বাংলাদেশে ইংরেজি বিভাগ: রাজাসিকতা নাকি দীনতা?

কোন নির্দিষ্ট বিভাগকে কলোনিয়াল গুমোট থিকা মুক্ত করতে হলে প্রথমে জরুরত পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকাসকে বিউপনিবেশায়নের আওতায় আনা। আরো গোড়ার কথা হলো রাষ্ট্রকে প্রাসঙ্গিক করা এইসব ব্যাপারে। কারণ ভার্সিটিগুলো হলো রাষ্ট্রীয় চাওয়া-পাওয়ার একাডেমিক প্রোডাকশন হাউজ মতো। এজন্যে কার্যকরী গণতন্ত্রের বয়ানও সামনে আসবে, যার অনুপস্থিতিতে পাবলিকের চাওয়া-পাওয়া মূল্যায়িত হবে না। তাছাড়া ক্যাপিটালিজমের লোকাল চাপের ব্যাপারও আছে। তারপর প্রাসঙ্গিক হবে জ্ঞান কি উৎপাদন করা হবে গবেষণার ভিতর দিয়া, নাকি জ্ঞানচর্চা হবে নানান দরকারে তার আলাপ। এইগুলো বলার কারণ হলো লেখাটারে ইনসাইডার’স নোট হিসেবে পড়বার দরখাস্ত দেয়া। কারণ লেখক ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট সংক্রান্ত নিজের বায়াস নিয়া যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। আরেকটু খাটাখাটুনি করলে উনি হুইসেলব্লোয়ারও হইতে পারতেন, আফসোস! — সম্পাদক

মোতাহির হোসেন সুজন  |  ১ম সংখ্যা

গৌরচন্দ্রিকা

বাংলা ভূখণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষা শুরু হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যপর্বে; হালের বাংলাদেশ অঞ্চলে তারও প্রায় ছয় দশক পরে। সে হিসেবে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা শতাব্দীকাল পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক বিভাগ আর ইনস্টিটিউট- এতদ অঞ্চলের শিক্ষা ও গবেষণায় যেগুলো পালন করে চলেছে দিকপালের ভূমিকা। প্রতি বছরই নতুন নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, উদ্বোধন ঘটছে নিত্য-নতুন জ্ঞানের ক্ষেত্রের। কিন্তু তাতে পুরনো বিভাগগুলোর উপযোগিতা বা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায় নি মোটেও। তবে সেগুলোকে নতুন দিনের নতুন আলোয় না দেখলে জীর্ণ-মলিন পোড়োবাড়ি বলে ভ্রম হতে পারে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় যে কয়টি বিভাগ সর্বোচ্চ সামাজিক স্বীকৃতি এবং মর্যাদা আদায় করতে পেরেছে ইংরেজি বিভাগ তার মধ্যে অন্যতম। এদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠার শুরুর দিক থেকে এ বিভাগটি চালু রয়েছে। এই অঞ্চলের অনেক রথী-মহারথীই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন যাদের জীবন ও সৃষ্টিকর্মে ইংরেজি সাহিত্যের সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য হচ্ছেন আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণভোমরা জীবনানন্দ দাশ। স্বীয় কাব্যচেতনার বিকাশে ও রূপকল্প নির্মাণে জীবনানন্দ ইংরেজি সাহিত্যের অনেক শক্তিমান কবি, বিশেষ করে, ডব্লিউ বি. ইয়েটস এবং এডগার অ্যালান পো’র দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এছাড়াও সৈয়দ আলী আহসান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সাহিত্য ও সমালোচনামূলক লেখনীর বহুমাত্রিকতায় ইংরেজি ভাষা এবং সাহিত্যের ইতিবাচক ছাপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

শিল্প-সাহিত্যের বাইরে প্রায়োগিক বিবেচনায়ও ইংরেজি বিভাগ জনমানসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে রয়েছে। কিন্তু সময়ের পালাবদলে ঐতিহ্যবাহী এই বিভাগটি পরিবর্তিত বাস্তবতাকে অতটা ধারণ করতে পারে নি। বলা যায় বিভাগটি আমাদের বিদ্যায়তনে হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত ফসিল! অথচ বহিরঙ্গের জাঁক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভেতরে আলো ফেলার যে শিক্ষায়তনিক প্রয়োজন- আমাদের শিক্ষাবিদ বা শিক্ষা গবেষকেরা কদাচিতই সেটার গরজ বোধ করেছেন।

আদি পাপ

ইংরেজি বিভাগের স্বরূপ বুঝতে হলে শুরুতে এর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ইংল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা হাজার বছরের পুরনো হলেও উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি বিভাগের প্রচলন হয় বড়জোর দুই শতাব্দী পূর্বে। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি’র সূচনাকালীন বিভাগগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইংরেজি বিভাগ। তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এ অঞ্চলে ইংরেজি বিভাগের সূচনা যে একটি কলোনিয়াল প্রজেক্ট ছিল তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ১৮৩৫ সালে প্রণীত শিক্ষানীতি মূলত বড়লাট বেন্টিঙ্কের তৎকালীন শিক্ষাসচিব টি.বি ম্যাকোলে’র (T.B Macaulay) মানসসন্তান। ম্যাকোলে ‘কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন’ এর সেই সময়কার সভাপতি ছিলেন। ঐ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রচারিত তার নিবন্ধ ‘Minute On Education’ এ ম্যাকোলে ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত সে প্রসঙ্গে বলেন:

…..education is to “form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect”.

ঔপনিবেশিক আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার সূচনা থেকে শুরু করে ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সবই ১৮৫৪’র “উড’স ডেসপ্যাচ” এর (উড-এর শিক্ষা প্রস্তাব) ফসল। উডের প্রস্তাবনা ১৮৩৫ এর শিক্ষানীতিতে অনেক সংশোধনী নিয়ে আসলেও তার মূলসুর একই থেকে যায়। সুতরাং এ বিভাগটি যে লর্ড ম্যাকোলের ‘বাদামি ইংরেজ’ তৈরির অন্যতম সহায়-যন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলো তা বলাই বাহুল্য। যুগ যুগ ধরে বিভাগটি সেই উদ্দেশ্য সফলভাবে আঞ্জাম দিয়ে এসেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমরা এ স্থিতাবস্থায় সফলভাবেই অভিযোজিত হয়ে গিয়েছি। এজন্য প্রতিষ্ঠার পর বহুকাল পেরিয়ে গেলেও ইংরেজি বিভাগের কাঁধ থেকে এখনও ঔপনিবেশিকতার ভূতকে নামানো যায়নি।

এবার নজর দেয়া যাক ইংরেজি বিভাগের সিলেবাস ও কারিকুলামে। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় অংশই পরিবর্তিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস প্যাটার্ন অনেকটাই এমন: প্রথম বর্ষে ব্যাকরণ ও ভাষার উপর দু’য়েকটি কোর্স আর চতুর্থ বর্ষ বা মাস্টার্সে ভাষাবিদ্যা (লিঙ্গুইস্টিক্স) ও ভাষাশিক্ষার (ইএলটি) উপর একটি করে কোর্স। এর সাথে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সমালোচনার একটি কোর্স প্রায়শই থাকে। অবশ্য নন-মেজর কিছু কোর্সও থাকে অন্যান্য বিষয়ের উপর। বাকি সবই সাহিত্যের। ইংরেজি ভাষা বৈশ্বিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে ওঠায় এ ভাষায় সাহিত্য রচিত হচ্ছে সবখানেই। কিন্তু ইংরেজি বিভাগের পাঠ্যসূচিতে ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান সাহিত্যের একচেটিয়া আধিপত্য। সমালোচনা বা দর্শনের কোর্সেও প্রাচ্যের কিংবা বৃহত্তর পরিসরে গ্লোবাল সাউথের কোনো অংশগ্রহণ নেই।

অন্দরমহল

ইংরেজি বিভাগ বর্তমানে যে পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যাপারে দু’টি আপত্তি তোলা যায়। একটি একাডেমিক, অন্যটি সাংস্কৃতিক।

একাডেমিক আপত্তি: বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য চার ধরণের বন্দোবস্ত রয়েছে: সরকারি, বেসরকারি, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে নতুনতম সংস্করণ। এটি কলেজপর্যায়ে স্নাতক/পাস ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে। সর্বাধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী এখান থেকে উচ্চশিক্ষার পাট চুকালেও অবকাঠামোগত ও অন্যান্য দিক দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। এদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমাবনতির মধ্যে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণায় বৈশ্বিক মানের দিকে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন বৈশ্বিক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা অর্থায়িত ও পরিচালিত হয়। এগুলোতে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই ভর্তি হতে পারে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে যেহেতু এদের মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং অগ্রগণ্য জ্ঞান করা হয়- আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে এটিকেই রাখবো।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই প্রথাগত একটি ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই শিক্ষার্থীরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সামগ্রিকভাবে এই ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা থাকলেও ইংরেজি বিভাগের জন্য এটি মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। এর কারণ হচ্ছে অপ্রতুল ভাষাজ্ঞান নিয়েও নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ননির্ভর ভর্তি পরীক্ষা উতরে যাওয়া খুব বেশি কঠিন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সীমিত ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে এসে শিক্ষার্থীরা অকুল পাথারে পড়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর যে সকল শিক্ষার্থী ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয় তাদের শতকরা ৮০ ভাগের পর্যাপ্ত ভাষিক দক্ষতা নেই ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। নির্মম সত্য হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাগুরু সঠিকভাবে বাংলাতেই কয়েক ছত্র লিখতে পারার যোগ্যতা রাখে না। এর কারণ অবশ্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত জীবনের সব পরীক্ষায় স্বর্ণমৃগ “এ প্লাস” পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ভাষা-দক্ষতার যাচ্ছেতাই অবস্থা। মান্ধাতার আমলের পাঠদান পদ্ধতি ও পরীক্ষা ব্যবস্থার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দশকেও ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এই দুর্বল ভাষাজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা চার/পাঁচ বছর ধরে ইংরেজি বিভাগে খাবি খেতে থাকে। কারণ এখানে ইংরেজি সাহিত্যের যে আতিশয্য তাতে শিক্ষার্থীদের নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা হয়। উপায়ান্তর না দেখে তাদেরকে হ্যান্ডনোট আর গাইড মুখস্থ করে পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরীক্ষার হলে জোড়/ বিজোড় সালগুলোর প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে গেলেই প্রথম বিভাগে স্নাতক/ স্নাতকোত্তর পাশ করে ফেলার যে সংস্কৃতি- বিভাগ নির্বিশেষে তা কলঙ্কজনক হলেও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীদের সিংহভাগের ক্ষেত্রে এর বাইরে যেটা হয়- বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির মুহুর্তে তাদের যে প্রারম্ভিক ভাষা-দক্ষতা থাকে, পাস করে যাওয়ার সময় তার কাঁটা প্রায় ঐ বিন্দুতেই স্থির হয়ে থাকে।

সাংস্কৃতিক আপত্তি: বর্তমান ইংরেজি বিভাগের মোরাল কম্পাস বরাবরের মতোই পশ্চিমা মূল্যচিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। ইংরেজি বিভাগের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত টেক্সট ভালোভাবে পড়ার দক্ষতা রাখে না। অল্প যে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর সেগুলো পড়ার দক্ষতা এবং আগ্রহ থাকে তাদের ক্ষেত্রে সেটা উন্নাসিকতা ও একদেশদর্শিতার জন্ম দেয়। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবন ও জগতকে দেখতে দেখতে একটা সময় তারা চিনুয়া আচেবের মতো কলোনিয়ালিজমকে ‘Redeeming Evil’ (মুক্তিদানকারী অপশক্তি) হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। যা কিছু পশ্চিমা – তার সবটাই অনুকরণীয়, অন্তত অনুমোদনযোগ্য; এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবস্তুগুলা ‘দিল্লি কা লাড্ডু’র মতো এক চিজ হয়ে দাঁড়ায়: না খেলে ক্ষিধা থেকে যায়, আর খেলে বদহজম হয়।

শাপমোচন

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় ইংরেজি ভাষার উপযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ এবং আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান মানুষ তৈরি করতে হলে বিদ্যমান ইংরেজি বিভাগের খোল এবং নলচে দুটোই পাল্টে ফেলতে হবে। বিভাগের নাম ‘ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ’ পরিবর্তন করে রাখা যেতে পারে ‘ইংরেজি বিভাগ’ এবং পাঠ্যসূচিতে আবহমানকাল ধরে চলে আসা সাহিত্যের মাত্রাধিক্য ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। ভাষাশিক্ষাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। সবচেয়ে ভালোভাবে ভাষা শিক্ষার জন্য সাহিত্যের পাঠ অনস্বীকার্য। কিন্তু একগাদা টেক্সট শো’পিস হিসেবে না রেখে প্রতি কোর্সে একটি বা দু’টি করে প্রাসঙ্গিক সাহিত্যিক ম্যাটেরিয়াল রাখা যায়। সর্বোচ্চ ভাষাগত দক্ষতার জন্য ব্যবসায়িক ইংরেজি, আইনি ইংরেজি, প্রশাসনিক ইংরেজি, বৈজ্ঞানিক ইংরেজি প্রভৃতির পরিভাষা, শব্দবন্ধ ও প্রয়োগ শেখানোর জন্য আলাদা কোর্স রাখা যেতে পারে। প্রতি বর্ষে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি কোর্স বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে। তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্ব পাঠের সাথে সাথে বাংলা থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের কোর্স রাখা আবশ্যক। এছাড়া ভিজ্যুয়াল আর্টসের (বিশেষ করে ‘ফিল্ম স্টাডিজ’) ওপর অন্তত একটি কোর্স কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। যোগাযোগগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিভাগে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, কালচারাল ক্লাব বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে; এবং এগুলোতে অংশগ্রহণ ও ভালো পারফর্ম করার উপর কিছু নাম্বার রাখা দরকার। প্রুফরীডিংসহ এরকম অন্যান্য প্রায়োগিক দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। প্রশ্নের প্যাটার্ন সৃজনশীলনির্ভর করতে হবে কারণ মুখস্থনির্ভর ‘শিক্ষা’ দিয়ে আর যাই হোক অন্তত একটি ভিনদেশি ভাষা আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়। এছাড়া বেশিরভাগ শ্রেণিতে একশো’র বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। ক্লাস সাইজ পঞ্চাশ থেকে সর্বোচ্চ ষাটের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। সর্বোপরি, আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে যে প্রক্রিয়ায় ভাষা শিক্ষা (বাংলা ও ইংরেজি) দেওয়া হয়- তার সচেতন পুনর্বিবেচনা আশু প্রয়োজন।

শুধু কাঠামোগত বিষয়ে মনোযোগ নিবদ্ধ রাখলে চলবে না। কারণ শিক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা যার তিনি হলেন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বৃহদংশই এখন রংধনুর সাত রঙে রঞ্জিত প্যানেলসমূহে বিভক্ত হয়ে দলবাজিতে লিপ্ত থাকেন। আরেকটি অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া কিংবা অন্যান্য অর্থকরী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ক্লাস দেওয়া তাদের কাছে নিতান্তই ঐচ্ছিক ব্যাপার। তিয়াত্তরের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যে মর্যাদা ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিলো তার করুণ অপব্যবহার ঘটে চলেছে। বিভাগ নির্বিশেষে বেশিরভাগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে তারা ক্লাসরুমে এসে রীডিং পড়ান। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর বেশি প্রত্যাশা করাও কঠিন। কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতিতে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতিটি মোটাদাগে অস্বচ্ছ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। আর যারা যোগ্যতার নিরিখে নিয়োগ পান তারাও সেই সেকেলে, ঘুণেধরা ব্যবস্থারই ফসল। তাছাড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে অনার্সের বাইরে প্রচলিত মাস্টার্স ডিগ্রি থাকলেই হয় যেটাকে আসলে অনার্স পঞ্চম বর্ষই বলা উচিত। কোনোরকম গবেষণাকর্ম বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পাণ্ডিত্য দেখানোর বালাই নেই। এজন্য অল্প কিছু সংখ্যক শিক্ষকই ছাত্রছাত্রীদেরকে মানসম্মত ক্লাস দিতে সমর্থ হন। এ সমস্যা নিরসনের প্রাথমিক দাবিই হচ্ছে পুরনো ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন সময়ের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে এমন ব্যবস্থার কায়েম। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মেধাভিত্তিক অগ্রাধিকারের নিশ্চয়তা থাকতে হবে-যেটি কিনা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগের বিধান পরিবর্তন করে যোগ্যতম প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে হবে এবং শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্লাস শেষে ছাত্রছাত্রী কর্তৃক ঐ ক্লাসের রেটিং করা/ ফিডব্যাক দেওয়ার বিষয়টি চালু করলে শিক্ষকদের মধ্যে মানসম্মত ক্লাস দেওয়ার একটি তাড়না তৈরি হতে পারে।

এখন নজর ফেরানো যাক ইংরেজি বিভাগের বিউপনিবেশায়নের দিকে। ঔপনিবেশিক শক্তি সবসময় নিজেদেরকে উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির একক প্রতিনিধি মনে করে। এক্ষেত্রে আবারও স্মরণ করতে হয় লর্ড ম্যাকোলেকে। ‘মিনিট অন এডুকেশনে’ তিনি বলেন:

“A single shelf of a good European library [is] worth the whole native literature of India and Arabia.”

এই চিন্তনরীতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশে শাসন ও শোষণ বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয়দের ‘সভ্য’ করে তোলার প্রকল্প হাতে নেয়। রুডইয়ার্ড কীপলিং যেটিকে বলেছিলেন “হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন”। এই প্রকল্পে তাদের রেফারেন্স পয়েন্ট হচ্ছে নিজেদের সাংস্কৃতিক মান ও উপলব্ধি। কেনিয়ান ঔপন্যাসিক ও চিন্তক গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো (Ngũgĩ wa Thiong’o) তাঁর “On the Abolition of the English Department” প্রবন্ধে উপনিবেশ-উত্তর কেনিয়ায় ইংরেজি বিভাগ উঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। বিদ্যমান ইংরেজি বিভাগের শিক্ষাদর্শন ধরে আগালে কী হবে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন:

“Africa becomes an extension of the west, an attitude which, until a radical reassessment, used to dictate the teaching and organisation of History in our University.”

তবে গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে নির্বাসনে পাঠাতে চান না। আফ্রিকান সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকার কারণে ইংরেজি ছাড়াও অন্যান্য ইউরোপীয় (ফরাসি, পর্তুগিজ) ও এশীয় (আরবি, হিন্দুস্তানি*) ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করেন; তবে সেটা অবশ্যই ‘আফ্রিকান ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ’ এর প্রশাখা হিসেবে থাকবে। গুগির মতে ব্যবহারিক প্রয়োজনে ইংরেজিকে রাখাই যায়। কিন্তু সাবেক প্রভুদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে অধোবদনে কুর্নিশ করার আত্মগ্লানি ও দৈন্যদশা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে:

“Just because for reasons of political expediency we have kept English as our official language, there is no need to substitute a study of English culture for our own. We reject the primacy of English literature and culture.”

ইংরেজি বিভাগকে উপনিবেশিত মন ও মনন নির্মাণের দায় থেকে মুক্তি দিতে হলে সাহিত্যের অংশে ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে পৃথিবীর সব অঞ্চল বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের প্রত্যেকটি সাহিত্যের আনুপাতিক পরিমাণ ইঙ্গো-মার্কিনের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হবে। তাছাড়া দর্শনের কোর্সে শুধুমাত্র পশ্চিমা চিন্তার আলোচনা না রেখে প্রাচ্যের মতবাদগুলোর বিস্তৃত আলোচনাও প্রয়োজন। ক্রিটিক্যাল থিওরিতেও প্রাচ্য এবং ‘তৃতীয় বিশ্বে’র ভাষ্য নির্মাণ করা ও তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো আবশ্যক।

আমাদের দেশীয় সাহিত্যের উন্নয়নে প্রস্তাবিত ইংরেজি বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনুবাদের কাজ বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনেক বেশি সংখ্যায় পেশাদার অনুবাদক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং অনুবাদশিল্প আরও প্রাণবান হয়ে উঠবে। বাংলা সাহিত্যের বড় বড় কীর্তিগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার মাধ্যমে সেগুলোকে বিদেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে ইংরেজিতে প্রকাশিত সাহিত্যকর্মগুলোকে বাংলায় অনূদিত করে বাঙালি পাঠকের দোরগোড়ায় আরও বেশি পরিমাণে এনে দেওয়া সম্ভব। এ ধরণের আদান-প্রদান আগামী দিনের বাংলা সাহিত্যে বিশ্বজনীন আবেদন তৈরি করবে এবং স্থানিকতা পেরিয়ে তা বিশ্বমানবের আনন্দ ও অশ্রু, আশা ও নৈরাশ্য, ঐতিহ্য ও প্রগতিকে প্রতিবিম্বিত করবে। এমনটি হলে আমাদের পুরো সাহিত্য অঙ্গনে নবজীবনের সঞ্চার ঘটবে।

পরিশেষ

পরিবর্তিত সময়ের চাহিদা মেটানো এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ মোকাবেলার প্রশ্নে ইংরেজি বিভাগের সংস্কার অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে। এর জন্য প্রয়োজন নির্মোহ পর্যালোচনা এবং স্বকীয়তার বোধ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে অন্ধভাবে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে আত্মপরিচয় অন্বেষণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম বলেও প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। বিশ্বায়নের বিস্মৃতিতে নিমজ্জন ঠেকাতে হলে বিদ্যায়তনিক পরিসরে এই আলাপ তোলা অতি জরুরি।

* হিন্দি ও উর্দু

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Previous Article

জেনারেশন এম এর উদ্ভাবন: উম্মাহ ও নিওলিবারেলিজম

Next Article

চলচ্চিত্রের লেখক : বিশালের শেক্সপিয়ার

Write a Comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *