাছে স্বভাবতই দুইটা পক্ষ থাকতো, তারা হতে পারে দুইটা ধর্ম অথবা ধর্মের ভিতরের দুই মাজহাব, ফলে একপক্ষ থেকে আরেক পক্ষ কেন আলাদা তা বিশদভাবে ব্যাখ্যার ব্যাপার ছিলো। ইসলাম নাকি খ্রিস্টান ধর্ম সেরা, ভারতবর্ষ দারুল হরব কিনা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় জুমার নামাজ না পড়া মুসলমানদের দায়িত্ব কিনা, ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে জেহাদ করার বিধান কি, গরু কোরবানির হাকিকত ইত্যাদি নানান বিষয়ে বাহাছের রেকর্ড পাওয়া যায়। আপনারা যারা ‘কবির গান’ নামের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন এলাকা বা অনলাইনে, এই ব্যাপারটা তারা ভালো বুঝার কথা। এইখানে উৎসাহী শ্রোতাদের যুক্তি দিয়ে ভজানোর ব্যাপার থাকতো, পলিটিক্স অব পারসুয়েশন, যেইটা আবার আধুনিক গণতন্ত্রে গুড সিটিজেন হবার গোড়ার জিনিস, যে, জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ নয় বরং প্ররোচনার ভিতর দিয়ে পটিয়ে সম্মতি উৎপাদন করতে হবে। বাহাছের যেহেতু সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক কার্যধারা ছিলো, ফলে প্রায়ই এক বা একাধিক মোশনের নিয়মতান্ত্রিক তর্কমূলক সমাধান আসতো এতে।

মহাম্মদ নইমুদ্দিনের “আদেল্লায় হানিফীয়াঃ রদ্দে লামজহাবীয়া” বইটায় বাহাছের এক পরিপূর্ণ উপস্থাপনা প্রস্তাবিত হয়, যেখানে ইসলাম ধর্মের দুই গ্রুপের নানান তর্কে বিচারক হিসেবে হিন্দু-খ্রিস্টান, ইংরেজ ও সরকারি আমলাদের অন্তর্ভুক্তির এক জটিল প্ল্যানিং দেখা যায়। হানাফি বনাম লা মাজহাবিদের বাহাছের সমাধান আসতেছে নিরপেক্ষ একদল থেকে, যারা পক্ষপাতদুষ্ট হবার সুযোগই নাই কারণ মুসলমান’ই না তারা! ঔপনিবেশিক বাংলার মুসলমান সমাজে নিজেদের বিষয় নিয়া এহেন প্রস্তাব পাস হওয়া দেখে বর্তমান দুনিয়ার বহুত্ব প্রশ্নের কেমন জুতসই ফয়সালার প্রস্তাবনা দিতে পারে বাহাছ, তা ব্যাপক আগ্রহ জাগানিয়া বটে। এতোই যে, আমরা ষান্মাসিকের নামই দিয়ে দিলাম এর বরকতে আস্থা রেখে…

আর্ট আর সোশাল সায়েন্সে আমাদের বর্তমান আগ্রহ, সম্ভব হলে বাণিজ্য আর বিজ্ঞানের নানান তত্ত্ব ও সমালোচনা এক্সপ্লোর করার ইচ্ছা আছে আমাদের। ফলে বাহাছ’ও যে পুনরুৎপাদনের সেই পুরোনো ব্যাপার না তা বুঝাতে ভবিষ্যতের উপর ভরসা রাখতেছি আমরা। আমরা মনে করি, বলার মতো কিছু দেয়া না গেলেও অন্তত এতটুকু পায়ের কদম রেখে যাব আমরা, যার উপর ভর দিয়ে পরবর্তী কেউ একটু অন্তত সাহস পায়। এর অংশবিশেষ হিসেবে আমরা ভাবছি টপিক প্রতি অনলাইনে পডকাস্টের আয়োজন করবো, লেখককে তার লেখার নানান ব্যাপার নিয়া সওয়াল-জবাব করবো, এতে পাঠকের সমালোচনা ও জিজ্ঞাসার সরাসরি একটা অংশগ্রহণ মতো অবস্থা তৈরী হবে যা চিন্তার আদানপ্রদানে জন্য বেশ সহায়ক হতে পারে, এমনকি তৎপরতাও তো কেউ শুরু করতে পারে এরকম কিছুতে ভর দিয়ে!

টপিক নিয়া আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, সেমি-একাডেমিক ধাঁচের লেখার দিকেই আমাদের মনোযোগ। দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, রাজনৈতিক অর্থনীতি, সাহিত্য তত্ত্ব, অপরাধবিজ্ঞান, সাহিত্য সমালোচনা, শিক্ষা-দর্শন, ইসলাম প্রসঙ্গ, মার্ক্সবাদ, গণতন্ত্র, ফিল্ম ক্রিটিসিজমের কথা বলা যায় আমাদের বর্তমান টপিকের উপর ভর দিয়ে। এইখানে প্রথম সংখ্যায় যেসব ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ তার তার নাম নেয়া হলো এবং পরবর্তীতে যে আমাদের আগ্রহ আরো বিস্তারিত হবে তার ইশারা দেয়া হলো। এবং যতটুকু সম্ভব বাংলাদেশী একটা প্রেক্ষিত রাখবার কথা ভাবতেছি আমরা, যে, জ্ঞানের স্বার্থে জ্ঞানচর্চা তো বটেই দরকারের জন্যেও জ্ঞান উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি আমরা।

বানানরীতি নিয়েও দু’কথা বলা দরকার মনে করি। বানানের ক্ষেত্রে আমরা কট্টর নই। লেখক যেভাবে পারেন পাঠকদের ভজানোর চেষ্টা করবেন নিজের লেখায়, ফলে যৌক্তিক গদ্যের পিছে অক্ষরের খেলাকে অহেতুক মনে করি না আমরা। যেহেতু লেখা লেখকের সিগনেচার হতে পারে বলেও ধারণা আমরার, সেহেতু বানান ইত্যাদি ব্যাপারে কোন আপত্তি থাকলে আমরা আবেদন রাখি সরাসরি লেখক বরাবর, কিন্তু লেখকের মতামতই শিরোধার্য থাকে। মতানৈক্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ লেখকের বয়ান ও লেখায় ব্যবহৃত কায়দা হয়তো আমরা বুঝতে অসমর্থ এই সময়ে, এইরকম ধরে নিয়ে জরুরত বিবেচনায় পাঠক ও ইতিহাসের দরবারে লেখাখানা পেশ করার দায়িত্ব পালন করি মাত্র। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, এই সংখ্যায় থেকে, থিকা ও থেইকা তিনটা শব্দের অনবরত ব্যবহার দেখে থাকবেন। এইখানে তিনটায় সমার্থক অর্থ দিচ্ছে, কিন্তু লেখকেরা উনাদের লেখা সাজানোর আয়োজনে যখন যেটা প্রয়োজন মনে করছেন ব্যবহার করেছেন।

সংখ্যাটি প্রকাশ করতে তড়িঘড়ি করতে হয়েছে আমাদের। কারণ পরিকল্পনার বয়স পুরোনো হতেই চলছিল দেখে একদিনে পুরোদস্তুর সিদ্ধান্ত নিয়ে মাসখানেকের ভিতর ছাপার কাজ শেষ করি আমরা। যারা আমাদের অনুরোধে লেখালেখির শ্রম করলেন, সবাইকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাচ্ছি। এবং নতুন কোন লেখক যদি আগ্রহী হয় সেই ভরসায় সম্মানীর ব্যাপারে আমাদের আহ্বানটা আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আড্ডা ও সম্মানী দু’টোই সরবরাহ করা হবে। আমরা বলেছিলাম, লেখক সম্মানীর ব্যাপারে কিছু বলার নাই আসলে, কারণ ব্যক্তিগতভাবে যতোটুকুতে রাজি করাইতে পারেন আমাদের। তবে কেউ যদি মনে করেন টাকার চাইতে বড়ো কিছু লাগবে, তাহলে আমরা সময়ের কথা বলতে পারি। আপনার লেখার বিনিময়ে অজস্র আড্ডা হতে পারে আমাদের, আপনি বলার সময় আমরা শুনবো সবটুকু সময়।

পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো এইখানে, পর্যালোচনার দরখাস্ত থাকলো আপনাদের দরবারে, ষান্মাসিকটার নামের যথার্থতা যাচাই করতে ভিন্নমত প্রত্যাশা করছি খুব করে। বাহাছেও হোক বাহাছ…

Previous Article

সম্পাদকীয় - লাল জুলাই সংখ্যা

Next Article

জুলাই গণ-জনঅভ্যুত্থানে বিএনপি-জামায়াতের ত্যাগ এবং রাজনৈতিক হিস্যা

Write a Comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *