অর্বাচিন আব্দুল্লাহ | ১ম সংখ্যা · পৃষ্ঠা ৮১
ক্রিমিনোলজি হলো সমাজ-বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যেখানে অপরাধের কারণ, প্রকৃতি-ধরণ, অপরাধ প্রতিকার- প্রতিরোধ, অপরাধের শাস্তি, অপরাধীর সংশোধন- পূণর্বাসন এবং অধিকার, ভিক্টিম তথা ভুক্তভোগীর অধিকার- ন্যায়বিচার লাভের প্রক্রিয়া, সমাজ-পুলিশের ভূমিকা এবং কার্যপ্রণালী নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়। ‘ক্রিমিনোলজি’ শব্দটি ইংরেজি থেকে নেয়া যদিও এর উৎপত্তি ল্যাটিন থেকে, শব্দটি পারিভাষিক হওয়ায় বাংলাতেও অনুবাদ হয়েছে, Criminology- অপরাধবিজ্ঞান/ অপরাধতত্ত্ব। Sociology- সমাজবিজ্ঞান/ সমাজতত্ত্ব, Anthropology- নৃতত্ত্ব/ নৃ বিজ্ঞান এই ধারাবাহিকতা অনুকরণ করেই Criminology কে- অপরাধবিজ্ঞান/ অপরাধতত্ত্ব অনুবাদ করা হয়েছে। Sociology- সমাজবিজ্ঞান/সমাজতত্ত্ব এবং Anthropology-নৃতত্ত্ব/ নৃবিজ্ঞান এর অনুবাদ অ্যাকাডেমিক দিক থেকে যতটা প্রাসঙ্গিক ‘অপরাধবিজ্ঞান/ অপরাধতত্ত্ব’ শব্দটা অতোটা প্রাসঙ্গিক কিনা সেটা প্রশ্নের বিষয়। Criminology কে- যখন ‘অপরাধবিজ্ঞান/ অপরাধতত্ত্ব’ নামকরণ করা হয় তখন তা দিয়ে কেবল এটাই নির্দেশ করে যে, শাখাটি শুধুমাত্র অপরাধ এবং অপরাধবিষয়ক ডিসকোর্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আদতে ক্রিমিনোলজি ডিসিপ্লিন এন চেয়েও বড়- ক্রিমিনোলজি শুধুমাত্র অপরাধ নিয়ে পড়ে না থেকে ভিক্টিম,ভিক্টিম-অপরাধীর অধিকার, ন্যায়বিচার লাভের প্রক্রিয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা, সুষ্ঠ তদন্তের প্রক্রিয়া, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় পুলিশের পাশাপাশি সমাজের মানুষের ভূমিকা; সামাজিক, রাষ্ট্র্রীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে আলোকপাত করে। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি একজন অপরাধী যেন আত্মিকভাবে সুস্থ এবং সংশোধন হয়ে সমাজে পূণরায় ফিরে এসে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে এই দিকে নজর দেয়ার পাশাপাশি একজন নিরপরাধ মানুষ যেন নিরপরাধই থাকে; অপরাধের সাথে না জড়ায় ঐদিকেও নজর রাখে। কারাগার তথা সংশোধন কেন্দ্রগুলো একজন অপরাধী কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি কেমন আচরণ করবে, কিরূপ যত্নশীল হবে এই বিষয়গুলো নিয়েও স্পষ্ট আলোচনা করে। এছাড়াও অপ্রাপ্ত বয়স্ক অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীরা যাতে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন লাভ করে, অপরাধের সাথে না জড়ায়, অপরাধের সাথে জড়ালেও তাদের বিচার প্রক্রিয়া এবং সংশোধন প্রক্রিয়া কেমন হবে এই বিষয়েও সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। এইসব বিষয় বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়ে উঠে Criminology শব্দের অনুবাদ ‘অপরাধবিজ্ঞান/ অপরাধতত্ত্ব’ সমীচীন না। ক্রিমিনোলজির বাংলাভাষী চিন্তকদের এই বিষয়ে পূণর্ভাবনা করা দরকার।
ক্রিমিনোলজির বিকাশ, প্রচার এবং প্রসারে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে পশ্চিমা বিশ্ব(ইউরোপ,আমেরিকা)। পশ্চিমা বিশ্বের হাতেই ক্রিমিনোলজি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিনে রূপ নেয়। ক্রিমিনোলজির যেসব ঘরানা (পজেটিভ স্কুল, ক্ল্যাসিক্যাল, নিউ ক্ল্যাসিক্যাল, শিকাগো স্কুল) আছে তার সবই গড়ে উঠেছে পশ্চিমা বিশ্বের হাত ধরে। তাছাড়াও অনেক নতুন নতুন অপরাধ এবং এদের ধরণ, বৈশিষ্ট্যও পশ্চিমা বিশ্ব থেকে জন্ম হয়েছে- কর্পোরেট ক্রাইম, হোয়াইট কলার ক্রাইম, সাইবার ক্রাইম, এনভায়রনমেন্টাল ক্রাইম ইত্যাদি। এসব বিষয় বিবেচনায় পুরো দুনিয়ায় ক্রিমিনোলজির প্রয়োগও পশ্চিমা সমাজের প্রেক্ষাপটে কিন্তু প্রশ্ন হলো এশিয়ান কিংবা আফ্রিকান সমাজে পশ্চিমা সমাজের সমস্যার সমাধান কতটা বাস্তবযোগ্য! এ ব্যাপারে উত্তর-উপনিবেশবাদী দার্শনিকগণ শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, উত্তর-উপনিবেশবাদী দার্শনিকদের মনে এমন প্রশ্নে উদ্রেক হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিলো। পশ্চিমের সমাজ ব্যবস্থা, পারিবারিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক এশিয়ান, আফ্রিকান এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উত্তর-উপনিবেশবাদী দার্শনিগণ যে কেবল ক্রিমিনোলজির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তা নয় বরং তাদের প্রশ্নের জায়গা ছিল আরও বিস্তৃত। পশ্চিমের নীতি, আইন, পলিসি পশ্চিম ব্যতীত অন্যান্য স্থানে কতোটা কার্যকর এবং উপযোগিতা কতটুকু এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই উত্তর-উপনিবেশবাদী দার্শনিগণ অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন রাখা শুরু করেন। ই ডু বোইস, ফ্রাঞ্জ ফানোঁ, এডওয়ার্ড সাইদ এবং মিশেল ফুকো ঘরনার দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম। এদের হাত ধরেই পরবর্তীতে ক্রিমিনোলজিতে নতুন এক ধারা সৃষ্টি হয়, ক্রিমিনোলজির এই ধারাটি ‘সাদার্ন ক্রিমিনোলজি’ নামে পরিচিত।
পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই কখনো না কখনো ইউরোপিয়ান দেশগুলোর উপনিবেশ ছিলো, উপনিবেশবাদী ইউরোপিয়ানদের কাছে উপনিবেশের অধিবাসীদের মর্যাদা ছিলো দাসের সমতুল্য। দাস এবং মনিব এই সম্পর্কের ভিত্তিতে উপনিবেশবাদী ইউরোপিয়ানরা দুনিয়াকে দুইভাগে ভাগ করেছে- ১. গ্লোবাল সাউথ (দক্ষিণের দুনিয়া) ২. গ্লোবাল নর্থ (উত্তরের দুনিয়া)। তবে উপনিবেশ ছাড়াও আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর ভর করে সাউথ এবং নর্থকে ভাগ করা যায়। গ্লোবাল সাউথের অন্তভুক্ত এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলো। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশই এই মহাদেশে বাস করে, বেশিরভাগ দেশই দরিদ্রপীড়িত, স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল। অন্যদিকে গ্লোবাল নর্থের মধ্যে রয়েছে ইউরোপের পুরানো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো কিছু ধনী রাষ্ট্র। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই দেশগুলো একসময় ইউরোপের উপনিবেশ ছিলো বর্ণবাদ প্রক্রিয়ার কারণে তারা গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই দেশগুলো ছিলো মূলত হোয়াইট স্যাটেলারদের। যার ফলশ্রুতিতে দেশগুলো উপনিবেশ হওয়া সত্ত্বেও একসময় হোয়াইট স্যাটেলাররা ইউরোপিয়ানদের জ্ঞাতিভাই হিসেবে মর্যাদা লাভ করে এবং একসময় উপনিবেশের এই দেশগুলো ধনী হয়ে উঠে। অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের সাথে ইউরোপের সম্পর্ক দাস মনিবের পর্যায়েই রয়ে যায়। ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে আধুনিক যুগেও যখন ইউরোপিয়ান ধ্যাণ-ধারণা, চিন্তা গ্লোবাল সাউথে প্রবেশ করে তখনও ইউরোপিয়ান চিন্তায় প্রভুসুলভ ব্রাহ্মণ্যবাদী আচরণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। সাল ১৯৮২, ব্রিটিশ ক্রিটিক্যাল ক্রিমিনোলোজিস্ট ‘স্ট্যানলি কোহেন’ উত্তর-ঔপনিবেশিক ক্রিমিনোলোজি নিয়ে শক্তপোক্ত মতামত দিয়েছিলেন, তিনি মনে করেন- ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা সংঘটিত অপরাধের প্রতি পশ্চিমা ক্রিমিনোলজিস্টরা অগ্রাহ্য করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলির শাসকশ্রেণী তাদের পুলিশিং এবং বিচার ব্যবস্থায় সবসময়ই পশ্চিমা মডেলের অনুকরণ করে। সে সুবাদে এইসব দেশের সংবিধানে নাগরিকদের মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়গুলো পশ্চিম থেকে আমদানি করা হয়, এগুলো মূলত শাসকশ্রেণী বুলি হিসেবেই আওড়ায়। তাহলে প্রশ্ন হলো পশ্চিম থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলির সংবিধানে এসব মুখরোচক জিনিস আমদানি করার কারণ কি? কোহেন মনে করেন- এসব পশ্চিমা আমদানিগুলি প্রায়শই রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি এবং নৃশংসতাকে সমর্থন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। স্ট্যানলি কোহে’র সাথে একমত পোষণ করেন বিকো এগোজিনো (২০০৪), তিনিও উত্তর-উপনিবেশবাদী দার্শনিক এবং ক্রিমিনোলজিস্টদের মধ্যে অন্যতম। এগোজিনোর মতে, পশ্চিমা ক্রিমিনোলজি পুরোপুরি উপনিবেশবাদের সাথে জড়িত। পশ্চিমা ক্রিমিনোলজিস্টরা সবসময়ই দ্বিচারিতা অবলম্বন করেন, নিজেদের অঞ্চলের ছোটখাটো অপরাধ নিয়ে তাদের যতোটা মাথা ব্যথা দেখা যায়, গ্লোবাল সাউথ অঞ্চলের মারাত্মক অপরাধ নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। পশ্চিমা ক্রিমিনোলজির চোখ দিয়ে যদি আমরা ক্রিমিনোলজির ইতিহাস দেখি তাহলে আমরা দেখি- ইউরোপীয়ান সাম্রাজ্যের গণহত্যায় লাখ লাখ অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী, স্থানীয় আমেরিকানদের বলি হওয়া কিংবা আফ্রিকানদের দাসত্বে বাধ্য করার ঘটনাগুলো অতটা জঘণ্য না যতোটা জঘণ্য একজন নির্দোষ ফরাসির মৃত্যুদন্ডের ঘটনা। ক্রিমিনোলজির মতো ডিসিপ্লিন যে কোনো অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, গ্লোবাল নর্থের ক্রিমিনোলজি যখন গ্লোবাল সাউথের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ব্যর্থ হতে শুরু করে এবং গ্লোবাল নর্থের ক্রিমিনোলজির চিন্তাগুলো বৈশ্বিক হয়ে উঠতে ব্যর্থ হতে শুরু করে তখন অ্যাকাডেমিতে গ্লোবাল সাউথের জন্য ক্রিমিনোলজির একটা নতুন ধারার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আর এই ধারাটিই ‘সাদার্ন ক্রিমিনোলজি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাদার্ন ক্রিমিনোলজি নর্থের চিন্তা এবং ধারণাকে গ্লোবাল সাউথের পারিপার্শ্বিকতার ( ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে) সাপেক্ষে নর্থের চিন্তাগুলোকে পুণর্বিবেচনা করে সংযোজন এবং পরিবর্ধন করে।
অস্ট্রেলিয়ান সমাজতত্ত্ববিদ ‘রাউইন কনেল’র ‘সাদার্ন থিউরি’র উপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিমিনোলজিস্ট ‘কেরি ক্যারিংটন’র হাত ধরে ‘সাদার্ন ক্রিমিনোলজি’ অ্যাকাডেমিক রূপ লাভ করে। একবিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশবাদী এবং উত্তর উপনিবেশবাদী বুদ্ধিজীবি এবং চিন্তকদের কল্যাণে পশ্চিমা সমাজের চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ এবং কাঠামোর এক শক্তপোক্ত ভিত গড়ে উঠে। কনেল মনে করেন- ব্রিটেন, পশ্চিম ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ বাস্তবতার উপর গ্লোবাল নর্থের ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ফলশ্রুতিতে অর্থনীতি, জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক সমাজচিন্তায় একধরণের আধিপত্য এবং ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। যার কারণে নর্থের সমাজে বেশ কিছু সমস্যা প্রকট হয়ে উঠে; সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক অবক্ষয়, অভিবাসন, শিল্প সংঘাত, নগর পরিবর্তন যার মধ্যে অন্যতম; গ্লোবাল নর্থের সমাজতত্ত্বে এই সমস্যাগুলোকে গভীর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; বিংশ শতাব্দীর দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়াকে এসকল সমস্যার কারণ হিসেবে মনে করা হয়। গ্লোবাল নর্থের মূল চালিকা শক্তি হলো পুঁজিবাদী আধুনিকতা, গ্লোবাল নর্থকে মানদণ্ড ধরেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোও তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা চালায়। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়- গ্লোবাল সাউথের সামাজিক ভিত্তি কী? গ্লোবাল সাউথ শুধু অনুকরণপ্রিয়! এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েই রাউইন কনেল গ্লোবাল সাউথের সমাজচিন্তার জন্য ২০০৭ সালে ‘সাদার্ন থিউরি’র প্রস্তবনা পেশ করেন। তার এই চমকপ্রদ প্রস্তাবনা লুফে নিতে ক্যারিংটন একটুও ভুল করেননি। ক্যারিংটন ২০১৫ সালে ‘সাদার্ন থিউরি’র ধারণাকে ক্রিমিনোলজিতে প্রয়োগ করেন এবং কনেলের মতো তিনিও ‘সাদার্ন ক্রিমিনোলজি’র প্রস্তাবনা সামনে আনেন। ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলো তথা গ্লোবাল সাউথে সবসময়ই উপনিবেশিকতার প্রভাব দৃশ্যমান, এই প্রসঙ্গে প্যান আফ্রিকান দার্শনিক ফানোঁ’র আলাপ খুবই প্রাসঙ্গিক। ফানোঁ তার ‘ব্ল্যাক স্কিন,হোয়াইট মাস্কস’ গ্রন্থে বিষয়টি বিশদভাবে তুলে এনেছেন। ফাঁনো মনে করেন, ঔপনিবেশিক জনপদের জনগণ সবসময়ই হীনমন্যতায় ভুগেন, তারা সবসময়ই উপনিবেশের কর্তাদের অনুকরণে সদা ব্যতিব্যস্ত থাকে। তাদের সংস্কৃতি, পোশাক, আচার-আচরণ, এমনকি গায়ের রং ইত্যাদি বিষয়ও নিজেদের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। আর এই হীনমন্যতা এইসব মানুষের স্বতন্ত্র চিন্তাকেও গ্রাস করে নেয়। যার ফলশ্রুতিতে ঔপনিবেশিক অঞ্চলের মানুষজন অবচেতনেও উপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা লালন করে। এ প্রেক্ষিতে একটা বিষয়ে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক- উপনিবেশিক সংস্কৃতি অনুসরণ করা কি দোষের কিছু? যেহেতু সংস্কৃতির প্রশ্নে পৃথিবীর সব চিন্তকই বিশ্বাস করেন যে, সংস্কৃতি হলো একটা চলমান প্রক্রিয়া, সময় এবং কালের মানদণ্ডে সংস্কৃতি ভাগাভাগি করা যায় পৃথিবীর সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে। মূলত খটকাটা এখানেই, সাংস্কৃতিক বিনিময়ে গ্লোবাল সাউথের সংস্কৃতি গ্লোবাল নর্থ তথা পাশ্চাত্যে কখনোই দেখা যায় না, এবং বিনিময় অযোগ্য বলেই নর্থে বিবেচিত হয়। এডওয়ার্ড সাইদ যেমন মনে করেন- পশ্চিম সবসময়ই তার নিজের লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে যার কারণে পশ্চিমা টেক্সটে সবসময়ই গ্লোবাল সাউথে গরিবী জীবনযাপন, হানাহানি, সংঘাত, দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়গুলোই শুধু উঠে আসে। সাউথের দৃঢ় সামাজিক বন্ধন, আধ্যাত্মিকতা, পারিবারিক বন্ধন কখনোই পশ্চিমের লেন্সে ধরা পড়ে না। এইসব বিষয় বিবেচনায় গ্লোবাল সাউথে ক্রিমিনোলজির স্বতন্ত্র বিকাশ জরুরি হয়ে পড়ে। গ্লোবাল সাউথের চিন্তক, বুদ্ধিজীবীদের কাছে সাদার্ন ক্রিমিনোলজি গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স হওয়ার পেছনে চীনা অ্যাকাডেমিশিয়ানদের অভূতপূর্ব ভূমিকা আছে। চীনা অ্যাকাডেমিশিয়ানরা যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রিমিনোলজি নিয়ে ডিগ্রি শেষ করে চীনে ফিরেন তখন তাঁরা দেখতে পান ওয়েস্টের ক্রিমিনোলজিক্যাল থিওরিগুলো চীনের প্রেক্ষাপটে খাঁপ খাচ্ছে না, এই বিষয়টা তাদের চিন্তাকে আন্দোলিত করে। চীনা চিন্তকরা তখন ওয়েস্টার্ন ক্রিমিনোলজির বিকল্প কিছু একটা খুঁজছিলেন। সেসময়টাতেই ক্যারিংটনের সাদার্ন ক্রিমিনোলজির প্রস্তাবনা তাদের সামনে আসে। জিয়ানহং লিউ, বিল হেবেন্টন, সুসায়ান জৌ প্রমুখ ক্যারিংটনের প্রস্তবনাকে আমলে নিয়ে এশিয়ায় (চীন,তাইওয়ান, ম্যাকাও) কিছু গবেষণা করে দেখেন- ফলাফল হিসেবে তারা এশিয়ান সমাজে ওয়েস্টার্ন ক্রিমিনোলজির অসামঞ্জস্যতা বুঝতে সক্ষম হন। একটা জিনিস তাদের কাছে বেশ প্রকট হয়ে উঠে,তারা দেখেন যে- পাশ্চাত্যের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজের বিপরীতে এশিয়ান সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপরীত, এশিয়ান সামষ্টিক সমাজ ব্যবস্থায় আধ্যাত্মিকতা, পারিবারিক-সামাজিক বন্ধন, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব বেশ লক্ষ্যনীয়; অন্যদিকে পশ্চিমা সমাজ পুরোপুরি মুদ্রার উল্টো পিঠ-পশ্চিমা সমাজে এশিয়ান সমাজের এসব মৌলিক উপাদানগুলো অনুপস্থিত।
তাহলে প্রশ্ন হলো সাদার্ন ক্রিমিনোলজির মৌলিক প্রস্তাবনা কি? প্রথমত, পশ্চিমের (গ্লোবাল নর্থের) ক্রিমিনোলজিক্যাল চিন্তাকে গ্লোবাল সাউথের সামাজিক বাস্তবতায় পূণরায় যাচাই করে পশ্চিমের চিন্তাগুলোকে গ্লোবাল সাউথের উপযোগী করে তোলা। দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথের এবং গ্লোবাল নর্থের জ্ঞানের বিনিময়ে সমতা আনা। তাহলে প্রশ্ন হোলো, সাদার্ন ক্রিমিনোলজি কি নর্দান ক্রিমিনোলজিকে খারিজ করে? কিংবা সাদার্ন ক্রিমিনোলজি এবং নর্দান ক্রিমিনোলজি কি পরস্পর বিপরীত? দু’টো প্রশ্নেরই উত্তর হলো- না, সাদার্ন ক্রিমিনোলজি কখনোই নর্দান ক্রিমিনোলজিকে খারিজ করে না বরং গ্লোবাল সাউথের প্রেক্ষাপটে হালনাগাদ করার প্রস্তাব করে। গ্লোবাল সাউথের বড় একটা অংশ হলো এশিয়া; আমরা যদি এশিয়ার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই ক্রিমিনোলজি নিয়ে প্রাচীন এশিয়ায় অনেক আলাপ উঠে এসেছিলো। অপরাধের কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য এশিয়ান সমাজের কিছু নিজস্ব নীতি ছিলো। উদাহরণস্বরূপ কনফুসিয়াসের কথা বলা যায় , কনফুসিয়াস (খ্রি.পূ ৫৫১-৪৭৯) বলেন, অপরাধের সংঘটনের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে, সেগুলো হলো: দরিদ্রতা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব। সুতরাং, সমাজ থেকে যদি দারিদ্র্য দূর করা যায় এবং মানুষের মাঝে নৈতিক শিক্ষার বিকাশ ঘটানো যায় তাহলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব। ইতিহাস ঘেঁটে তেমন লাভ নেই, বর্তমান সময়ের ক্রিমিনোলজিতে এশিয়ান সামাজের অবদান খুবই সামান্য। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের অনুধাবন করা দরকার গ্লোবাল সাউথের সাথে গ্লোবাল নর্থের ক্রিমিনোলজিক্যাল থিউরিগুলোর ফারাক কোথায়! এই বিষয়ে যদিও সামান্য কাজ শুরু হয়েছে। ক্রিমিনোলজির কিছু থিউরিকে পশ্চিমের নজরে ইউনিভার্সাল থিউরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়- স্যোশাল লার্নিং থিউরি, রুটিন এক্টিভিটিজ থিউরি, স্যোশাল কন্ট্রোল থিউরি, সেল্ফ কন্ট্রোল থিউরি, স্ট্রেইন থিউরি, রাইট রিয়ালিজম ইত্যাদি। যদিও পশ্চিমের তথাকথিত এসব ইউনিভার্সাল থিউরিগুলো গ্লোবাল সাউথে এসে পুরো খাপ খায় না।
রুটিন এক্টিভিটিজ থিউরির কথাই বলা যাক; এই থিউরির মূল বিষয় হলো, সব অপরাধের পিছে যে কেবল অপরাধীই দায়ী, বিষয়টা এমন না। অনেক সময় ভিক্টিম তথা ভুক্তোভোগীর কারণেও অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। বেশিরভাগ সময়ই ভিক্টিমের জীবন-যাপন অপরাধীকে অপরাধের দিকে ধাবিত করে। ভিক্টিম নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন অপরাধী সময়, স্থান,এবং উদ্দেশ্য-কাজ (টাইম,প্লেস,অবজেক্ট) এই তিনটি বিষয়কে আমলে রাখে। এরসাথে আরও তিনটি বিষয় যোগ করে অপরাধ সংঘটিত রাখে, বিষয় তিনটি হলো: ১. অপরাধ সংঘটনের পেছনে অপরাধীর অনুপ্রেরণা ( মোটিভেটেড অফেন্ডার); ভিক্টিমের যেসব বিষয় অপরাধীকে অপরাধের দিকে আকৃষ্ট করে- মোবাইল, ল্যাপটপ, দামি ঘড়ি, বাইক ইত্যাদি। অথবা এমনও হতে পারে অপরাধী নিজের প্রেষণা থেকেও অপরাধের দিকে ধাবিত হতে পারে- দরিদ্রতা, মাদকের অর্থ জোগান, সঙ্গদোষ ইত্যাদি বিষয় এখানে জড়িত। ২. উপর্যুক্ত ভিক্টিম নির্ধারণ (সিউট্যাবল টার্গেটস অব ক্রিমিনাল ভিক্টিমাইজেশন); সিঙ্গেল পার্সন:কেউ যদি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, বন্ধু-বান্ধব কম, অবিবাহিত, একা থাকে এমন ব্যক্তির ভিক্টিম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, এই ধরণের লোকেরা অপরাধীদের উপর্যুক্ত শিকার হয়ে থাকে। ৩. ভিক্টিমের প্রভাব প্রতিপত্তি, ক্ষমতা (ক্যাপাবল গার্ডিয়ানস অব পারসনস); ভিক্টিম অপরাধীকে শনাক্ত করতে কিংবা অপরাধীকে শাস্তির অওতায় আনতে কতটুকু সক্ষমতা রাখে নতুবা অপরাধীকে ঠেকাতে শারিরিক কিংবা মানসিকভাবে কতোটা সক্ষম, এই বিষয়গুলোও অপরাধী বিবেচনায় রাখে। ২০১৪ সালে স্টিভেন এফ মেসনার রুটিন এক্টিভিটিজ থিউরির পুনর্পাঠ করেন, তিনি এটা দেখাতে সক্ষম হন যে- উন্নত দেশগুলোতে সিঙ্গেল পার্সনদের ভিক্টিম হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি পক্ষান্তরে উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে চীন এবং তার আশেপাশের দেশগুলোতে সিঙ্গেল পার্সনদের ভিক্টিম হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। এর কারণ হিসেবে মেসনার মনে করেন এইসব অঞ্চলের সিঙ্গেল পার্সনরা কোনো না কোনোভাবে পরিবারের সাথে বন্ধন বজায় রাখে, একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না পরিবার থেকে, যেমনটা দেখা যায় পশ্চিমা সমাজে।
অপরাধ প্রতিরোধের জন্য ‘রাইট রিয়ালিজম’ থিউরি অনেকগুলো সুন্দর পথ বাতলে দেয়। পশ্চিমের সামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠা থিউরিটাতে পশ্চিমের ছাপ সুস্পষ্ট- অপরাধ প্রতিরোধের জন্য এই থিউরির প্রস্তাবনার মধ্যে একটি প্রস্তবনা হলো ‘একক পরিবার/ নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ গড়ে তোলা, একক পরিবারের মধ্য দিয়ে শিশু কিশোরদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া ভালো হয়, এমন অভিমত-ই দেয় এই থিউরি। যার ফলশ্রুতিতে একজন মানুষ অপরাধের দিকে কম ঝুঁকবে। এখন যদি আমরা এশিয়ান সমাজ বাস্তবতার দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই, এশিয়ান সমাজে যৌথ পরিবারের ধারণা বেশি জনপ্রিয় আর এখানকার একক পরিবারের বৈশিষ্ট্যও পশ্চিশ থেকে অনেকটা ব্যতিক্রম। রাইট রিয়ালিজম থিউরি অনুসরণ করে যদি এশিয়ান সমাজে একক পরিবার গঠনের জোয়ার উঠে তাহলে দেখা যাবে এখানকার পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাবে; এশিয়ান সমাজ বাস্তবতায় বিশেষ করে যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যৌথ পরিবার থেকে উঠে আসা শিশু কিশোরদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বেশ মজবুত। ঠিক একইভাবে পশ্চিমে যদি অপরাধ প্রতিরোধ এবং শিশু কিশোরদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার যৌথ পরিবার কাঠামো চালু করার প্রয়াস নেয়া হয় দেখা যাবে ওখানকার পারিবারিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়বে।
প্রতিটি দেশের সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক কাঠামো অন্য দেশ থেকে আলাদা। এসব বৈচিত্রতার কারণে প্রত্যেক জনপদের মানুষের চিন্তার পরিধি,দৃষ্টিভঙ্গি, জনপদের সমস্যা এবং সমস্যার সমাধান আলাদা হয়। এই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখেই চিন্তক এবং দার্শনিকদের চিন্তার পথকে সুগম করে নিতে হয়।