আজাদ হোসেন | ১ম সংখ্যা · পৃষ্ঠা ১৭
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে ১৯৪৬ সালে মরিস ডবের বহুল আলোচিত পুস্তক Studies in the Development of Capitalism প্রকাশিত হয়। রডনি হিলটন জানাচ্ছেন এই পুস্তক প্রকাশিত হওয়ার পর ইংল্যান্ডে এক ধরনের নীরবতা কাজ করেছিল, এই অর্থে যে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয় এটার বিষয়বস্তু হলেও এই পুস্তক নিয়ে সিরিয়াস কোনো আলাপ আলোচনা দেখা যায় নি। পরে আমেরিকান মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ পল সুইজি যখন এই পুস্তকের সমালোচনা করেন তখন ইউরোপীয় বিদ্যায়তনিক মার্কসবাদী মহলে দীর্ঘ বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যাতে তৎকালীন প্রতাপশালী অনেক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ করেন, যা পরবর্তীতে ট্রানজিশন ডিবেট নামে পরিচিতি লাভ করে। এই বিতর্কের মূল বিষয় ছিল পুঁজির উত্থান। কিভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন কোন শর্ত সাপেক্ষে পুঁজির উত্থান হলো বা হয়, বিশেষত ইংল্যান্ডে, তার অনুসন্ধানই ছিল এর প্রেক্ষিত।১
পশ্চিমের এই উত্তাপ দুনিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলেছিল। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকান সমাজের সমাজ কাঠামোর কি অবস্থা, তাতে পুঁজিবাদী বিকাশের সম্ভাবনা কতটুকু, সেই বিকাশ ত্বরান্বিত করতে কি কি দাওয়াই লাগে, এসব বিষয়ে বিস্তর আলাপ হয়। এই আলাপের পিছনে পূর্বোক্ত সমাজসমূহ বদলানোর বিপ্লবী আকাঙ্খাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিশেবে কাজ করে। কেননা, দুনিয়া বদলাতে গেলে, দুনিয়া কোন বাস্তবতায় বর্তমান আছে তার সুলুকসন্ধান একটা অতি-জরুরি কাজ। আর উপনিবেশের জোয়াল কাঁধ থেকে ঝেড়ে নামিয়ে নিজের গতিপথ তৈরির আকাঙ্খা অবশ্যই বড় একটা প্রেরণার হিশেবে কাজ করে।২
দুনিয়া বদলানোর এই প্রজেক্টে বামপন্থীদের একচেটিয়া কোনো অধিকার ছিল না। ফলে, একটু ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হলেও, ‘প্রথাগত’ অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে ‘আধুনিক’ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার একটা অভিপ্রায় পুঁজিবাদী শিবিরেও লক্ষ্য করা গেছে।
এখানে যেটা লক্ষ্যনীয় তা হলো, মার্কসবাদী এবং পুঁজিবাদী, উভয় মহলেই এক ধরনের ইতিহাসবাদী (historicist) প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা এমন একটা বাস্তবতার ইঙ্গিত করে যেখানে, আলোচ্য দুই শিবিরের সভ্যগণ অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দেখছেন এবং এরই পরিক্রমায় পতিত অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বাতলানোর চেষ্টা করছেন। একদিকে মার্কসবাদীরা প্রস্তাব করছেন, পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্য দিয়ে সাম্যবাদের অভিমুখে অগ্রসর হওয়া যাবে। অন্যদিকে, ভিন্নস্বরে হলেও একই ধরনের মনজিলে মকসুদের আকাঙ্খায় অর্থনীতিকে ‘অনাধুনিক’ থেকে ‘আধুনিকতার’ দিকে ধাবিত করতে উদ্যমী পুঁজিবাদীরা। বণ্টনের প্রশ্নটা পাশে সরিয়ে কারিগরি পরিভাষার ভাবার্থটা উদ্ধার করতে গেলে উভয় প্রকল্পেরই উদ্দেশ্য এক, এই দাবী করা হলে আশাকরি কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না।
অর্থাৎ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার ট্রেনে একবার উঠে যেতে পারলে (মার্কসবাদী প্রস্তাবনা গোড়ায় এই প্রস্তাবের সাথে একমত হয় না সত্য, কিন্তু পুঁজিবাদী বিকাশ ঠিকই চায়), অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (growth) অর্জনের মধ্য দিয়ে অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন (development) নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এবং একটু তরল ভাষায় বললে, ‘আমাদের আর কোনো দুঃখ-কষ্ট রইবে না’, এই কিসিমের একটা বয়ান (discourse) বিউপনিবেশিত এবং তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরকামী বাজারে খুব প্রচলিত ছিল। পশ্চিম ইউরোপে পুঁজির উত্থান ও বিকাশ নিয়ে প্রচলিত বয়ানের পরিষ্কার একটা ছাপ এখানে লক্ষ্যণীয় এবং এটা অনুসরণযোগ্য একটা মডেল হিশেবে স্বীকৃত।
এ লক্ষ্যে বিউপনিবেশিত দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা ও প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো শিল্পায়ন (industrialisation), উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, তথা পুঁজিবাদী বিকাশ। কিন্তু এই উদ্যোগ গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরেই উন্নয়ন তত্ত্বের তাত্ত্বিকদের অনেকেই বুঝতে পারছিলেন যে, তাদের পরিকল্পনা মাফিক শিল্পায়ন হলেও অর্থনীতি তাদের পরিকল্পিত ছকে আগাচ্ছে না। এসময় এসব উন্নয়ন প্রকল্পের বহুমাত্রিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং উন্নয়ন তাত্ত্বিকরা তা বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপনও করেন। একই সমান্তরালে মার্কসবাদী শিবিরেও উন্নয়ন ও অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জারি ছিল। উভয় শিবিরের বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক বয়ানের পুরোটা সম্ভব না হলেও চলনসই অথচ সংক্ষিপ্ত একটি পর্যালোচনা আমরা পরবর্তীতে উপস্থাপন করবো। কিন্তু এই প্রবন্ধে আমরা কল্যাণ স্যানালের Rethinking Capitalist Development: Primitive Accumulation, Governmentality & Post-Colonial Capitalism (Routledge, 2007) গ্রন্থকে কেন্দ্র করে আমাদের আলাপ সীমাবদ্ধ রাখব। বিউপনিবেশিত সমাজে পুঁজির বিকাশ সম্পর্কে এই বইটি কেন আমাদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠলো তা পরবর্তীতে পরিষ্কার করতে পারব বলে আশা রাখছি। আপাতত নোক্তা আকারে বলে রাখা যেতে পারে, বিউপনিবেশিত দেশে পুঁজির বিকাশ এবং তার সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের সম্পর্ক বা কার্যকরণ বুঝতে এই পুস্তক তার কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বেশ কার্যকরী। আর এই ভিত্তির উপর ভর করেই আমরা বিউপনিবেশিত সমাজে, বিশেষত বাংলাদেশে, পুঁজির বিকাশ এবং তৎসম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যকরণের সুলুকসন্ধান করতে সচেষ্ট হবো।
আদি সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে পুঁজির উত্থান
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ যে বিশ্বদরবারে বিজয়ী হিশেবে আবির্ভূত হয়েছে সে বিষয়ে আশাকরি গোড়া মার্কসবাদীরাও দ্বিমত পোষণ করবেন না। এটা বাম ডাম উভয় মহলেই স্বীকৃত। কিন্তু পুঁজিবাদ বস্তুটা কি এবং কিভাবে একে অন্য কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে আলাদা করা যায় তা নিয়ে বিস্তর ভুল বোঝাবুঝি আছে।
কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে আমরা প্রথমত এর সংজ্ঞায়নের দিকে নজর দিব। আমরা এটাকে পুরোপুরি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দেখব, কারণ মার্কস যেভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সংজ্ঞায়ন করেছেন সেটা অন্যান্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে একে আলাদা করে চিহ্নিত করতে অত্যাধিক কার্যকরী।
মার্কসীয় দৃষ্টিতে, পুঁজিবাদ একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা পুঁজিপতিদের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং পুঁজিপতি মজুরির বিনিময়ে শ্রম নিয়োগ করে উদ্ধৃত্ত মূল্য অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদন কাজে উদ্যোগী হয়। এখানে যেটা লক্ষ্যণীয় তা হলো, উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার পাশাপাশি পুঁজি নিয়োজিত হয় তার নিজের পুনরুৎপাদনের মধ্য দিয়ে উদ্ধৃত্ত মূল্য সৃষ্টিতে। এবং শ্রম নিজেই এখানে একটি পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। পণ্যের মতো শ্রম বেচাকেনা হচ্ছে। পণ্যের উৎপাদন কার্যে যিনি নিযুক্ত থাকেন (শ্রমিক), উৎপাদিত পণ্যে তাঁর কোনো ধরনের মালিকানা থাকে না। একটা সার্কিটের সাহায্যে ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা করা যাক। পুঁজির সরল একটা সার্কিট এমন হতে পারে,
M – C – M’
এখানে M (অর্থ) দ্বারা আমরা অর্থকে বুঝাচ্ছি, যা দিয়ে C (পণ্য, যাতে উৎপাদনের উপকরণ এবং শ্রম নিজেও একটি পণ্য হিশেবে অন্তর্ভুক্ত) কেনা হচ্ছে এবং এর প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি M’ (উদ্ধৃত্ত মূল্য) অর্জন করেন। এক্ষেত্রে M’ অবশ্যই M এর চাইতে বড় হবে। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি তাঁর প্রাথমিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত উৎপাদন করেন, যাকে মার্কসীয় পরিভাষায় আমরা উদ্ধৃত্ত মূল্য (surplus value) বলছি। এই প্রক্রিয়া নিরন্তর চলতে থাকার মধ্য দিয়ে পুঁজি তার নিজের আত্মস্ফীতি ঘটায়। আর এই আত্মস্ফীতির গোড়ায় রয়েছে শ্রমিক শোষণ, যার ব্যাপারে মার্কস আমাদের সচেতন করেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, পুঁজিপতি এই শুরুর M কোত্থেকে পেলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা আবারো মার্কসের শরণ নিতে পারি। মার্কস পুঁজি‘র প্রথম খণ্ডের অষ্টম অংশের The Secret of Primitive Accumulation নামক অধ্যায়ে লিখেছেন,৩
“In the history of primitive accumulation, all revolutions are epoch-making that act as levers for the capitalist class in the course of its formation; but this is true above all for those moments when great masses of men are suddenly and forcibly torn from their means of subsistence, and hurled onto the labourmarket as free, unprotected and rightless proletarians. The expropriation of the agricultural producer, of the peasant, from the soil is the basis of the whole process. … Only in England, which we therefore take as our example, has it the classic form.”
পুঁজি গ্রন্থে ধর্মতত্ত্বের আদিপাপের মেটাফোর টেনে মার্কস যেভাবে আদি পুঞ্জীভবনের (primitive accumulation) পুঁজির উত্থান রহস্য ব্যখ্যা করেছেন তা পুরোপুরি উদ্ধৃত করতে পারলে ব্যাপারটা আরো খোলাসা হতো কিন্তু স্থান সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে আমরা নিরস্ত হলাম। তবে মার্কসের ইংল্যান্ডে পুঁজির বিকাশের বর্ণনা থেকে কল্যাণ স্যানাল যেভাবে তিনটা ধাপে পুরো প্রক্রিয়ার সার-সংক্ষেপ টেনেছেন তা উদ্ধৃত করলে এক্ষেত্রে সুবিধা হয়। অধ্যাপক স্যানালের তিনটা পয়েন্ট হলো,৪
- Accumulation of money by merchants;
- Conversion of the accumulated money into capital (means of production) and transformation of direct producers into free wage-laborers; and
- Creation of an external market for the product produced under the capitalist mode of production.
এক্ষণে, এই বিষয়টা আমাদের স্মরণে রাখা উচিত যে, পুঁজির উদ্ভবের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দীর্ঘ এক বিতর্কের অবতারণা করেন মার্কসবাদীরা, যার উল্লেখ আমরা এই প্রবন্ধের শুরুতেই করেছি। এবং এই বিতর্ক আজতক চলমান। যারা এই বিষয়ে একটু সজাগ তাঁরা জেনে থাকবেন, এ নিয়ে এখনো লেখালেখি, তর্ক-বিতর্ক বিদ্যমান। এটা অনস্বীকার্য যে, এই বিতর্ক অত্যন্ত দরকারি কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করার সুযোগ আপাতত নেই। তথাপি এটা মেনে নিতে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, আদি পুঞ্জীভবন ব্যতীত পুঁজির যাত্রা শুরু হতে পারে না। এবং পুঁজি একবার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো সেয়ানা হয়ে উঠলে সে আর কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেই নিজের পুনরুৎপাদনের মধ্য দিয়ে উদ্ধৃত্ত মূল্য উৎপাদন করে এবং আত্মস্ফীতি ঘটায়। মার্কসের ভাষায়,৫
“As soon as capitalist production stands on its own feet, it not only maintains this separation, but reproduces it on a constantly extending scale. The process … can be nothing other than the process which divorces the worker from the ownership of the conditions of his own labour; it is a process which operates two transformations, whereby the social means of subsistence and production are turned into capital, and the immediate producers are turned into wage-labourers. So-called primitive accumulation, therefore, is nothing else than the historical process of divorcing the producer from the means of production.”
পুঞ্জীভবনের এই প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে পুঁজির উদ্ভবের পরিণাম স্বরূপ বিশাল একটা জনগোষ্ঠী উৎপাদনের উপকরণ (যেমন: আবাদি ভূমি) হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এখানে উল্লেখ্য যে, শুধু ভূমি হারানোই একমাত্র পরিণাম ছিল না, শহুরে এবং গ্রাম্য কারিগর, ফেরিওয়ালা সহ আরো নানান পেশায় নিযুক্ত মানুষ তাদের প্রত্যক্ষ উৎপাদনের উপকরণ, যার উপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা অর্জিত হতো, তার উপর অধিকার হারান। যাদের জীবিকা নির্বাহ করার জন্য, নিজের শ্রম বিক্রি করা বা গতর খাটা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা খোলা থাকল না। মার্কসীয় দৃষ্টিতে এরাই পুঁজিপতির অধীনে মজুরির বিনিময়ে শ্রম দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ পুঁজি যাদের বাস্তুচ্যুত করেছে তাদের আবার শ্রমিক হিশেবে নিজের সার্কিটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে কোনোরকমে টিকিয়ে রাখছে। এই প্রসঙ্গে আমরা আবার ফিরব। তার আগে পুঁজিবাদী বিশ্ব বিউপনিবেশিত দেশ সমূহের জন্য কি দাওয়াই বাতলেছেন তার একটু তালাশ নেওয়া প্রয়োজন।
একথার আমাদের দেশে এখনো খুব ভালো চল আছে যে, শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বেকারত্ব দূর করতে হলে শিল্পায়নের যে বিকল্প নেই তা মোটামুটি সবাই এককথায় মেনে নেন। অনেকটা এই ধরণের বয়ানই তখন পুঁজিবাদী শিবিরে আধিপত্যশালী ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, ইউরোপ যেহেতু শিল্পায়ন তথা পুঁজির বিকাশে অগ্রদূতের ভূমিকা রেখেছে এবং এই প্রক্রিয়ায় ‘উন্নত’ হয়েছে, সেহেতু ইউরোপের পথ অনুসরণ করে সবার শিল্পায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় শিল্পায়ন সম্ভব হলে বিউপনিবেশিত দেশগুলো যেসকল অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলো তার একটা সুরাহা হবে। এখানে একটা বিষয়ের দিকে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি, তা হলো, ইতিহাসের সরলরৈখিক একটা পথরেখার মাধ্যমে উপনিবেশিত এবং তাদের মাপকাঠিতে ‘পশ্চাৎপদ’ সমাজকে ‘আধুনিক’ বানিয়ে পুঁজির দুরন্ত গতির ট্রেনে সংযুক্ত করার ফর্মূলা বাতলাচ্ছেন ‘উন্নত’ বিশ্বের মোড়ল সাহেবান। কল্যাণ স্যানাল তার বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে বার্নাড কোহেন মহাশয়ের উদ্ধৃতি দিতে ব্যাপারটা খোলাসা করতে চেয়েছেন। আমরা সেটা হুবহু উদ্ধৃত করছি,৬
“These theories say to Asians, Africans or Latin Americans: what you are today we have been in the past; you may become what we are today, but by that time we, of course, will be something else because we will have gone on. The modern developmental model as it was worked out by economists and political scientists in the 50s borrows this structure by trying to identify or scale aspects of third world societies in relation to the history of Europe. It assumes a lineality in European history…. That is both a pre-requisite for modernization and an indicator of change.”
এরই প্রেক্ষিতে আমরা মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বয়ানের একটা পর্যালোচনা উপস্থাপন করে আগালে সুবিধা হবে। আমরা চেষ্টা করছি যত সহজে সম্ভব এটা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে আগাতে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হলো ইতিহাসকে বুঝার এমন একটা তত্ত্ব, যাতে ইতিহাসকে উৎপাদন পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পরম্পরায় ভাগ করে দেখা হয়। উৎপাদন পদ্ধতি নির্ধারিত হয় উৎপাদন সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে, যা আবার নির্ধারিত হয় উৎপাদন কাঠামো এবং সম্পত্তির মালিকানা ভিত্তিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় একটা সমাজের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে উত্তরণ ঘটে। প্রচলিত মার্কসীয় এই বয়ানে ইতিহাসকে কয়েকটা স্তরে ভাগ করে দেখা হয়, যা হলো, আদিম সাম্যবাদ – দাস ব্যবস্থা – সামন্তবাদ – পুঁজিবাদ। প্রচলিত মার্কসীয় বয়ানে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে পৌছানোর আকাঙ্খা প্রতিফলিত হয়।
এই কাঠামো কাজে লাগছে না
কিন্তু বিগত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশক থেকেই এই বিষয়টা উন্নয়ন তাত্ত্বিকদের নজরে আসে যে, পুঁজিবাদী উন্নয়ন বিউপনিবেশিত সমাজে যেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে পূর্বানুমান করা হয়েছিল, অর্থাৎ বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীকে পুঁজি নিজের সার্কিটের মধ্যে অঙ্গীভূত করে দারিদ্র দূর করবে বলে আশা করা হয়েছিল সেটা করতে পুঁজি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কসীয় প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, পুঁজির বিকাশ প্রক্রিয়ায় যেসকল মানুষ পুঁজিপতির কাছে মজুরিতে নিজের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হবে বলে ধারনা করা হয়েছিল, তা হলো না। এই ব্যর্থতা পুঁজির দিক থেকেই; পুঁজি এই বিশাল জনসমষ্টিকে তাদের স্ব-অবস্থান থেকে উৎখাত করেছে কিন্তু পরে আর নিজের ভেতরে অঙ্গীভূত করে নিতে পারছে না। এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, যে ফরমায়েশি কাঠামো মেনে পুঁজিকে লিবারেটর ভাবা হচ্ছিলো তা পরিপূর্ণ করতে পুঁজি ব্যর্থ। এ পর্যায়ে আমরা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের ডিস্টিংগুইশড ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের একটা মন্তব্যের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। ২০২০ সালে, পূর্বের পাঁচ বছরের গড়ে ৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া দেখে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, “কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, তথ্য উপাত্ত ঠিক নেই। প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে সংশয় আছে। আর প্রবৃদ্ধির তথ্য যদি সঠিক থাকে, তাহলে বলতে হবে, যে ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা কর্মসংস্থানমুখী নয়।”৭
এদেশে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা তথ্যের কারসাজির কিংবা নয়-ছয় অথবা তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার বেহাল দশার বিষয়টা কারো অজানা নয়। তথাপি একে অস্বীকার না করেও, অমর্ত্য সেনের বরাতে,৮ আমরা বলতে পারি, উল্লেখযোগ্য হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি সম্ভব। এবং প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়নের সাথে গুলিয়ে, যেটা ক্ষমতার দালালরা প্রায়ই করে থাকেন, ফেলার মাথামোটামি যেন আমাদের পেয়ে না বসে।
আমরা আমাদের পূর্বের আলাপে ফিরে যাই। সচেতন পাঠক স্মরণ করতে পারবেন যে আমরা আগেও এমন বয়ান শুনেছি এবং এখনো এটা প্রায় শোনা যায় যে, এখানে (বাংলাদেশ কিংবা অন্য যেকোনো বিউপনিবেশিত দেশের নাম আপনার সুবিধা মতো বসিয়ে নিতে পারেন) পুঁজির ‘স্বাভাবিক’ বিকাশ হয় নি। আমরা আরও স্মরণ করতে পারি গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে এখানকার বামপন্থী মহলে তর্ক চলছিল বাংলাদেশে পুঁজিবাদী বিকাশ কতটুকু হলো, এখানকার সমাজ ব্যবস্থা পুঁজিবাদী নাকি সামন্তবাদী নাকি আধা-সামন্তবাদী। এই বিতর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার কিছু নেই, কিন্তু এখানে এসব বিতর্কের উদাহরণ টেনে আমরা এটা স্পষ্ট করতে চাইছি যে, পুঁজির সমাজ পরিবর্তনে বিপ্লবী সক্ষমতা সম্পর্কে একটা সাধারণ মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু আগের কথার পুনরাবৃত্তি করে এটা বলা চলে যে, পুঁজি বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বিপ্লবী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় নি। একই কথা প্রযোজ্য বিউপনিবেশিত প্রায় সব দেশ সম্পর্কে।
এক্ষণে আমরা কল্যাণ স্যানালের ইন্টারভেনশনের বিষয়টার অবতারণা করতে পারি। স্যানাল প্রথমত প্রশ্ন তুলছেন একটা সমাজ ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী কিংবা আধুনিক হিশেবে সমরূপতার (homogenity) বাইরে দেখা সম্ভব কিনা। স্যানালের ভাষায়,৯
“Isn’t it possible to see capitalism as necessarily a complex of capitalist and non-capitalist production residing in the commodity space? In other words, can’t we see capitalist development as process that necessarily produces, brings into existence, non-capitalist economic processes in its own course?”
মার্কসীয় ধারায় এই প্রশ্ন ভয়াবহ পরিণাম নিয়ে হাজির হয়, যা ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ধারণার, যে প্রসঙ্গে আমরা পূর্বে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি, ভিত নাড়িয়ে দেয়। কারণ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ধারণায় ইতিহাসকে তার সময়ের প্রেক্ষিতে একক একটি উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তাতে উৎপাদন ব্যবস্থার বহুমাত্রিক জটিলতার যে ব্যাপার স্যানাল উত্থাপন করেছেন তা এই বস্তুবাদী ধারনার ভিত নড়বড়ে করে দেয়। এ প্রসঙ্গে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সাথে এক কথোপকথনে স্যানাল মার্কসের পুঁজি’র প্রথম খণ্ডের শেষের দিকের একটা অধ্যায় থেকে রেফারেন্স দিয়ে বলছেন,১০
“primitive accumulation-এর … এই প্রক্রিয়াটি যত রক্তাক্ত ও নির্মম হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে পুরোনো, স্থবির ব্যবস্থাটা ভেঙে একটা উন্নত, dynamic পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা আসছে এটা ভালো হচ্ছে। অর্থাৎ একটা transition হচ্ছে যেখানে চাষিরা কারখানার মজুর হচ্ছে … মার্কস ও লেনিনের এই কথাগুলো – ঝুঁকি নিয়েই বলছি – আজ প্রাসঙ্গিক মনে করার কোনও কারণ নেই। সত্যি বলতে কি, এই কথাগুলো আজকের বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষেত্রে একটা বাধা হিসেবে কাজ করছে।”
মার্কসের অনুসারী মহলে এই বক্তব্য নিয়ে বেশ শোরগোল উঠার সম্ভাবনা খুবই বেশি ছিল কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেরকম কোনো প্রতিক্রিয়া অন্তত আমাদের নজরে পড়ে নি। যাহোক, স্যানাল যেহেতু দাবি করছেন যে, মার্কসীয় এই কাঠামো বাস্তবতা বুঝতে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে, এই প্রশ্ন উঠা খুবই স্বাভাবিক যে তাহলে আজকের বাস্তবতা বুঝতে স্যানাল কি দাওয়াই ফরমায়েশ করছেন? স্যানাল দাবি করছেন আমাদের নতুন তত্ত্বায়নের (তার ভাষায় conceptualization) কথা ভাবতে হবে। কি সে নতুন তত্ত্ব? নতুন তত্ত্ব প্রসঙ্গে আমরা একটু পরে আসছি। তার আগে বিউপনিবেশিত দেশ সমূহে ‘স্বাভাবিক’ পুঁজিবাদী বিকাশ হলো না কেন, তার কি কি উত্তর বিভিন্ন তাত্ত্বিকগণ প্রস্তাব করেছেন সংক্ষেপে তার একটু তালাশ নেওয়ার চেষ্টা করা যাক।
‘স্বাভাবিক’ পুঁজিবাদী বিকাশ হলো না কেন?
পুঁজির ‘স্বাভাবিক’ বিকাশ হলো না কেন এই মর্মে গোটাকয়েক তত্ত্ব বাজারে চালু আছে। আমরা বিদ্যায়তনিক মহলে ডমিন্যান্ট কয়েকটা তত্ত্বের সারকথা সংক্ষেপে নিচে তুলে আনার চেষ্টা করলাম।
নির্ভরশীলতার তত্ত্ব ও বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব
নির্ভরশীলতার তত্ত্ব (dependency theory) উন্নয়ন এবং অনুন্নয়ন উভয়কে বিশ্ব অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হিশেবে দেখে। এই তত্ত্ব উন্নত বিশ্বের অর্থনীতির সাথে পশ্চাৎপদ অর্থনীতির অসমতার উপর জোর দেয় এবং এর ফলে সৃষ্ট নির্ভরশীলতার সম্পর্ক দিয়ে বিউপনিবেশিত সমাজের পশ্চাৎপদতার ব্যাখ্যা দেয়। কেন্দ্র (center) – প্রান্ত (periphery) বাইনারি বিভাজনে বিভাজিত করে, কিভাবে উন্নত বিশ্ব (অর্থাৎ কেন্দ্র) অনুন্নত বিশ্ব (অর্থাৎ প্রান্ত) থেকে অসম বিনিময়ের মাধ্যমে উদ্ধৃত্ত মূল্য শোষণ করে নিয়ে প্রান্তের গরিবিপনা টিকিয়ে রাখে তার ব্যাখ্যা দেওয়ায় চেষ্টিত। আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্কের বরাতে বলা যায়,১১
“… development and underdevelopment are the same in that they are the product of a single, but dialectically contradictory, economic structure and process of capitalism. Thus, they cannot be viewed as the product of supposedly different economic structure or systems. … the same historical process of the expansion and development of capitalism throughout the world has simultaneously generated … both economic development and structural underdevelopment.”
অন্যদিকে, বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব বা World System Theory এর প্রবক্তা হলেন আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন। এই তত্ত্বেও ওয়ালারস্টেইন মূলত যা প্রস্তাব করেন তা পূর্বোক্ত নির্ভরশীলতার তত্ত্বের অনেকটা সম্পূরক। তিনি core আর periphery সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান কিভাবে এই অসম সম্পর্ক কেন্দ্রে উদ্ধৃত্ত মূল্য শুষে নেওয়ার মাধ্যমে তার পুঁজির পুঞ্জীভবনে ভূমিকা রাখে।১২ নির্ভরশীলতার তত্ত্ব যেখানে গরিবিপনার কারণ অনুসন্ধান করে সেখানে বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্ব কিভাবে অসম বিনিময় সম্পর্ক ধনীকে আরো ধনী বানায় তার অনুসন্ধান চালায়। এই দুই মতবাদের সীমাবদ্ধতা কোথায় তা আমরা রবার্ট ব্রেনারের কাছ থেকে বুঝার চেষ্টা করি।
ব্রেনার এবং তার উৎপাদন পদ্ধতির প্রশ্ন
নির্ভরশীলতার তত্ত্ব ও বিশ্ব ব্যবস্থা তত্ত্বের সমালোচনা করতে গিয়ে রবার্ট ব্রেনার বলছেন এই দুই তত্ত্বের উভয়ই উৎপাদন পদ্ধতি এবং শ্রেণির প্রশ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে পণ্যের বণ্টন ও সার্কুলেশনে গুরুত্ব দেওয়াতে পুঁজিবাদী বিকাশের গোড়ার প্রশ্নে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ব্রেনার যেটাতে অত্যধিক জোর দিচ্ছেন তা হলো, পুঁজির বিকাশ সফল বা ব্যর্থ হওয়া নির্ভর করে শ্রেণি সংগ্রামের উপর, যা সুনির্দিষ্ট একটি অবস্থায় পুঁজিবাদী বিকাশের শর্ত তৈরি করে।১৩ কিন্তু ব্রেনারের শ্রেণির প্রশ্ন দিয়েও আমরা বিউপনিবেশিত সমাজের অনুন্নয়নকে পুরোপুরি বুঝে নিতে পারছি না। স্যানাল উত্থাপিত প্রশ্ন গুলোর গোড়ায় গেলে এই ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে।
সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ তত্ত্ব
সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ তত্ত্বের মূল প্রবক্তা বলা যায় সামীর আমিনকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি কৌশলে বাছাই করে এমন সব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন আনে যা তাকে উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ করে এবং উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ করে অথবা স্থানীয় বেনিয়া গোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির এই সিলেক্টিভ বিনিয়োগ চরিত্রের কারণে অর্থনীতির আমূল পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় না।১৪ এখানে স্যানাল আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার উদাহরণ টেনে প্রশ্ন তুলছেন, এসব মহাদেশের অনেক দেশে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় আমদানির বিকল্প তৈরি করে এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পরেও কেন এতে পুঁজির ‘স্বাভাবিক’ বিকাশ হলো না?
শ্রেণি, ক্ষমতা ও হেজেমনি
পশ্চিম ইউরোপে আদি পুঞ্জীভবনের সাথে রাষ্ট্রীয় দমনমূলক ক্ষমতার ব্যবহার পুঁজির বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আদি পুঞ্জীভবনের এই প্রক্রিয়ায় প্রাক-পুঁজিবাদী প্রত্যক্ষ উৎপাদক উৎপাদনের উপকরণের উপর অধিকার হারায়, ফলে জীবিকা নির্বাহ করতে মজুরির বিনিময়ে পুঁজির কাছে গতর খাটতে বাধ্য হয়। আর এই প্রক্রিয়ার রাষ্ট্রীয় দমনমূলক ক্ষমতার ব্যবহার ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের ইতিহাসে অনেক পাওয়া যায়। পুঁজির দানবীয় হয়ে উঠার এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের পূর্বের জীবিকা থেকে বিচ্যুত হওয়া সব কৃষক, কারিগর বিনা প্রতিবাদে পুঁজির আধিপত্য মেনে নেয় নি। মজুরির বিনিময়ে শ্রম বেচার পরিবর্তে অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন, নানান ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন অথবা ভবঘুরে হিশেবে আবির্ভূত হন। এসব রোধে আবার রাষ্ট্র তার দমনমূলক চরিত্র নিয়ে নানান ধরনের কঠোর আইন জারি করে। মার্কস বলছেন,১৫
“Thus were the agricultural people, first expropriated from soil, driven from their homes, turned into vagabonds, and then whipped, branded, tortured by laws grotesquely terrible, into the discipline necessary for the wage system.”
এখন গ্রামসির হেজেমনি তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখাচ্ছেন, ভারতে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কারণে ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপের মতো রাষ্ট্রের দমনমূলক ক্ষমতা ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, পুঁজির বিকাশ ইউরোপীয় ধাঁচে হচ্ছে না এবং প্রাক-পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার একই সমান্তরালে টিকে থাকছে। গ্রামসী কথিত হেজেমনি বজায় রেখে বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকছে ঠিকই কিন্তু প্রাক-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পুরোপুরি বিলয় ঘটাতে পারছে না।১৬ এর থেকে কল্যাণ স্যানাল মন্তব্য করছেন,১৭
“… The state therefore has to protect, preserve, and promote the pre-capitalist modes of production. The strength of post-colonial capital thus lies in its ability to use the ideological construct of passive revolution to carry on expanded reproduction in the modern sector and, at the same time ensure reproduction of the pre-capitalist, traditional sectors of economy.”
এরই প্রেক্ষিতে স্যানাল মন্তব্য করছেন, তত্ত্বগতভাবে যদি আমরা ধরেও নিই যে পুরোপুরি পুঁজিবাদী রূপান্তর সম্ভব, তথাপি গ্রামসীয় এই অবস্থান আমাদের বিউপনিবেশিত সমাজের জটিল কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে না। কারণ, আমাদের পূর্বোক্ত উল্লেখিত প্রক্রিয়া, এই মতবাদ অনুসারে, এক জায়গায় এসে থমকে গেছে, যেখান থেকে উত্তরণের পথটা আর সরলরৈখিক থাকছে না। তাহলে এখন কি উপায়?
পুঁজি ও তার সৃষ্ট বিরানভূমি
শ্রেণির প্রশ্ন, যেটা আমরা ব্রেনারের তত্ত্বায়নের ক্ষেত্রে দেখেছিলাম, তা দিয়ে বিউপনিবেশিত দেশে অর্থনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ধরা যাচ্ছে না। আবার গ্রামসী প্রস্তাবিত passive revolution ও কাজে আসছে না। তাহলে কি করা? স্যানাল বলছেন,১৮
“… we must break with the historicism that marks the Gramscian concept of passive revolution. Only then we are in a position to see the post-colonial capitalist development not as the immanent supersession of the earlier contradictions but as a constructed hegemony with a dialectic of its own.”
স্যানাল যেহেতু বলছেন ইতিহাসবাদী ধারনার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আমাদের আগাতে হবে তাহলে আমরা কিভাবে আগাবো? স্যানালের মতে পুঁজিকে যেভাবে আমরা একটা উন্নয়নের চালক হিশেবে কল্পনা করে নিয়েছিলাম এবং আশা করেছিলাম সে তার বিকাশ প্রক্রিয়ায় সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাবে তা ঘটাতে পুঁজি ব্যর্থ। আদি সঞ্চয়ের যে প্রক্রিয়ার কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি তাতে এই ধরনের একটা প্রত্যাশা ছিল যে, পুঁজি তার ‘হয়ে উঠা’র প্রক্রিয়ায় যাদের উৎখাত করছে, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুঁজির সার্কিটে অঙ্গীভূত করে নিবে। কিন্তু বাস্তবে যেটা দেখা গেল তা হলো, পুঁজি যাদের উৎখাত করছে তাদের সবাইকে তার নিজের সার্কিটে অঙ্গীভূত করে নিতে পারছে না। বিশাল একটি জনগোষ্ঠী পুঁজির এই অন্দরমহলে ঢুকতেই পারছেন না। স্যানাল আমাদের এক্ষেত্রে সতর্ক করেন, এটা মার্কস বর্ণিত পুঁজির রিজার্ভ আর্মি বলে বিবেচনা করা যাবে না।
এই প্রেক্ষিতে স্যানাল সংখ্যাতাত্ত্বিক উপাত্ত দিয়ে তার বক্তব্যের ন্যায্যতা প্রমাণে সচেষ্ট হন। আমরা পাঠককে সংখ্যাতত্ত্বের অত্যাচার থেকে নিস্তার দিতে কিছু মেট্রোপলিটন শহরের এই সম্পর্কিত পরিসংখ্যান দিয়ে ক্ষান্ত হচ্ছি। জাতিসংঘের তথ্যমতে,১৯ ২০২২ সালের নভেম্বর মাসেই পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, যার অর্ধেকের বেশি মানুষ শহরে বাস করে। আবার এই শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১.১ বিলিয়ন মানুষ বস্তিবাসী। সংখ্যাটা মোটেও নগন্য নয়। এই বস্তিবাসীদের সিংহ ভাগের যে পুঁজির সার্কিট তথা অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার নেই সেটা বুঝতে আরবান এথনোগ্রাফার হওয়ার প্রয়োজন নেই। চোখ কান খোলা রাখলে, খালি চোখেই এই বিশাল জনগোষ্ঠী আমাদের নজরে আসার কথা।
আমরা আগের বিষয়ে ফিরে যাই। স্যানাল দাবি করছেন, এই যে বিশাল একটা গোষ্ঠী, যাকে পুঁজি আদি পুঞ্জীভবনের প্রক্রিয়ার উৎখাত করলো তাকে আবার নিজের অন্দরমহলে জায়গা করে দিতে ব্যর্থ হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটা পুঁজির অন্তঃর্গত (endogenous) একটা ব্যাপার। অর্থাৎ পুঁজি নিজের পুঞ্জীভবন ও স্ফীতি ঘটাবে ঠিকই কিন্তু এই surplus population-কে কখনো নিজের সার্কিটে পুরোপুরি অঙ্গীভূত করে নিতে পারবে না। পুঁজি তার ‘হয়ে উঠা’র প্রক্রিয়ায় আছে, একসময় পুঁজি পুরো ব্যবস্থাটাই গ্রাস করে নিবে, এবং বিউপনিবেশিত দুনিয়ায় পুঁজির এখন যে ‘অস্বাভাবিক’ বিকাশ তা একসময় ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠবে, এমন আশাবাদ নিরুৎসাহিত করাই স্যানালের মূল প্রস্তাব। তিনি মূলত দাবি করছেন, আমরা এটাকে যতই অস্বাভাবিক বলে দাবি করি না কেন, এটাই মূলত স্বাভাবিক।
তিনি আরো বলছেন, ইউরোপে যেভাবে পুঁজির বিকাশের আদি পর্যায়ে উৎখাত হওয়া জনগোষ্ঠীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল তা আজকের দিনে বিউপনিবেশিত দুনিয়ায় সম্ভব নয়। কেননা, মানবাধিকার, নাগরিক অধিকারের বয়ান জনপ্রিয় থাকায় প্রান্তিকতায় যাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের দিক থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই বয়ান বাজারে কিভাবে জনপ্রিয় হলো এবং তার মধ্যদিয়ে governmentality ধারণার বিকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে স্যানাল তার পুস্তকে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। স্থান সীমাবদ্ধতার কারণে তার উপর আলোকপাত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি।
যাহোক, পুঁজির অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার না পাওয়া মানুষের জন্য দাওয়াই স্বরূপ যে ব্যবস্থা নেওয়া হলো তার সামান্য উল্লেখ করে আমরা স্যানালের আলাপের সমাপ্তি টানি। স্যানালের বরাতে আমরা আগেই বলেছি, বাদ পড়া এই জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখার দায় বর্তমান দুনিয়ায় পুঁজির নিতে হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন, পুঁজি নিজের অভ্যন্তরীণ মজলিশে এদের স্থান দিতে অপারগ কিন্তু মানবাধিকার, নাগরিক অধিকারের মতো পপুলার বয়ানের প্রতি সম্মতি প্রকাশে সে তার লুন্ঠনকৃত উদ্ধৃত্ত মূল্যের একটা অংশ এই বাহিরানার মানুষের জন্য ব্যয় করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই যে এদেশে এনজিও প্রতিষ্ঠানের এত রমরমা অবস্থা তার পিছনে পুঁজির পূর্ব-বর্ণিত চরিত্রের একটা শক্ত ভূমিকা আছে। স্যানাল এই চরিত্রের নাম দিয়েছেন reversal of primitive accumulation।
বিরানভূমিতে পুঁজির বাহিরানার মানবসকল টিকে থাকে কিভাবে?
এখন এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, পুঁজির অন্দরমহলে স্থান না পাওয়া বাহিরানার মানুষ টিকে থাকে কিভাবে? কারণ, আমরা আগেই দেখেছি আদি পুঞ্জীভবনের প্রক্রিয়ায় বাহিরানার মানুষেরা উৎখাত হয়েছেন এবং তাদের পুনর্বাসন করার কিছু প্রচেষ্ঠাও পুঁজিপতিদের দিক থেকে লক্ষ্য করা গেছে। স্যানাল বলেন উৎখাত হওয়া এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ে পুঁজি একটা বিরানভূমি (wasteland) গড়ে তোলে। এটা এই অর্থে বিরানভূমি নয় যে, এটা জনমানবশূন্য কোনো ভূমি, বরং এটা এই অর্থে বিরানভূমি যে, পুঁজির সার্কিটের মানুষ এখানে বসবাস করেন না, এতে পুঁজির অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার না পাওয়া মানুষেরাই বাস করেন। এই বিরানভূমির মানুষদের জন্য আবার নতুন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা স্যানালের শরণ নিলে সুবিধা হয়। স্যানাল দেখাচ্ছেন এখানে সমান্তরালে দু’টো অর্থনীতি ক্রিয়াশীল আছে। স্যানালের ভাষায়,২০
“…আমি প্রথমটাকে বলছি accumulation economy – যেটা ক্যাপিটালের যুক্তিতে চলে, যেখানে প্রযুক্তির উন্নতি, accumulation – এগুলোই চালিকা শক্তি। আর এই sub economy-টাকে আমি বলছি need economy যেটা চলে একটা ভিন্ন যুক্তিতে। এ দুটো economy পাশাপাশি রয়েছে। একদিকে growth করতে হবে। self employment promote করতে হবে, self-help group তৈরি করতে হবে। উন্নয়ন মানে একদিকে accumulation economy-তে growth হবে, অন্যদিকে একটা need-economy তৈরি করার মধ্য দিয়ে ক্যাপিটালের accumulation economy-কে legitimize করা হবে [এবং] তা গ্রহণীয় হয়ে উঠবে।”
এখানে একটা বিষয় আপাতত পরিষ্কার করা গেল যে, বিউপনিবেশিত সমাজ বাস্তবতা বুঝতে আমাদের সমান্তরাল কিন্তু পৃথক দুটো অর্থনীতির কথা ভাবতে হচ্ছে। অর্থাৎ স্যানাল নতুনভাবে তত্ত্বায়নের যে প্রস্তাব তুলেছিলেন তা এই মুহুর্তে অনেকটা পরিষ্কার হলো। আমরা দেখলাম এখানে ক্রিয়াশীল দুটি অর্থনীতির – need এবং accumulation – উপর ভিত্তি করে আমাদের আগাতে হচ্ছে। এবং শ্রেণির প্রশ্নটা তার পূর্বের গুরুত্ব হারাচ্ছে, অর্থাৎ শ্রেণি কাঠামোর মধ্যে এই নতুন বাস্তবতাকে আর পুরোপুরি ধরা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা স্যানালের বরাতে need economy’র (যাকে আমরা পরবর্তীতে জীবিকা অর্থনীতি বলবো) ধারণাটা আরেকটু পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। এতে করে শ্রেণির প্রশ্নটা আরো স্পষ্ট হবে। স্যানাল বলছেন,২১
“… this production space is fundamentally different from capitalist production … the purpose of production is to acquire money that will enable the producers to have access through the market to a bundle of goods and services that will satisfy their needs.”
এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, পুঁজিসৃষ্ট বিরানভূমিতে উৎপাদন কার্যক্রম অনুপস্থিত থাকতেই হবে এমন দাবি অনুচিত। এখানে লক্ষ্যণীয়, এই উৎপাদন উদ্ধৃত্ত মূল্য আহরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয় না; জীবিকা নির্বাহ করতে যেসকল প্রয়োজন মেটানোর দরকার হয় তা অর্থের মধ্যস্থতায় অর্জন করাটাই জীবিকা অর্থনীতির মূল লক্ষ্য। এখন উদ্ধৃত্ত মূল্য উৎপাদনের উদ্দেশ্য নাই হয়ে গেলে সেখানে শ্রেণির প্রশ্নটা আর তেমন কাজে লাগছে না, যার কথা আমরা স্যানালের বরাতে আগেও উল্লেখ করেছি।
উপসংহার অথবা কল্যাণ স্যানাল কি কোনো কিছু অবমূল্যায়ন করে গেলেন?
এই পর্যায়ে আমরা আমাদের পূর্বের দীর্ঘ আলোচনার একটা সারসংক্ষেপ করার চেষ্টা করি। আমরা শুরু থেকে একটা জিনিশ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলাম যে, অর্থনীতিকে সুনির্দিষ্ট সমরূপ একটা ব্যবস্থা হিশেবে ব্যাখ্যা করার যে প্রয়াস তা সমস্যাজনক। মার্কসীয় এবং অ-মার্কসীয় উভয় দৃষ্টিতেই সরলরৈখিক ইতিহাসবাদী একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যেটা স্পষ্ট করার মধ্য দিয়ে আমরা এটা দেখাতে চেয়েছি যে, সুনির্দিষ্ট একটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্রায়ন এবং তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার সীমাবদ্ধতা কোথায়। এক্ষেত্রে আমরা কল্যাণ স্যানাল প্রস্তাবিত ক্রিটিকের উপর নির্ভর করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বহুমুখী চরিত্রের কথা বলে স্যানাল যে দ্বৈত অর্থনীতির (dual economy) প্রস্তাব করেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সাথে সুর মিলিয়ে বলা যায়, সেটার ধারণা পরিষ্কার নয়।
দুই অর্থনীতির মধ্যে স্পষ্ট ভেদরেখা টেনে, জীবিকা অর্থনীতিতে শুধুমাত্র প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে উৎপাদনের কথা স্যানাল প্রস্তাব করেন তা আমাদের বাস্তবিক অভিজ্ঞতার সাথে মিলে না। এই দুই অর্থনীতির উপস্থিতি অস্বীকার না করেও, আমরা বলতে পারি এই দুই অর্থনীতির মধ্যে ফারাকটা অস্পষ্ট এবং এরা একে অপরকে প্রায়শই ওভারল্যাপ করে। যেমন – বাংলাদেশে এমন ঘটনা বিরল নয় যেখানে পরিবারের একজন সদস্য (ছেলে কিংবা মেয়ে) পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় (যেমন – গার্মেন্টস) সম্পৃক্ত, যেখানে তিনি উদ্ধৃত্ত মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। একইসাথে পরিবারে বয়স্ক বা আধ বয়স্ক পিতা-মাতা কৃষি কাজে সম্পৃক্ত, যাতে উৎপাদন প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল কিন্তু এই উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য শ্রম শোষণের মাধ্যমে উদ্ধৃত্ত মূল্য উৎপাদন করা নয়। নিজেদের রুজি সংস্থানের লক্ষ্যটাই মুখ্য।
আরো একটা বিষয় যেটা স্যানালের তত্ত্বায়নের সাথে সম্পর্কিত এবং এই বিষয়ে প্রণব বর্ধন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন,২২ যাতে তিনি বলছেন শহুরে পুঁজির বাহিরানার যে মানুষের কথা স্যানাল আমাদের বলেন তাদের সবাই আদি পুঞ্জীভবনের প্রক্রিয়ায় উৎখাত হয়েছেন সে দাবি পুরোপুরি ন্যায্য নয়। ডেমোগ্রাফিক মাইগ্রেশনের কারণেও বাহিরানার জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ঘটতে পারে, যার উদাহরণ আমরা বাংলাদেশে প্রায়শই দেখি। যেমন- উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ শহরমুখী হয়ে বস্তিবাসী হওয়ার ঘটনা খুব বিরল নয়।
এসকল সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক স্যানাল যেভাবে কোনো অর্থনীতিকে সরল, একক ও সমরূপ ভাবার সংকট দেখিয়ে দেন, পশ্চিমের আঁকা ছকের মধ্যে আবদ্ধ হওয়ায় নিজেদের বহুমাত্রিক সম্ভাবনাকে অবজ্ঞা করার বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতার পরিণাম যেভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রথাগত গোঁড়ামি থেকে বের হয়ে নতুন চিন্তা করার প্রেরণা দেন, তার জন্য তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন।