সম্পাদকীয় – লাল জুলাই সংখ্যা

জুলাইকে যদি ইতিহাসের কোন এক সন্ধিক্ষণে আমরা লোকেট করতে না পারি, তাহলে দেখা যাবে দুনিয়ায় নানান অগুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মতো এও একটা ফুটনোটে পর্যবসিত হবে।

পাঠকের চাহিদার কারণে ষাণ্মাসিক বাহাছ প্রথম সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার সপ্তাহ দুয়েকের ভিতর আমাদের দ্বিতীয় মুদ্রণের কাজ শুরু করে দিতে হয়। প্রথম মুদ্রণ ঠিকঠাক শেষ হবে কিনা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমাদের কাছে তখন তা ছিল এক স্মৃতিমধুর অভিজ্ঞতা। আগে থেকে করে রাখা দৌড়াদৌড়ির হ্যাপা তখন নেয়ামত হিসেসে আবির্ভূত হলো যেন! চট্টগ্রামের যেই প্রেসে ছাপাইতে দিছিলাম তাদের কাছে ছাপানোর প্লেটগুলো জমা রাখছিলাম আমরা, সবাই রাখে নাকি ওমাবে, তাই গতানুগতিক ওই নিয়মে ব্যত্যয় না ঘটিয়ে কার্যোদ্ধারের ওই ফন্দি। কিন্তু মহানুভব প্রেসের হর্তাকর্তারা প্লেটগুলোর হদিশ দিতে পারতেছিলেন না আর, হারিয়ে যে ফেলেছেন তাও খুলে বলেন না! সময়ক্ষেপণের মতো লাক্সারি তখন আমাদের ছিল না। বলতে চাইলাম তবুও সপ্তাহের ভিতরেই হাজির হয় প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় মুদ্রণ।

প্রথম সংখ্যার মেচান্ডিজিং করতে গিয়ে আমরা বেশকিছু পুরানো কিন্তু নয়া নয়া ব্যাপারের মুখোমুখি হলাম। সেমি-একাডেমিক লেখাপত্র ছাপানোর কথা শুনে অনেকের ভিতর একটা প্রশ্নের প্যাটার্ন আবিষ্কার করলাম, একাডেমিক তো না, সেমি-একাডেমিক আবার কি! তা কি জিনিস? একটা নির্দিষ্ট টপিকের উপর কেন বাহাছ বা সবগুলো লেখা নয়? ইত্যাদি ইত্যাদি।

এর ভিতর আগমন ঘটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তো বটেই, প্রায় সব এবং সরবভাবে এতে অংশগ্রহণ করি। এতে বাহাছ এর দ্বিতীয় সংখ্যার দিকে আমরা পূর্ণ মনোযোগী হতে পারি নাই। আমার যেটুকু মনোযোগ বরাদ্দ ছিল তা দিয়ে দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশও করে ফেলা যেতো, কিন্তু তা হতো এক বুঝ দেয়া সংখ্যা। ফলে আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান’কে নিয়ে একটা বিশেষ সংখ্যা করার ব্যাপারে একমত হই। এই পরিকল্পনার আগুনে ঘি ঢালছিল অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের ভিতরকার রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সমস্যাজনক নড়াচড়া। গণঅভ্যুত্থান’রে এক ধরনের স্বাভাবিক সময় হিসেবে চিহ্নিত করবার এক ধরনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। আমরা বুঝতে পারি জুলাইকে যদি ইতিহাসের কোন এক সন্ধিক্ষণে আমরা লোকেট করতে না পারি, তাহলে দেখা যাবে দুনিয়ায় নানান অগুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মতো এও একটা ফুটনোটে পর্যবসিত হবে।

যখন থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি বাহাছ-এর একটা গণঅভ্যুত্থান সংখ্যা হবে, তখন থিকাই আমরা ভাবতেছিলাম জুলাই থাকবে ওই সংখ্যার নামে। কারণ ছত্রিশ জুলাই চব্বিশের এই গণঅভ্যুত্থানের সফল হবার দিন, ফলে ‘শোক’-এর মাস আগস্টে জুলাইয়ে ঢুকে যাওয়ার যেই মাজিক ভায়োলেন্স এবং তার একটা সিগনেচার রূপ পাওয়া, তা স্মরণ রাখতে হবে আমাদের। এভাবেই ছত্রিশ জুলাই রূপান্তরিত হয় লাল জুলাইয়ে! ছত্রিশ তো আসলে লাল, রক্তের লাল, কোন ইডিওলজির লাল নয় তা, বরং চলতি সব মতাদর্শের সহাবস্থানে তৈরী হওয়া ঐক্যমতে বাকশালী ফ্যাসিবাদের গুলিতে খুন হওয়া শহীদদের খুনের লাল।

লাল জুলাই সংখ্যায় আমরা চিন্তামূলক প্রবন্ধ রাখবো, সেমি-একাডেমিক ঘরানার। কেন একাডেমিক বা ক্রিয়েটিভ রাইটিং না?

একাডেমিয়ার বিস্তৃত রীডিং যেমন সম্ভব, তেমনি রিগোরাস একটা স্ট্রাকচার আছে এর। এটা অতিমাত্রায় ফরমাল টোনে চলে, কড়া অবজেক্টিভ থাকে স্টাইলের দিক দিয়া। স্কলার্সে, সর্বোচ্চ রিসোর্চাররা হয় এর অডিয়েন্স। নতুন জ্ঞানের চাইতে এর আগ্রহ বেশি থাকে একাডেমিক ডিসকোর্সে অংশগ্রহণ করবার দিকে। সাইটেশন ছাড়া এই জিনিস লেখা সম্ভব না, এক্সট্রিমলি একুরেট সোর্সে উল্লেখ করা লাগে রেফারেন্সের। এর ফলে যা দাঁড়াইছে, একাডেমিক লেখা মানে একটা প্যাটার্নে লেখাসরে ফেলতে পারা মাত্র! একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে কিছু শব্দসদের ফেলে, কিছু প্রসিডিওর ফলো কইরা ধাঁধা সমাধান করবার মতো করে করা আর্টিকুলেশনসরে একাডেমিক বলে চালানোর একটা কোশেশ প্রায়ই দেখা যায় এদিকে। অনেকসময় তা অনেকাংশে সেন্স মেক না করা বাক্যসদের খেলোয়াড় সাজিয়ে ফুটবল খেলায় নামিয়ে দেবার মতো, যে, কড়া একাডেমিক টেক্সট হয়ে উঠতে পারতে হলে আইডিয়া এক্সপ্লোর করতে পারা না পারা না বরং নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ফলো করা নিজে সেন্সের পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারছে কিনা তা মূল বিষয়, যেমাবে জার্সি-রেফারি-বাঁশি-লাল-কার্ড ইত্যাদি অপরিহার্য ফুটবলে কিন্তু খেলা কেমন হচ্ছে তাতে কোন মাথাব্যথা নাই কোন!

নতুন কোন চিন্তা নাই, নয়া কোন তথ্য বা তত্ত্ব দিয়ে কোনকিছুসরে এক্সপ্লোর করতে চাওয়ার বাসনা নাই, বরং তান্ত্রিক সাধকের মতো একাডেমিক লেখালেখি যেন এক মন্ত্রের খেলা! চাহিবামাত্রই একাডেমিশিয়ান ওই খেল খেলাইবেন ও খেলাইতে বাধ্য থাকিবেন মতো ব্যাপার!

তারপর আছে একাডেমিশিয়ান আর ইন্টেলেকচুয়ালের ভিতর তফাৎ করতে না চাইবার প্রবল আগ্রহ। একজন একাডেমিশিয়ানের বই একাডেমিক বাপকাঠি যা তাসরে সন্তুষ্ট করবার জন্যে লেখা হয় মূলত। কোন আইডিয়াসরে প্রতিষ্ঠিত করবার কোন বাসনা ওই কিসিমের লেখায় কম দেখা যায়, ওই জনরার হিসেবে তা লাক্সারি বিশেষ! ফলে ওইখানে পাজল সলভ করবার যেই ক্ল্যাসিকাল রীতি তার ধারাবাহিকতায় একাডেমিক স্ট্যান্ডার্ড বানা হয় বেশী এবং চির-পরিচিত শব্দবন্ধ ও বাক্যরাজি দিয়া গোছানো সংসার তৈরী করে দেয়া হয় যাতে ধাঁধার সমাপ্তি হওয়ায় তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করবার পারে। ফলে একাডেমিক রিসোর্চাররা আইডিয়া পুশ করতে পারে কম। তার উপর আছে সেফটি নেটের ডিফেন্স মেকানিজম! কোন আইডিয়াসরে যখন আপসন একাডেমিক ভাবে তুলে ধরবার চাইবেন তাইলে যে পরিমাণ সেফটি নেট পার করতে হয় একজন একাডেমিশিয়ানের, সেই জাল পার হইয়া একটা ধারণা কতটুকু জনগণের কাছে পেঁছাইতে পারে সেটাও বিবেচনার বিষয়।

আছে অডিয়েন্স প্রবলেম! একজন একাডেমিশিয়ান তার অডিয়েন্স হিসেবে আশা করে আরেকজন একাডেমিশিয়ানসরে, সোজা বাঙলায় সে মূলত গবেষকের জন্য লেখে। তাও যেনতেন রিসোর্চার না, একাডেমিয়া যেহেতু পশ্চিমের দিকে হেলে থাকে সেহেতু তার প্রথম ও প্রায়ই প্রধানত পাঠক বেইস পশ্চিমে, যারা পশ্চিমা লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখতে চায়। ধরেন জনগণের ধাওয়ায় শেখ হাসিনার পলায়ন টপিকে বাংলাদেশ দুনিয়ার নানান জায়গার আগ্রহের এরিয়া। পশ্চিম এই নিয়ে স্টাডি করতে চায়, ফলে তাদের রিসোর্চ পেপার বা টেক্সট বুকের দরকার হবে। আমরা যে ঘরানার গবেষণা ও গবেষকদের নিয়া আলাপ দিচ্ছি ওই কিসিমের একাডেমিশিয়ানরা যেহেতু বার্কেট বুঝে সেহেতু খুব সহজেই কনটেন্ট হাজির হয় বাজারে। এইভাবে একাডেমিক লেখাজোঁকা এদিকে প্রায়ই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের যে সাময়িক স্রোত তাতে অনতিবিলম্বে সাড়া দিয়া নড়াচড়া করে। ফলে গবেষণার মানও যে উঠানামা করে, তা দাবি করা বাহুল্য বটে!

তাছাড়া আছে একাডেমিক মিডিওক্রিটির ব্যাপার। এরকম মিডিওকররা পশ্চিমে একাডেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হইতেই চান শুধু। সেজন্য একাডেমির দরবারে লেখা এমনভাবে পেশ করবার কোশেশ করে যেন লেখার টাইপো বা ধরন বা গর্জন দেখেশুনে মনে হয় গুরুত্বে পূর্ণ কোন রিসোর্চ! অথচ উনারা যা করছেন তা মূলত ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পেইড কোন কোর্টে! কারণ সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন টাইপের জিনিসপাতি উনারা একাডেমিয়ায় কপি-পেস্ট করছেন মাত্র! কিওয়ার্ডের বরকতে উনারা হিট প্রায় তখন! কিন্তু যখনই পৃথিবা উল্টানো হবে ভিরক্তে হাত হসে রবে তেলতেলা, এতো বেশি চর্বিত চর্বণ! আমার ধরারও উপায় সীমিত, কারণ গবেষক এমনভাবে গবেষণা প্রকাশ করছেন, যে, একাডেমিক যেই স্ট্যান্ডার্ড তাতে কিম্ভূতকিমাকার ফ্রেমওয়ার্কের দোহাই ও পুনরাবৃত্তির দোষে দুষ্ট একাডেমিয়া ফ্রেন্ডলি একাডেমিক ওয়ার্ডক্লাস ব্যবহার কইরা কজে ডিফেন্ড করতে পারা যাবে। এই টাইপের লেখায় যখন বাজার বর্তি হয়ে যাবে, তখন একাডেমিয়া নিজে বা একাডেমিক রাইটারসদের মেজরিটি ব্যাপারটাসরে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়া একটা দেশীয় প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করবে। যেটার সিগনেচার মনে যায় চর্বিত চর্বণ বা সাইটেশন বাড়ানো। এর বরকত তৈরী হয় একটা নয়া পরিবেশ, নয়া একাডেমিক বাস্তবতা বা ইকোসিস্টেম রিয়ালিটি।

যেহেতু এটা একটা ইন্ডাস্ট্রি, সেহেতু দরকার হবে হর্তাকর্তার, এক বা একাধিক। ভালোমন্দ মিলিয়ে এইবার সময়ের প্রয়োজনে হাজির হয় রকস্টার, বা রকস্টার্টে একাডেমিশিয়ান! উনাদের গরিমা ও স্বীকৃতির বদৌলতে গড়ে উঠে বুদ্ধিবৃত্তিক নানান ফোরামেরা। যেগুলাসরে আবার উনারাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির ব্যবস্থা করবেন। এইভাবে ইন্টেলেকচুয়াল কমিউনিটির বড়ো একটা অংশ যুগপৎ নয়া ও ফাঁপা বয়ানে দিতে অব্যস্ত হওয়া শুরু করবে। শিক্ষিত কমিউনিটি এইগুলো গিলে খায়, হজম না হওয়া পর্যন্ত এমনকি মুখস্তও করবে কেউ, কারণ গুণীজন যেহেতু বলেছেন ভালোই তো হবে! এইভাবে তৈরী হয় নয়া নয়া বাস্তুত্রম, সো কল্ড একাডেমিশিয়ানসদের সীলমোহর বা এপ্রুভাল হলো ওই দুনিয়ার বংশপরিচয় বা সম্পদ।

কিন্তু গণঅভ্যুত্থান বা এরকম গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আবির্ভাব যখন ঘটে, তখন এগুলো যে ফাঁপা বা অপ্রাসঙ্গিক প্রায় অথবা মনোযোগ না দিলে যে ক্ষতি হতো না তার বাস্তবতা সামনে আসে। একাডেমিশিয়ানসদের রিজিম তথাকথিত একাডেমিক কনটেন্ট একটা ডিজন্যেন্স বা হারমোনির অভাব তৈরী করে। মাঝখানে কি যেন নাই, তাই শেষে সুর মিলে না মতো! তারা অতীত দিয়ে ভবিষ্যৎ কে দেখতে চায়, বাপদাদি করে। ফলে প্রেডিকশন ভুল তো হয়ই, বিদ্যা এতো ভীর যে প্রায় অকাজের! বাস্তব খেয়াল করলে দেখবেন, একাডেমিশিয়ানসদের ইউটিলিটি যখন দরকার তখন হয় না, প্রায় সবসময় বিজয়ের পরেই বেশী ক্যাশ করা যায়।

পিউর একাডেমিক লেখালেখির এই সমূহ সীমাবদ্ধতার আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাস্তবতা দেখে আমরা বাহাছ শুরু করি সেমি-একাডেমিক এসপ্রোচে। লাল জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ন্যারেটিভ তৈয়ারও এর বাইরে নয়।

আমরা শুধু এক রকমের ন্যারেটিভ লিখবো না বরং মাল্টিপল ন্যারেটিভস নির্মাণে আমাদের আগ্রহ! কারণ বাকশালী বাঙালি এলিট জাতীয়তাবাদ আমাদের দেখিয়েছে সিঙ্গেল ন্যারেটিভ এর হর্তাকর্তাদের উপর একধরনের শাসনের আমোদী অধিকার নাজিল করে।

দখলদার সরকার এইভাবে রাষ্ট্রের ঠিকাদারি পাইয়া যায়, ফ্যাসিজম একটু একটু ঘনিয়ে আসে, বাকশাল-২ কায়েম হয়। ফলে আমরা তুলে আনতে চাইবো প্রান্তিক বা তথাকথিত অগুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলো, যেসমত বয়ান উপেক্ষিত, যেসব ইতিহাস নিরুত্তর, উত্তাপ নাই বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে কথাগুলোকে। এভাবে আমরা ইতিহাসপূজারী যেমাবে হবো না, সেমাবে অনৈতিহাসিকও হবো না, বরং ইতিহাসের দর্শন নিয়া সচেতন থাকবো ও এসরে আমজনতার কাজে লাগাতে পারবো বলে আশা রাখা যাবে। এর ভিতর দিয়া আজাদীর ইতিহাস নিজে আজাদ থাকতে পারবে, কোন গোষ্ঠীর সম্পত্তি হবে না, কোন গোত্রপতির উদ্দেশ্য সাধন করা লাগবে না। জনতা দরকারে অনেকগুলো ন্যারেটিভের একটা দিয়া পরবর্তীতে কখনো লাগলে আগাইতে পারবে। কারণ সমাজের বদ্বিন্যান্ত ভ্যালুজগুলো দিয়া যে তথাকথিত ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা ইতিহাসশাস্ত্র লিপিবদ্ধ হয়, তা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল, এমনকি ঐতিহাসিক নিজে যে বায়াস হবার চান্স আছে তারেও ধর্তব্যে নিচ্ছি আমরা, আরেক কদম আগাইয়া এও বলা যায়, যে, ইতিহাস লিখতে গিয়া যেকোন কয়েকটা ঘটনার বর্ণনার ভিতর দিয়া আরো অনেক ঘটনা সংরক্ষণ করতে না পারবার মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন আমরা।

ফলে আমাদের মাল্টিপল ন্যারেটিভসের সব বয়ানগুলো যে সমান না, বরং এখানেও যে অনাকাঙ্ক্ষিত হায়ারার্কি আছে ও থাকবে, তা কবুল করার নিয়ত স্পষ্ট। ইতিহাস নির্মাণ নিজে যে সাথে সাথে ইতিহাস মুছারও কাজ করে, এই শাস্ত্রীয় বাউন্ডারি মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নাই। এভাবে গণঅভ্যুত্থানের মেহনত হওয়ার আলাপও চুকে যেতে পারে, কারণ আমরা বলবো এর অনেকগুলো হাত, ফলে মেহনতের সুযোগ নাই। অনিরাপদ হাতে যাওয়া মানে অন্য হাতগুলোর এক্সিটেনশিয়াল প্রেশার শুরু হইয়া যাবার কথা, থ্রেট ফীল করা মজলুম হাতেরা সংঘবদ্ধ হওয়া শুরু করতে পারে মতো বীজ আমরা রোপণ করতে চাই।

তবুও ঘরানা হিসেবে সেমি-একাডেমিক কেন?

টোন ও স্টাইলের দিক দিয়া এটা কম ফরমাল এবং সবচে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হলো কনভারসেশনাল, ভাতচিতের ঢংয়ে আগাইতে পারে লেখা। কমনসেন্স থাকলেই লেখার মান যাচাইয়ে নেবে যেতে পারে, আহামরি আঁতেল হবার দরকার পড়ে না। উদ্দেশ্য থাকে পরিষ্কার, নতুন আইডিয়া এক্সপ্লোর করা যায় সহজে, স্ট্র্যাকচার থাকে ফ্লেক্সিবল, সাইটেশনের প্যারা কম।

তবুও কি আমরা ঠিকঠাক রীচ করতে পারছি? যদি পারি, তাইলে সমাজে এর রিফ্লেকশন কই? অথবা ফেসবুকে লাইক, কমেন্ট কম কেন? ইত্যাদি প্রশ্ন তো থাকেই। এক্ষেত্রে একটা অকপট ফ্ল্যাটি হচ্ছে, যাদের কাছে আমরা পেঁছাতে চাই তাদের ভিতর এক্সপ্লোরেশনে আস্থা কম! নয়া আইডিয়ার সন্ধানে আছে এরকম লোকজনের সংখ্যা বেশ কম। বেশিরভাগ পাঠক নিজের বিশ্বাসের সপক্ষে যুক্তি খোঁজে বেড়ায়, পরিচিত আইডিয়ায় একমত হয়ে উঠতে উঠেপড়ে লাগে। কনফারমেশন বায়াসে আক্রান্ত পাঠকের সংখ্যা নেহায়েত কম না হওয়ায় নিজের বিশ্বাসকে এস্টাবলিশ করবার জন্যে আরো বেটার প্যারাগ্রাফের সন্ধানে থাকবার ব্যাপারটা বেশ চোখামাচি ধরা পড়ে। যে আইডিয়ায় এতো আস্থা অনেকসময় দেখা যায় তার ভিতরকার সূক্ষ্ম তবিপরীত্য বা গ্রে এরিয়াগুলোও বিচরণ করতে চায় না। জনপ্রিয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত আরামের স্বার্থে যে ধারণাগুলোসরে একসেপ্ট করা হইছে, নয়া প্রায় সবকিছু তার মাপকাঠি ধইরা এক্সেপ্টবল হতে হয়!

তাই বলে উনাদের মূর্খ, ধর্মাদ্ধ, আনাড়ি ইত্যাদি কি বলা যায়? না। কারণ টার্গেট অডিয়েন্স যখন একটা বড়ো সংখ্যা হবে, উপরে বলা ব্যাপারটা বাস্তবতা তখন। যতো বড়ো ক্রাউড ততো বড়ো কনফার্মেশন বায়াস! এটা সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা, কালচার, ইতিহাস, এমনকি জিওগ্রাফি অনুযায়ী নির্ভর করে। আইডিয়া এক্সপ্লোরেশন বা এই কিসিমের কিছুকে জ্ঞান বলে মনে করা হলেও, জ্ঞান বলতে তো মূলত মানুষের অভিজ্ঞতার সমাহার মাত্রকেই বুঝে লোকে! ফলে নিজেরা আমরা যেমাবে জ্ঞান বিলাচ্ছি তাসরেও প্রশ্ন আনা দরকার। যেই এক্সপেরিয়েন্সের বর্ণনা আমরা দিচ্ছি তা কতটুকু নেসেসিটি হিসেসে হাজির করা যাচ্ছে? হিউম্যান এক্সপেরিয়েন্সের ওই একুমুলেশন কতটুকু লাভ দিবে পাঠকসরে? ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাস্তবতা মেনে নিয়া এই সহানুভূতিটুকু রাইখাও আমরা ওই ছাড় বা গ্যাপ অথবা ব্ল্যাংক স্পেইসটো দেবার পক্ষে নই। কারণ কয়েকটি যুক্তির মাঝখানে শূন্যস্থান দিলেই পাঠক কনফর্মিট কনসেপ্ট দিয়ে ওই গ্যাপ পূরণ করে। এই সত্য বুঝে আমরা কঠিনেসরে ভালোবাসিলাম। অডিয়েন্স বেইজ বড়ো ধরে নেওয়ায় ব্যক্তির যে সমূহ প্রেজুডিস বা একদেশদর্শীতা তাসরে আমলে নিয়া পাঠে নামলাম। ঝড়ের পরের পরিস্থিতি সম্পর্কে যেহেতু জানা আছে বলে আমরা কনফিডেন্টলি বলতেছি সেহেতু এটুকু রিস্ক নেয়াই যায়, ঝড় শুরু বা শেষ হলে অথবা ন্যূনতম মাঝামাঝি অবস্থায়ও আমজনতার একটা বড়ো অংশ আমাদের কানপড়া শুনবে অন্ত, এবং তৎপরতাও চালাবে আশা রাখা যায়।

ছাপা সংখ্যায়

সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ুন এই সংখ্যায়

বাহাছ — লাল জুলাই সংখ্যা

লাল জুলাই সংখ্যা

বাহাছ — লাল জুলাই সংখ্যা

৪.৮ · ৩৭টি রিভিউ
৳ ৪৫০

বাহাছ — লাল জুলাই। দ্বিতীয় সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০২৪। ছত্রিশ জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশেষ সংখ্যা। ৩০+ প্রবন্ধে জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক, দার্শনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। ৪২৪ পৃষ্ঠা। কানপড়া পাবলিকেশন, চট্টগ্রাম।

স্টকে আছে

সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত →
নিরাপদ পেমেন্ট সারা দেশে ডেলিভারি ৭ দিনে ফেরত
Previous Article

চলচ্চিত্রের লেখক : বিশালের শেক্সপিয়ার

Next Article

সম্পাদকীয় - ১ম সংখ্যা

Write a Comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *